সৌকর্য গ্রুপের একমাত্র ওয়েবজিন।

About the Template

বৃহস্পতিবার, ২০ জুন, ২০১৩

কবিতায় কোলাজ - মৌ দাশগুপ্তা

কবিতায় কোলাজ - প্রসঙ্গ: মেয়েলী কলম



প্রেমের মুখোশ
মৌ দাশগুপ্তা


আমি খুব ঘনঘন প্রেমে পড়ি।

কৈশোরে চেয়েছিলাম, “আমি হব তোমার জীবনের একমাত্র নারী।“
এ শর্ত আদৌ গ্রাহ্য হল না।
প্রেম খারিজ।

তরুণী আমি বলেছিলাম”“আমি হব তোমার জীবনের প্রথম নারী।“
মিথ্যার সাথে সহবাসে রাজি হই নি।
প্রেমে অসফল।

যৌবনে চেয়েছিলাম “আমি হব তোমার জীবনের সর্বশেষ নারী।“
পরিপাটি সহাবস্থানের ফাঁক দিয়েও ভুলের বিষাক্ত সংক্রামন,
এড়ানো গেল না।প্রেমে ব্যর্থ।

কবি বললেন, শর্ত মেনে প্রেম হয় না।প্রেম নিঃশর্তেই ছড়িয়ে যায়।
বাদলা হাওয়ার স্পর্শের মত,
সুখের গভীরে লুকিয়ে থাকা অসুখের মত।

অনেকটা পরাজয় মেনে আজ মধ্যবর্তিনী নিঃশর্ত প্রেমিকার ভূমিকায়,
কারো জীবনের একমাত্র,প্রথম বা শেষ নারী নই,
আজ আমিও একটার পর একটা মুখোশ পাল্টাই ,
আরো একটা… আর ও একটা!!!

মুক্তগদ্য - তপব্রত

মুক্তগদ্য
তপব্রত



সমস্ত পালিয়ে যাওয়ার মধ্যে একটা শান্তি-র স্থৈর্য বাঁধা... হেমলক বিষের মতো একটা নরম সুগন্ধ অথচ দূর থেকে দূরে যাবার সবটুকু পথ জুড়ে একটা শব-চেতনা কেন যেন তাড়িয়ে বেড়ায়। একটা গভীর, কিংবা গোপন অথচ একক ভয়, ক্রমশ ভয় পেতে পেতে একটা নিশ্চিন্ততা আসে... কেন যেন মনে হয় পাশে শোওয়া মানুষটা ঠিক সে-ই যদি না হয়ে আর কেউ হত... অথবা দাঁড়ি টেনে দেবার পরও যদি আরও একটা-বার...? অথবা সবটুকু ভুল, মিথ্যে টেনে ছিঁড়ে ফেলে যদি নগ্ন করে...

যদি। সমস্ত শান্তির শেষ পাতায় একটা যদি-র ভরসায় ঘুম আসে... অথবা ভয়। ক্রমশ ক্লান্তি এলে স্বপ্নের গায়ে তারা আঁক কেটে যাবে বোধহয়...


মনে করি, যুদ্ধ করব; কিংবা ভালোবাসব শুধু...
এই দুয়েই নাকি দোষ ধরে না কোনও!

ঘরের খেয়ে বনের মোষ তাড়াতে গিয়ে সামনে এলেন তার পালিকা...
কি ভাগ্য কি ভাগ্য ও পশু তোর শালীন যন্ত্রণা পাস...

আমি অশালীন একক,
চোখ দিয়ে পড়ে নিতে নিতে যে নদী হয়ে যায় ও শরীর তার নীচে ডুব দিতে চাই...

সে খুঁজবে শান্তি কল্যাণ,
সে খুঁজবে গৃহস্থকোণ...

আমি মজুর, কুলি, খনির পর খনি খুঁড়ে গভীর থেকে আগুন তুলে এনে
খনি ফেলে চলে যাব আবার...

সে খুঁজবে যাযাবর...

কতদূর, কত, কত আরও...

থামতে জানিস না?... জানিস না? তবে মর...


সোমবার, ২০ মে, ২০১৩

রবীন্দ্রশ্রদ্ধার্ঘ - অদিতি চক্রবর্তী

কোলিয়ারির দাড়িবুড়ো
অদিতি চক্রবর্তী


কে বটি? হঁ আইগ্যা! ত কে বটেন উনি? /ইত্য বড়ো দাড়ি বুড়ো? পেন্নাম লাগি মুনি।/ উ...উহুঁ ইতো হামার কত্তা বাবার ...বাবার পারা! গতর টাও খাসা/ ডজন খানেক পানবিবি লিয়ে তেনার হুড়হুড়াই ফূর্তি ছিল ঠাসা ।/ তবে তার ফটুতে মালা... গায়েন, ছড়া কাটা কিনে,/ কি বইললে , রবি ঠাকুর? ই' কথা জানে গাঁয়ের সব্বজনে?/ ত ...হামার পঁচানি কপাল! লিখাপড়া টো কইরে কি হবেক হে!/ ইঃ, কুথাকার কে তো পান্তাভাতে দে.../কিসকু গুনিন বটি আমি, তাগদ মোষের পারা/ আমার সাথে লইরবেক উ ? নাফা হবেক সারা !/ কি বইললি? ঠাকুর বটে, ত সে কি ওই কোলিয়ারির মহাজনের গুরু!/ ই'ট তুমার লতুন সাজ? পেন্নাম হই মারাং বুরু!/আমার ফুলমণি ডাগরটি ইখন, সাঙ্গা টো তার দিতে লারি/ হাজারি বাবুর লজর সিঁচে বাঁচবে কি ও হতচ্ছারি!/ কি বইলছ হে, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর...মস্ত কবি বটে! /হঁ ... ইত বড় কবি আর পয়দা হয়নি কো এ তল্লাটে.../ ইয়ার পূজা কইরলে বিদ্যা হবেক্, বুদ্ধি হবেক্, মিয়াছিলা ইজ্জত পাবেক্?/ তবে তো পুঁটির মায়েও গতরখাগী নাম হারাবেক।/ পাপ লিবি নাই তো হে রবি ঠাকুর,তু যদি সত্যি ঠাকুর বটিস্ / তো হামার টুকচেক জমিন ফিরিয়ে দে কিনে ...বা হাতের লগদ দিবো দশ-বিস।/কি বলইছিস তুরা? ই ঠাকুর সি ঠাকুর লয়? মানুষ ঠাকুর ? পড়া জানে, গায়েন জানে,পণ্ডিত মশাই?/ তাই তুরাও তার ধর বাদে মুণ্ডটাতেই মালা দিলি! ইমন কসাই!/ হঁ আইগ্যা রবি ঠাকুর ...আমি ছ'ট লোক/তুমি যদি ভদ্দর লোকের তবে আজ থেক্যা ওদের বিদ্যাবুদ্ধি হোক ।

মঙ্গলবার, ১৯ মার্চ, ২০১৩

মুক্তগদ্য - শিবাশীষ রায়

হরষ গীত উচ্ছসিত হে, আনন্দ বসন্ত সমাগমে...
শিবাশীষ রায়


আমার কবিতায় আমি ছিলুম সর্বাধিনায়ক,আর আমার একাধিপত্যে যে নাক গলাতো তার নাকটি কেটে হাতে ধরিয়ে দেওয়া যে শুধু সময়ের অপেক্ষা তা ছিল সর্বজন বিদিত!তাই একটা উন্নাসিক তকমা দামী কাশ্মীরি শালের মত আমার গায়ে জড়িয়ে দেওয়া হয়েছিল সেই সময় থেকে যখন কৈশোরের দোসর ছিল সাদামাটা রোদ্দুর,আর তল্পীবাহকের কুলপি আর রঙিন বরফগোলা খাওয়া চেয়ে দেখার নীরব মুহূর্তে, আমি শুধু খেতুম ফলের রস, অনীহা আর স্পৃহাহীনতায়!তবু আমি ছিলুম উন্নাসিক,ক্লাসিক সৌজন্যের ধ্বজা ধরে...

লেখাটি লিখতে বসে ফেসবুকিয় লেখক হিসেবে আমায় মাথায় রাখতে হচ্ছে ভাষা যেন সহজ সরল হয়! গরল গিলতে আপত্তি নেই,কিন্তু বাংলা ভাষা সোজা করে না লিখলে আজকাল দক্ষ লেখকের নরম রুচিশীল গরম বক্ষ প্রাপ্তির আশা ক্ষীণ, তাছাড়া শক্ত বাংলা পড়া আর নিজের পিঠ নিজে চুলকানো এখন কয়েনের এই পিঠ আর ঐ পিঠ...

তা যাইহোক,আমি লিখি আমার মননশীলতায়, আগে একে ওকে ট্যাগ করতুম, এখন ট্যাগ করাটা ত্যাগ করেছি কারন "লিটল ম্যাগ" নামক ম্যাগ-ই- বাজীতে জড়িয়ে এটা বুঝেছি সবই ঘর সাজানোর জিনিস,কেউ পড়েনি...কেউ পড়েনা, চৌত্রিশ বছর কেটে গেছে কেউ কথা রাখেনি, শুধু বুকের মধ্যে বন্দী "বর্তমান" রেখে বরুণা বলেছিল ভগবান ছাড়া আর কাউকে ভয় পায় না... পিছিয়ে পড়ার ভয়েই কেবল তখন পড়তে হয়েছিল প্রেমে, "প্রতিদিন" দিয়ে শুরু করে যখন এসে থামলুম একটু এগিয়ে সেই প্রফুল্ল সরকার ষ্ট্রীটে... তখন আমার জীবনে শীতের সকাল আর উনিশ কুড়ির দেশ!আজ যখন নিজেকে দেখি আয়নায় তখন হিসেবি ক্লিন সেভিং করা মুখে দাড়িওয়ালা সেই স্বপ্নের মানুষ টাকে সত্যি খুঁজে পাই না... ! এক এক সময় বড় কান্না পায় যখন দে'জ পাবলিশার্স এর দাড়িওয়ালা মামা ( দিবাকর ব্যানার্জি) কফি হাউসের সামনে থেকে আমার গাড়িতে উঠে যেতে যেতে জিজ্ঞাসা করে -"কিরে লেখালিখি একদম ছেড়ে দিলি নাকি...?? মাল কামালে কি আর কাব্য আসে চাঁদু... অ্যারোর শার্ট পড়ে আর যাইহোক সংস্কৃত কলেজের সিঁড়িতে বসে শক্তি সুনীল আওরানো যায় না...তার জন্যে সেই খাদির পাঞ্জাবী টা দরকার... ও তুই তো আজকাল ফ্যাব ইন্ডিয়া পরিস!!!" আমি শুধু হাঁসি আর মনে মনে বলি আজ আমার কপি রাইট নেই ঠিক কথা কিন্তু "দেশ" থেকে সোজা ফেসবুক,থুরি মহাদেশ সেকি কম কথা!!!!

এখন নিজেই লিখি নিজেই পড়ি... যারা আমায় ভালবাসেন তারা আমার দেওয়ালে আসেন,টিপে ভালবাসা ভালোলাগা জানিয়ে যান,আমি ও প্রতিভালবাসা জানাই... এখন একলা একলাই মাল খাই, যারা আমার মেজাজ ভালবাসেন তারা আসেন আমি আর ট্যাগ করে লোকের দেওয়ালে গিয়ে নিজেকে মাতাল, লেখক প্রতিপন্ন করা বন্ধ করে দিয়েছি,কারন আমি বুঝেছি মাথা চুলকানো মানুষদের বেশি না চুলকানোই ভালো, কারণ কখন যে এদের চুলকানি সুরসুরি তে রূপান্তরিত হয় আর আমি উন্নাসিক থেকে হয়ে উঠি নন্দ ঘোষ তা বোঝার আগেই এক ঝাঁক ভুঁইফোর সাহিত্য দালালরা গেয়ে ওঠে- "ওকে ছুঁয়ো না ছুঁয়ো না ছিঃ... ও যে চণ্ডালিকার ঝি!!!"

তাই খোলা মনে ফেসবুকে এলেও এখন কথা বলতে দ্বিধা হয়,দুবিধা হয় এই মর্মে যে আমি তো প্রেম চোপড়া, ছোপরা ঘসি গায়ে, প্রাণে আমার রবীন্দ্রনাথ কাদা লাগে পায়ে।

তবু ভালোলাগার কোঁচানো ধুতি আর মন্দলাগার গিলে করা পাঞ্জাবী পড়ি রোজ, কখনো সোনায় সোহাগা হলে এই হতভাগার পাঞ্জাবীতে বন্ধুত্বের আতর লাগে, আসর জমে,ক্রমে রাত বাড়ে... ! আড়ে যারা তাকায় পর্দার ওপাশ থেকে তাদের জন্যেও রাখা থাকে গোলাপ জলে চোবানো কিমাম জর্দা পান, কিন্তু ফুলের সাথে পান শুকোয় ঝাড় বাতির আলো ম্লান হয়ে আসে... পূর্বে হাল্কা আলোর আভা দেখা যায়...এক এক করে তাকিয়ায় এলিয়ে দিয়ে শরীর নিভে আসে চ্যাট বক্সের সবুজ আলো...

আমি তখনো জেগে থাকি,একলা একা ভোরের হাওয়া গায়ে মাখতে আমার ভীষণ ভাললাগে... ! সব ক্লান্তি,সব ব্যাথা,সব অক্ষমতা, অপবাদ যেন ধুয়ে যায়... কানে কানে কে যেন বলে যায়-" হরষ গীত উচ্ছসিত হে, আনন্দ বসন্ত সমাগমে!!!"





শনিবার, ১৯ জানুয়ারি, ২০১৩

মুক্তগদ্য - রূপময় ভট্টাচার্য



মৃত্যুকে

জন্মে চোখ ফোটা ইস্তক বাপ ঠাকুরদার দৌলতে তোমাকে ভয় পেতে শিখেছি । সক্কাল সক্কাল খবরের কাগজ যখন আমরি'র অগ্নিকান্ড থেকে শুরু হয়ে দিল্লির মিডিয়া খ্যাত গ্যাংরেপড তরুণীর প্রতি সমব্যথা প্রকাশ করে ,তখন বুঝে যাই তুমি সলিড লোক । রজনীকান্ত ,সলমন খান ,মুখ্যমন্ত্রীর বা সচিন তেন্ডুলকারের সঙ্গে তোমায় একাসনে বসাই । শ্রদ্ধা জানাই গন্ধধূপ দিয়ে । পাড়ার রাজনৈতিক দাদাদের মত তোমায় খুউউউব আপন করে নিতে ইচ্ছে হয়, আবার 'চমকে' দেওয়ার ক্ষমতায় বেশি কাছে যেতেও সাহস পাইনা । কারণ ,জানি -পান থেকে চুনটি খসলেই বারো বাই এগারো'র দেওয়ালে বিষণ্ন ফটোফ্রেম হয়ে ঝুলতে হবে । তোমাকে দেখে দেখে বুঝে যাচ্ছি ক্রমশই, আসলে তোমার কাছে একটু যাওয়ার জন্যেই - বসন্তবিকেলে চেনা পার্কের পরিচিত বেঞ্চির এককোণে তোমার খুব কাছ ঘেঁষে বসার জন্যেই আমি যাবজ্জীবন অপেক্ষায় আছি । তাই ভীষণ ভিড়ে ঠাসা ট্র্যাফিক ঠেলে একটু অসাবধানী মুহুর্তে জীবন যখন চলকে যেতে থাকে কিংবা বান্ধবীর দেওয়া মুফত অপমানে গা রি রি করতে করতে গোটাদশেক ঘুমের বড়ি যখন গলা বেয়ে জলের সাথে নামতে থাকে -তখন যে স্রোতটা বয়ে যায় শিরদাঁড়া বেয়ে ,তাতে তুমি ছাড়া আর কেউ থাকে কী ? কাজেই নিজের জীবনকে মূল্য দিতে দিতে বুঝছি ,বকলমে আসলে তোমারই হিসেব চোকাচ্ছি ।

মঙ্গলবার, ২০ নভেম্বর, ২০১২

শ্রীশুভ্র

নীললোহিতের জগৎ থেকে নীরার ভূবন


রবীন্দ্রউত্তর কালের বাংলা সাহিত্যের সবচেয়ে জনপ্রিয় লেখক চলে গেলেন মহাপ্রস্থানের পথে! সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের এই যাত্রায় তাঁকে একাই এগোতে হল!  কয়েকজনকে নিয়ে নয়, একাই তিনি কিংবদন্তী হয়ে রইলেন বাংলার লেখালিখির ইতিহাসে। অনেকেই এই চলে যাওয়াকে বলছেন ইন্দ্রপতন! অপূরনীয় ক্ষতি মনে করে শোকার্ত অধিকাংশ! কিন্তু লেখক আসেন, লেখক যান! রয়ে যায় তাঁর সৃষ্টি! কালের কষ্টি পাথরের চৌহদ্দীতে! সেই চৌহদ্দী পেড়িয়ে অনেকেই শতাব্দী পাড় হন না! যাঁরা হন তারা ছাড়িয়ে যান অন্যান্যদের! শতবর্ষ পড়েও রবীন্দ্রনাথের মতো সুনীল প্রাসঙ্গিক থাকবেন কিনা সেটা ভাবীকাল বলবে! সুনীল যদিও সেটা নিয়ে ভাবিত ছিলেন না কোনোদিন!

সুনীল কোনোদিনও ভাবীকালের দিকে তাকিয়ে লেখেননি! তাঁর সময়কে তাঁর লেখার মধ্যে ধরার প্রয়াস ছিল তাঁর! যে নাগরিক জীবন বাস্তবতায় স্বাধীনতা উত্তর বাঙালির জীবন পরিব্যাপ্ত হয়ে চলেছে, সুনীল টের পেয়েছিলেন তার নাড়ির স্পন্দন! সেই স্পন্দনকেই বিম্বিত করলেন তাঁর লেখনীর জাদুতে! বিশেষ করে গ্রাম বাংলার ঘেরাটোপ পেড়িয়ে ক্রমাগত শহরমুখী নাগরিক বাংলার এই যুগান্তরের মানসিকতাকে তিনি উপলব্ধি করেছিলেন ঠিক সময়মত! এবং নন্দিত হলেন পাঠকের বরমাল্যে! সুনীলসাহিত্য সেই নাগরিক জীবনের সপ্রতিভ মানসের সমৃদ্ধ প্রতিফলন! বাঙালি পাঠকের বিমুগ্ধতায় তাই অর্জন করলেন অফুরান ভালোবাসা!

যে কোনো বড়োমাপের সাহিত্যিক খুব অল্প সময়েই তাঁর নিজস্ব একটি ধারা সৃষ্টি করে তোলেন! সেই ধারারই ভক্ত হয়ে পড়ে একটা নির্দিষ্ট পাঠক শ্রেণী।এবং দিনে দিনে যার কলেবর বাড়তেই থাকে। সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের সাহিত্য জীবনেও ঠিক তাই হয়েছে। এই যে আধুনিক নাগরিক জীবন বাস্তবতায় আবর্তিত রোজকার জীবন, সেই জীবনের বিশ্বস্ত রূপকার সুনীল! ফলে তাঁর সাহিত্যে পাঠক তার চেনা জানা প্রতিদিনের জীবনের অনুষঙ্গগুলি খুব স্পষ্ট প্রত্যক্ষ করতে পারে। বাংলার পাঠক তাই তাঁর সাবলীল লেখনীর পরতে পরতে আবিষ্কার করল বহমান সময়ের প্রতিদিনের কথোপকথন থেকে উঠে আসা জীবন অভিজ্ঞতার বিশ্বস্ত অনুলিখন। পাঠক পেল লেখকের অন্তরঙ্গ সান্নিধ্য।

সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের লেখালিখি শুরু দেশের এক বিশেষ যুগসন্ধিক্ষণে! সদ্য স্বাধীন দেশ! দূর্বল অর্থনীতি! দেশভাগের কারণে ছিন্নমূল মানুষের জীবন সংগ্রাম! জীবিকা সঙ্কট! তীব্র খাদ্য সঙ্কট! সদ্যজাত গণতন্ত্র তখনো আঁতুর ঘরে। চারিদিকে একদিশাহীনতা। অস্পষ্ট ভবিষ্যৎ! মানুষ জীবনে স্থিতু হওয়ার জন্যে হন্যে হয়ে দৌড়াচ্ছে! কিন্তু পথের পুরো হদিশ নেই হাতের নাগালে! শরৎচন্দ্রের পল্লীসমাজের ভিতে ধরেছে ফাটল! একান্নবর্তী পরিবারের আশ্রয় ছেড়ে মানুষ শহরমুখী! রাবীন্দ্রিক স্থিতপ্রাজ্ঞ বিশ্বাসের ভিত্তিমূলে আস্থার জল সিঞ্চন ক্রমেই দূরূহ হয়ে পড়ছে! তিরিশের কবিরাও স্থির কোনো প্রত্যয়ের নিশানা তুলতে পারছেন না!

এইরকম এক যুগ সঙ্কটের প্রেক্ষাপটে তিনি এলেন! একা এবং কয়েকজন! প্রতিদিনের জীবনের সীমাবদ্ধ পরিসরটাকে ভেঙ্গে ফেলে প্রচলিত সমস্ত জীবন প্রকরণের প্রতিদ্বন্দ্বী হয়ে উঠতে অগ্রসর হলেন! শুরু হল বাংলাসাহিত্যে নবকল্লোল! শুরু হল কৃত্তিবাস যুগ! শুধু লেখার মধ্যে দিয়েই নয়, জীবনচর্চার প্রাত্যহিকতার মধ্যে দিয়েও প্রচলিত চেনা ছকের জীবন ও সাহিত্যের দিকে ছুঁড়ে দিলেন বলিষ্ঠ ও প্রত্যয়ী চ্যালেঞ্জ! দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ পূর্ববর্তী ধ্যান ধারণায় মানুষ যখন তার পরিপার্শ্বের সমসাময়িক সামূহিক বিপর্যয়গুলিকে আর ব্যাখ্যা করতে পারচ্ছে না, অথচ চেষ্টা করে যাচ্ছে; সেই অক্ষমতার ক্ষোভ ভাষা পেয়ে গেল এই নবধারার কালাপাহাড়ী সঙ্গীতে!

আর ঠিক এইখান থেকেই শুরু হল বাংলা সাহিত্যের এক নবপর্যায়! সামনে থেকে নেতৃত্ব দিলেন সুনীল! একদিকে তিরিশের কবিদের
প্রবল আন্তর্জাতিক মনন ও একধারে রবীন্দ্রনাথের শাশ্বত আধ্যাত্মিকতার সর্বব্যাপী প্রভাব! এইদুইয়ের মধ্যবর্তী প্রতিদিনের আটপৌরে জীবন বাস্তবতার নিবিড় কথোপকথনের পরিসর থেকে উঠে আসতে থাকল বাংলা সাহিত্যের নব প্রকরণ! শহরমুখী নাগরিক জীবনের অনুষঙ্গগুলির প্রতিফলনে প্রতিবিম্বিত হতে থাকল আধুনিক সাহিত্যের নির্যাস! আর ঠিক এইখানেই সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের কলমে বাংলাসাহিত্যের পাঠক পেয়ে গেল একান্ত আপন নিবিড় এক অন্তরঙ্গ বন্ধুর নিবিড়তর সঙ্গ! যে সঙ্গ রোজকার পায়ে চলা জীবনের পদধ্বনির সাথে সামঞ্জস্যে সংহত! সমৃদ্ধ!

সুনীলসাহিত্যে নাগরিক জীবনের যে বিস্তার তার পরিধিতে বাঙালি পাঠকের এক বৃহত্তর অংশ খুঁজে পেল তার প্রতিদিনের চেনাজানা পরিচিত জীবনের খণ্ড খণ্ড কাব্যগুলির অখণ্ডজীবনের এক গল্প! এবং রোজকার জীবন যাপনের আশা নিরাশার দ্বন্দ্ববিধুর প্রেম অপ্রেমের ভাষাগুলির একান্ত সহচর হয়ে উঠল তাঁর লেখনী। এই সহজআড়ম্বরহীনভাষারজাদুতেসুনীল তাঁর পাঠককে যে গল্প বলেন, তাঁর গদ্যে আর পদ্যে; সেই গল্পের সাথে পাঠক খুব সহজেই সংযোগ স্থাপন করে নেয় নিজেদের জীবনবাস্তবতার।এখানেইতাঁর এই বিপুল জনপ্রিয়তার মূল ভিত্তি! আর সেই সূত্রেই তিনি দুই বাংলার সাহিত্যমোদী পাঠককে টেনে নেন সুনীলবৃত্তে।

সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের সাহিত্য আবহের গভীরতম অন্তরে রয়েছে এক অম্লান উন্মুক্ত উদাসীনতা! যে উদাসীনতায় যেমন, কোনো কিছুর প্রতিই নেই কোনো উপেক্ষা বা অবহেলা! ঠিক তেমনি নেই কোনো কিছুকেই একান্তে আঁকড়ে ধরে সংকীর্ণ গণ্ডীবদ্ধ হয়ে পড়ার কোনো প্রবণতা! এইখানেই তাঁর সাহিত্যের আঁতুরেই রয়ে গেছে এক অমলিন নির্লিপ্ততা! যে নির্লিপ্ততার পথে রয়ে যায় অফুরান মুক্তির স্বাদ! আমাদের প্রতিদিনের জীবনের বাঁধাধরা প্রাত্যহিকতার ঘেরাটোপের মধ্যেই সেই মুক্তির স্বাদ নিয়ে হাজির হল নীললোহিত! যে নীললোহিত আমাদের প্রত্যেকের মধ্যেকার ঘুমিয়ে থাকা নীললোহিতকে জাগিয়ে রেখেছে চারদশকের ওপর সময় ধরে! হয়ত এইখানেই তাঁর সাহিত্যিক ঋদ্ধি।

বাংলা সাহিত্যে সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের এই এক মস্ত অবদান! নীললোহিত! তাঁর নীললোহিতের মধ্যে তাই বাংলার পাঠক পাঠিকা পেয়ে গেল অন্তরের অন্তরতম এক সহচরকে, যে জনঅরণ্যেরই একজন! সীমাবদ্ধতার মধ্যেও এক অম্লান বন্ধু! যে ঘরোয়া হয়েও উন্মুক্ত বিশ্বপ্রাণের সাথে অনায়াস সামঞ্জস্যে সমৃদ্ধ! যার মধ্যে বিপ্লব না থাকলেও আছে স্বাধীন ব্যক্তিসত্তার নিরুচ্চার ঔদ্ধত্য! চরিত্রের সেই অনায়াস দৃঢ়তায় বাঙালি পাঠকের নয়নের মণি হয়ে উঠল তাই নীললোহিত! নীললোহিতের এই জগত, যেখানে আত্মবিসর্জনের ব্যাকুলতা নেই! আছে আত্মোপলব্দির অনায়াস প্রয়াস! যেখানে সমষ্টির মধ্যে ব্যাক্তিসত্তার একান্ত উদ্ভাসন! সেখানেই পাঠক পেয়ে গেল পরম নির্ভর।

লেখক সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ও হয়ে উঠলেন পাঠক এবং প্রকাশক দুইয়েরই পরম ভরসা স্থল! দীর্ঘ চারদশকেরও বেশি সময় ধরে বাংলা সাহিত্যে এমন এক নির্মেদ ঋজুতা জুগিয়ে গেলেন সুনীল, যা সংবেদনশীল কিন্তু আবেগতারিত নয়! আধুনিক যুগের কণ্ঠস্বরে প্রত্যয়ী তবু ঐতিহ্যের সাথে সম্বন্ধহীন নয়! দেশীয় শিকড়ে ঋদ্ধ হয়েও আন্তর্জাতিক! এবং এইখানে তাঁর নীললোহিতের জগতের মধ্যেই তাঁর পাঠক তাঁকেই যেন নতুন করে আবিষ্কার করে নেয়! নীললোহিতের জগত থেকে নীরার ভূবনে তাদের প্রিয় লেখককে অর্দ্ধশতাব্দী ব্যাপী অনুভব করে চলেছে বাংলার পাঠক! সেই অনুভবের পরিসরেই পুষ্ট হয়েছে আধুনিক বাংলা সাহিত্য তার সুনীলায়নে।

নীড় আর নারী! পুরুষের জীবনের দুই কেন্দ্রবিন্দু! আবহমান পুরুষ সত্তা এই দুই কেন্দ্রকে ঘিরে আবর্তিত! কিন্তু সত্যিই কি নীড় আর নারী দুইটি ভিন্ন কেন্দ্র পুরুষের অনুভবী জীবন যাপনের সংগ্রাম বিক্ষুব্ধ সংশয় আর সঙ্কটে! বিশ্বাস আর প্রত্যয়ে! ভালোবাসা আর মমতায়! নাকি তা মূলত এককেন্দ্রিক অস্তিত্বের দুই ভিন্ন মুখ! পরস্পরের মধ্যে বিলীন। সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় এই এককেন্দ্রিকতাকে বেঁধে ফেললেন তাঁর নীরার মধ্যে!
সেই কেন্দ্রের অভিমুখেই নীললোহিতের বৃত্তায়ন! বৃত্তায়ন বাংলার পাঠককুলেরও! তাই নীরার জন্যে বাংলাসাহিত্যে অমরতার দাবী করতেই পারেন সুনীল! নীরার ভূবনে আবর্তিত আধুনিক বাংলার সাহিত্যমানস! হয়ত এখানেই সুনীল এক মহীরুহ।

তাই নীরার ভূবন, লেখক সুনীলের শুধু আত্মনির্মাণের পরিসরই নয়; তাঁর বিপুল জনপ্রিয়তার ভরকেন্দ্রও বটে! সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের গদ্যসাহিত্য এবং কাব্যসাহিত্যর অন্তর্লোকের পরিসরে নীরা বা নীললোহিত উভয় অঞ্চলেই পরিব্যাপ্ত হয়ে রয়েছে! গদ্য থেকে কাব্যে! কাব্য থেকে পদ্যে! বাংলার সাহিত্যমোদী তাঁর পাঠকবর্গও তাই নীললোহিতের জগত থেকে নীরার ভূবনে ধরে রেখেছে সমগ্র সুনীল সাহিত্যের সারাৎসার! আর সেই সূত্রেই সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় হয়ে ওঠেন তাঁর জীবদ্দশাতেই জীবন্ত কিংবদন্তী স্বরূপ!আর এখানেই তিনি ছাড়িয়ে গিয়েছিলেন তাঁর সমসমায়িক সাহিত্য রথীদের! বাংলা সাহিত্যের আধুনিক ইতিহাসে তাই নীললোহিতের জগত থেকে নীরার ভূবন এক পরিব্যাপ্ত সত্য!

ফাল্গুনী মুখোপাধ্যায়

বাংলা দেশের সাহিত্য ক্ষেত্র
– সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের চোখে



সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় চলে গেলেন । চলে গেলেন বাংলা সাহিত্যের ক্ষেত্রটিকে এক বিশাল শূণ্যতায় ঢেকে দিয়ে । আমরা জানি একজন প্রকৃত শ্রষ্টা নব নব ভাবে আবিস্কৃত হন তাঁর মৃত্যুর পর । রবীন্দ্রনাথের ক্ষেত্রে তাই হয়েছিল , জীবনানন্দের ক্ষেত্রেও । সংশয় নেই সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ও নব নব ভাবে আবিস্কৃত হবেন । সুনীলের মৃত্যু সংবাদ প্রচারে কয়েকটি টেলিভিশন চ্যানেলের ঘোষক তাঁকে ‘কথা সাহিত্যিক’ বলে উল্লেখ করায় এক তরুণ কবি আহত হয়েছিলেন, কেন তাকে ‘কবি’ বলে উল্লেখ করা হ’লনা এই ভেবে । এই আবেগ থেকে বুঝতে পারি তরুণ প্রজন্মের কাব্যকারদের কাছে সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় কতটা আশ্রয়ের মত ছিলেন ।

সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় কত বড় কবি ছিলেন, কতবড় কথাকার ছিলেন, সাহিত্যিক ইমদাদুল হক মিলন যেমন বলেছেন ‘সুনীল অন্য ভাষায় লিখলে নোবেল পুরস্কার পেতেন’ কিংবা আতাহার খান যেমন বলেছেন ‘রবীন্দ্রনাথের পর এতো বড় সাহিত্যিক আর আসেন নি’, এই সবের মূল্যায়ন হতেই থাকবে , অন্য মতও পোষণ করতে পারেন কেউ কেউ । কিন্তু এই উচ্চারণে তো কোন সংশয়ের যায়গা নেই যে দুই বাংলায় এবং বিশ্বের যে প্রান্তেই বাঙালি মনন সেখানেই সুনীল এক পরিপূর্ণ আধুনিক মানুষ, ধর্ম নিরপেক্ষ যুক্তিবাদী মানুষ , বাংলা ভাষা ও সাহিত্যের মহীরুহ সম অভিভাবক, এবং তরুণ প্রজন্মের লেখকদের আশ্রয় হয়েই ছিলেন। না, সুনীল কোন বাংলাভাষী বিশেষ ভূখন্ডের মানুষ ছিলেন না । ‘পশ্চিমবঙ্গ’ ও ‘বাংলা দেশ’ দুটি পৃথক ভৌগোলিক ভূখন্ড মাত্র, বাংলা ভাষা ও বাঙালি মনন এই ভৌগোলিক ও রাজনৈতিক সীমানায় আটকে থাকেনি কোনদিন । তাই এপারের মত ওপার বাংলাতেও সমান জনপ্রিয় প্রয়াত কথাকার । আমার ধারণা তাঁর পাঠক সংখ্যা এখন এপারের চেয়ে ওপারেই বেশি , কারণ আমার মত অনেকেরই সংশয় নেই যে এখন বাংলা ভাষা ও সাহিত্য বিশেষত কাব্য-চর্চার ক্ষেত্রটি এপারের চেয়ে ওপারেই বেশি গতিশীল ও সমৃদ্ধ ।

সংবাদপত্রে প্রকাশিত একটি লেখায় ‘পশ্চিমবঙ্গ পাবলিসার্শ এন্ড বুক সেলার্স গিল্ড’এর সম্পাদক ত্রিদীব চট্টোপাধ্যায় লিখেছেন (‘আজকাল’ ২৬ অক্টোবর) “যেটুকু হিসাব পেয়েছি, তাতে দেখা যাচ্ছে সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের বইএর বিক্রি বছরে দুই কোটি টাকারও বেশি । আমি শুধু বাংলা ভাষায় এবং ভারতীয় এডিশনের কথা বলছি । এর সঙ্গে বাংলা দেশ সংস্করণ – বৈধ ও অবৈধ যদি ধরা হয় তবে তার অঙ্ক বোধয় পাঁচ কোটি ছাড়িয়ে যাবে” । তাহলে দেখা যাচ্ছে ওপারের বাঙালি পাঠকদের কাছে তার বইএর কি বিপুল চাহিদা – টাকার অঙ্কে তিন কোটিরও বেশি, এপারের চেয়েও বেশি । ওপারে বাংলা সাহিত্যের ক্ষেত্রটি গতিশীল, সমৃদ্ধ ও উদার নাহলে কি এটা কি সম্ভব হ’ত ?

বাংলাদেশের মানুষ ও সাহিত্যের সঙ্গে তাঁর আত্মিক সম্পর্ক শুধুমাত্র এই জন্য নয় যে তিনি ফরিদপুরের ভূমি পুত্র ছিলেন। ওপারে সুনীলের জনপ্রিয়তা, বাংলাদেশের সাহিত্যচর্চা বা ওদেশের মানুষকে নিবিড়ভাবে চেনার পেছনে ছিল বাংলা ভাষার প্রতি তাঁর মমত্ব ও বাঙ্গালি জাতিসত্বার প্রতি তীব্র আবেগ । এপারে বাংলা ভাষার সঙ্গে আমাদের ক্রম অনাত্মীয়তা আমাদের ব্যথিত করে । তবুও এপারের বাঙ্গালির শান্তনা এই যে ‘বাঙ্গালি জাতিসত্বা’ আর তার ভাষার স্থায়ী ঠিকানা রয়েছে ওপারে। এই বাংলায় – বাংলা ভাষার মর্যাদার দাবিতে তিনি পথে নেমেছেন, ‘বাংলাবাজ’ বলে লাঞ্ছিত হয়েছেন এ আমাদের জানা । ১৯৭১এ লেখা অচিন্ত্যকুমার সেনগুপ্তের সেই কবিতার শেষ পংক্তিটা মনে পড়ে “আমাদের এক নজরুল, এক রবীন্দ্রনাথ । আমরা ভাষায় এক, ভালোবাসায় এক”। উনিশ শতকের বাংলার নবজাগরণের ইতিহাস থেকে উপাদান নিয়ে নিনি লিখেছিলেন ‘সেই সময়’, তেমনই দেশ বিভাগের যন্ত্রণার ইতিহাস থেকে উপাদান নিয়ে রচনা করেছেন পুব-পশ্চিম’।

ওপারের বাঙ্গালিদের নিজ মাতৃভাষার প্রতি ভালোবাসার কথা প্রয়াত কথাকার আমাদের জানিয়েছেন তাঁর অনেক লেখায় । ‘দেশ’ পত্রিকার ভাষা দিবস সংখ্যায় (১৯৯৮, ২১শে ফেব্রুয়ারি) লিখেছিলেন “বাংলা দেশের ছেলেরা প্রবাসে গিয়ে যখন অনেক কষ্ট করে গ্রাসাচ্ছাদন চালায়, তখনও কিন্তু তারা তাদের ভাষা ও সংস্কৃতি ভোলেনা । ... নিজেরাই ভাত ডাল ফুটিয়ে খায়, তবু তাদের বাংলা বই পড়া চাইই”এই নিবন্ধে তিনি আর একটি প্রণিধান যোগ্য মন্তব্য করেছিলেন “...কিছুকাল পরে ঢাকাই হবে বাংলা সাহিত্য প্রকাশনা এবং সংস্কৃতির প্রধান কেন্দ্র”। এপারের আমরা ওপারের সাহিত্য পড়ি খুব কম । ওপারের বাংলা সাহিত্য এবং তার গতি-প্রকৃতি সম্পর্কে নিবিড় অধ্যয়ন না থাকলে এমন মন্তব্য করা যায়না ।

ওপারের সাহিত্য ক্ষেত্রটি আমি বুঝতে চাইবো প্রয়াত সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের কথাতেই । সুনীল লিখেছেন –

“গত নব্বই-একানব্বই সাল পর্যন্ত বাংলাদেশ নিবাসী লেখকের গদ্য সাহিত্যের সঙ্গে আমার মোটামুটি পরিচয় আছে । সৈয়দ ওয়ালিউল্লার ‘লাল শালু’ আমার মতে বাংলা ভাষার শ্রেষ্ঠ কয়েকটি উপন্যাসের অন্যতম । বর্ষীয়ান সওকত ওসমান আমার প্রয় লেখক । আবু ইসহাক’এর সূর্য দীঘল বাড়ি’ পড়ে মুগ্ধ হয়েছিলাম ।

বাংলা দেশের উপন্যাসের ধারাকে দুই ভাগে ভাগ করা যায় । একদিকে আছেন হাসান আজিজুল হক, আখতারুজ্জামান ইলিয়াস ও সেলিনা হোসেনের মত লেখকরা । এরা জীবনকে গভীর ভাবে বিশ্লেষণ করেন, সামাজিক অবক্ষয় ও শ্রেণী বৈষম্য এদের প্রধান বিষয়বস্তু , ব্যক্তির বদলে সমষ্টিই এঁদের লক্ষ্য । হাসান আজিজুল হক পশ্চিম বাংলাতেও বিশেষ পরিচিত , কিন্তু তিনি লেখেন খুবই কম । আখতারুজ্জামান’এর ‘চিলে কোঠার শেপাই’ ও ‘খোয়াব নামা’ প্রকাশের সঙ্গে সঙ্গে বিখ্যাত হয়েছে । কিন্তু তাঁর ভাষা বিশেষত শেষ গ্রন্থটিতে অকারণ জটিল এবং নীরস । এই লেখকের অকাল মৃত্যু বাংলা সাহিত্যের পক্ষে অপূরনীয় ক্ষতি । সেলিনা হোসেন গ্রাম বাংলার জীবনের যে পুঙ্খানুপুঙ্খ বিবরণ তুলে ধরেছেন, ইদানিং তার তুল্য রচনা বিশেষ পাওয়া যায় না ।

অন্য ধারার প্রতিনিধি হুনায়ুন আহমেদ এবং ইমদাদুল হক মিলন । এঁদের ভাষা স্বচ্ছ ও সাবলীল । চলমান জীবন থেকে আহরণ করেন কাহিনি । মানুষের সঙ্গে মানুষের সম্পর্ক, তাদের আকাঙ্খা, আবেগ , বেদনা ও হর্ষের চিত্র পাঠককে মুগ্ধ করে রাখে । অনেককাল আগে হুমায়ুন আহমেদ যখন অল্প পরিচিত প্রতিশ্রুতিমান তরুণ লেখক, তখন তাঁর ‘নন্দিত নরক’ নামে উপন্যাসটি সম্পর্কে আমি ‘দেশ’পত্রিকায় লিখেছিলাম । তাঁর ভাষা ও নিজস্ব দৃষ্টিভঙ্গি আমাকে মুগ্ধ করেছিল । এখনকার হুমায়ুন আহমেদ (হুমায়ুন আহমেদ প্রয়াত হয়েছেন গত জুলাইএ) জনপ্রিয়তার রেকর্ড সৃষ্টি করেছেন বলা যায় । হুমায়ুন আহমেদ সর্বকালের বাংলা ভাষার জনপ্রিয়তম লেখক, তাঁর এক একটি বইএর বিক্রির সংখ্যা শরৎচন্দ্রের চেয়েও বেশি । ইমদাদুল হক মিলন অতি অল্প বয়স থেকেই পাঠকের দৃষ্টি আকৃষ্ট করেছেন, এখনও তিনি বয়সে তরুণ । তাঁর সহজ ও কাব্যময় ভাষা প্রথম থেকেই মনোযোগ দাবি করে । গ্রাম ও শহর যে-কোনও পটভূমিকাতেই তিনি কাহিনী নির্মাণ করতে পারেন, যেমন আবেগময় প্রণয় কাহিনী, তেমনই জীবনের নিষ্ঠুর দিক ফুটিয়ে তুলতেও সিদ্ধহস্ত” ।

সদ্যপ্রয়াত সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের এই পর্যবেক্ষণ থেকে বাংলা দেশের সাম্প্রতিক সাহিত্য সম্পর্কে, অসম্পূর্ণ হলেও একটা ধারণা পাওয়া যায়, যা নবীন লেখকদের মনোযোগ আকর্ষণ করবে । বাংলা ভাষার তরুণ লেখকদের কাছে সুনীল ছিলেন এক পরম ভরসার যায়গা । দুই বাংলা তো বটেই, দেশ-বিদেশের সাহিত্যের অধ্যয়ন ও পর্যবেক্ষণ, তাঁর নিরপেক্ষ ও উদার মতপ্রকাশ, তরুণ লেখদের উৎসাহ দানে তাঁর অকৃপণতা তাঁকে সাম্প্রতিক বাংলা সাহিত্যের অভিভাবক’এর সম্মান দিয়েছিল।

ওপার বাংলার সাম্প্রতিক সাহিত্য সম্পর্কে তাঁর এই পর্যবেক্ষণ ছিল নবীন প্রজন্মের লেখিকা নাসরীন জাহানের ‘সোনালি মুখোশ’ উপন্যাসের আলোচনা প্রসঙ্গে । এবং লেখটি শুধুমাত্র একটা বইএর নিয়ম মাফিক আলোচনা ছিলনা । দেশ পত্রিকার ১৯৯৮এর কলকাতা পুস্তক মেলা সংখ্যাটি সাজানো হয়েছিল ‘অধ্যয়ন প্রিয় চোদ্দোজন বাঙালি এবছর কোন বই পড়েছেন’ তার বিবরণ হিসাবে । অধ্যয়ন প্রিয় সুনীল বেছে নিয়েছিলেন তরুণ প্রজন্মের লেখিকা নাসরীন জাহা্ন আর তাঁর ‘সোনালি মুখোশ’ বইটিকে , আর অকপটে একথা বলতেও কুন্ঠিত হননি যে “সমগ্র বাংলা সাহিত্যে নাসরীন নিজস্ব স্থান দখল করার জন্য এসেছেন । পশ্চিম বাংলার পাঠিকরা যদি এঁর লেখা না পড়েন, তাহলে নিজেরাই বঞ্চিত হবেন” । এই হ’ল বাংলা ভাষা ও সাহিত্যের অভিভাবকত্বের কথা ।

ধর্ম নিরপেক্ষ ও যুক্তিবাদী মনের ঐশ্বর্য নিয়ে সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় নিজেকে কখনোই শুধুমাত্র এপার বাংলার সাহিত্যিক মনে করেননি । বস্তুত, বাংলা ভাষা ও সাহিত্য ‘কে এপার-ওপার’ ভাগ করা তিনি ঠিক বলে মনে করতেন না, অন্যথা হলে তিনি তা স্মরণ করিয়েও দিতেন । এই আলোচনা প্রসঙ্গেই তিনি লিখেছিলেন “হাসান আজিজুল হক এক যায়গায় লিখেছেন “(পশ্চিমবঙ্গে) বাংলা ভাষার সাম্প্রতিক সাহিত্যের উৎকর্ষ অপকর্ষ আলোচনার সময় এমন একটা অনপেক্ষ ও চূড়ান্ত মনোভাব দেখতে পাওয়া যায়, যাতে বোঝা যায় যে সগ্র বাংলা সাহিত্য বলতে কেবল মাত্র পশ্চিমবঙ্গের সাহিত্যকেই বোঝায় । ঠিকই লিখেছেন । আবার বাংলা দেশের পত্র-পত্রিকাতেও দেখতে পাই,যদিও সেখানেপশ্চিম বাংলায় রচিত সাহিত্য যথেষ্ঠই পড়া হয়, তবু সাহিত্যের ইতিহাস ধর্মী রচনায় শুধুমাত্র বাংলা দেশের সাহিত্য ধারারই উল্লেখ থাকে । আমি অন্তত এখনও , যে যেখানে বসেই বাংলা ভাষায় সাহিত্য রচনা করুন না কেন, তা সমগ্র বাংলা সাহিত্যের অন্তর্গত মনে করি”

এই ছিলেন সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়। বাংলা ভাষা ও সাহিত্যের ক্ষেত্রে এপার-ওপারের সীমানা তুচ্ছ করতে পেরেছিলেন, আমাদের তুচ্ছ করতে শিখিয়েছিলেন ।

রোহণ ভট্টাচার্য

যে সব গল্পে তখনও ভোকাট্টা আসেনি


স্বতঃস্ফূর্ততার সাথে কৃত্রিমতার একটা অদ্ভূত সম্পর্ক আছে । যে সম্পর্কটা আসলে একটা ঘুড়ির গল্প । যেসব গল্পের ঘুড়িরা লাটাই থেকে সুতো টানতে টানতে অনেকদূর চলে যায় । তারপর যথারীতি ঐ লাটাইটা দেখা যায়, ঘুড়িকেও দিব্যি দেখতে পাওয়া যায় ; শুধু মাঝের সুতোটা কিছুদূর যাওয়ার পর কোথায় যে মিলিয়ে যায়…


এই যেমন একটা কৃ্ত্রিম ফ্লাইওভার যার ওপর দিয়ে অনবরত চলে যাচ্ছে গোল গোল কালো রঙের চাকা । ছোটো বড় বা মঝারি , এরকম আকারগত পার্থক্য বাদ দিলে চাকারা মাত্র দু’রকম । এক, যারা চলে যাওয়ার পর কোনো দাগ থাকে না ; দুই, যারা চলে যাওয়ার পরেও…

অথচ ঐ ব্রীজটাকে ছুঁয়ে যেটুকু বাতাস আছড়ে পড়ছে এদিক সেদিক কিংবা চারপাশ থেকে যেটুকু শূণ্যতা ঘিরে ধরছে ইট-সিমেন্টের শরীরটাকে ; সেইসব দেখতে দেখতে মনে পড়ে যাচ্ছে এই ব্রীজটা তৈরীর আগে একটা ঘুড়ি ওরানো হয়েছিল শুধু এয়ার ভলিউমটুকু মাপার জন্য । ব্রীজ তৈরীর ক্ষেত্রে যেটা খুবই স্বাভাবিক এবং বিজ্ঞানমনষ্ক ঘটনা । তবু ঘটনাটা আশ্চর্যজনক এইজন্যই যে বাতাসের চলাফেরার ওপর কিন্তু মানুষের কোনো হাত নেই । অথচ হাতেই তৈরী ঘুড়িটার আকাশে স্বতঃস্ফূর্ত খেলে বেড়ানোর কারণ কিনা একটা ইচ্ছে । খানিকটা ফাঁকা জায়গা পেয়ে সেখানে সেতু বানাবার ইচ্ছে । অনেকটা একটা অসীম শূন্যতা পাওয়ার পর তাকে ভরাট করতে চাওয়ার মতো । যেভাবে আমাদের ঘুড়ি ও লাটাইয়ের গল্পে মধ্যবর্তী হঠাৎ মিলিয়ে যাওয়া সুতোটি ঝুলে আছে এক অনন্ত খালিতে ।।

তপব্রত মুখার্জী

তপব্রতর মুখার্জীর গদ্য...


যন্তরমন্তর বহুদিন হল বন্দো আচে। না না কলকেতার টা না, সেখানে কল্কে টানচে লোকে ভালই... এই যেখানার কতা বলচি, সেখানা এইখেনে থাকে, এই বুকটুকু কেটে ছিঁড়ে দেকতে হয়। যাক গে যাক, তোমরা সে কতা বুঝবে নি।

ঐ সেদিন ছিল বিসটি-বাদলার দিন। হুঁকো-মুখো আমাশা হয়েছে বলে মুখ আরও বিচ্ছিরি করে বসেছিল। তাকে শুধোতেই সে বলল, বড়মন্ত্রী নাকি কাজ ছেড়ে দিয়েচেন, গুলিসুতো খেয়ে অম্বল হয়ে গিসলো বলে। আর রাজকন্যে এখন ঘুড়ি ওড়াচ্ছে। সামনের মাসে রাজা বলেচেন দিঘ্রাংচুর সাথে তার বে...

হুঁকো কে জিজ্ঞেস কল্লুম, কে কে আসছে? সে বললে, সক্কলে; মায় প্যাঁচা পর্যন্ত। এই কতা শুনে আমার আবার ঢেঁকুর উঠলো... কিন্তু হজম হল না! প্যাঁচা তো যদ্দুর জানতাম এখন হাইকোর্টে যায়... সে আসবে? ও বাবা, জিজ্ঞেস করতেই হুঁকো হঠাৎ রেগে গাছের কোটরে ঢুকল, আর বিচ্ছিরি গলায় একটা দেড়েল ছাগল বলতে বসলো, "অঙ্ক জানো, অঙ্ক? জানো না, জানো না, কিসসু জানো না..."

বিপদ বুঝে পালাতে গিয়ে দেকি, ও রামঃ, মিছিল বেরিয়েচে! তার সামনে হাঁটচে বিড়াল, পেছনে সব্বাই কেমন কিম্ভুতকিমাকার!!! এদিকওদিক তাকিয়ে দেখি, এক এক করে ট্যাঁসগোরু এসে ঢুঁ মেরে যাচ্ছে সমস্ত হাঁ হয়ে থাকা লকজনের পিছনে!!! আমি সামলালুম...

খানিক পরে পাঁজরে একখান খোঁচা খেয়ে দেকি, উরিব্বাস, গেছোদাদা! শুধোলেন, কি বুজছ ভায়া??? আমি তো হাঁ!!! তিনিই বল্লেনঃ "বুজলে, এই জন্যই ভাগলুম... আর পোষাচ্ছে না! কি সব ছিরি!!! ধুর..."

খ্যাক খ্যাক হাসি শুনে দেখি পাঁচিলের উপর বসে শেয়াল হাসছে!!!

নাহ... আর না... আমি তারপর পালালুম। দুঃখু রইল কিচু, তবু, তোমরা তো বুজবে নি, তাই একা একাই যন্তরমন্তর এর সামনে দে ঘুরে আসি বারকতক... দেকি, যদি কিচু হয় কোনদিন!!!