সৌকর্য গ্রুপের একমাত্র ওয়েবজিন।

About the Template

শুক্রবার, ২০ ডিসেম্বর, ২০১৩

গল্প - সুজাতা ঘোষ

শিকারের টোপ
সুজাতা ঘোষ



অপরূপ সান্যাল অফিস থেকে ফিরে ক্লান্ত শরীরটাকে মেলে দেয় সোফার উপর। স্ত্রী এসে টিভি চালিয়ে চা দিয়ে যায়। অভ্যস্থ হাত অনিচ্ছা সত্বেও চায়ের কাপটা তুলে নেয় মুখের সামনে। চাতে চুমুক দিয়ে খবরের কাগজটার পাতা অমনযোগী হয়ে ওলটাতে থাকে সে। নানা রকম একঘেয়ে খবর ভেসে উঠছে টিভির পর্দায়। হাতের পাতাগুলো ওলটাতে ওলটাতে তিন নম্বর পাতার ছোট করে লেখা একটা খবর চোখে পড়ে – সুন্দরবনে নদীর পারে একটি বাঘ গুলিবিদ্ধ অবস্থায় পাওয়া যায়। আবার সেই গ্রামেরই গেস্ট হাউসের চৌকিদারের ছেলে নিখোঁজ। ঘটনাটি দুদিন আগে ঘটেছে। পুলিশ তদন্ত চালাচ্ছে। এই দুই খবরের ভিতর কোন যোগাযোগ আছে কিনা তাও পুলিশ খতিয়ে দেখছে। অপরূপের হাতের কাপ মুখের সামনে ধরা আছে, চোখের সামনে খবরের কাগজ খোলা। এমন সময় স্ত্রী রশ্মি ঘরে ঢুকে চায়ের কাপটা তুলে নিয়ে বলল – দেখো, সুন্দরবনের গ্রামে দুদিন আগে বাঘ ঢুকেছিল, তখন তোমরা ওখানে ছিলে না? টিভিতে দেখাচ্ছে, দেখো না ...

অপরূপ নড়েচড়ে বসল। সত্যিই টিভিতে দেখাচ্ছে। প্রচুর লোক জড়ো হয়েছে নদীর ধারে। বাঘটা তখন অবশ্য সেখানে নেই, নিয়ে যাওয়া হয়েছে পরীক্ষা করার জন্য। এরপর আরও অনেক খবর চোখের সামনে নড়াচড়া করেছে, তবে অপরূপ সমানে বাঘ আর চৌকিদারের ছেলের নিখোঁজের যোগাযোগ খুঁজে চলছে মনে মনে। কিছুতেই হিসাব মেলাতে পারছে না।

এখন অনেক রাত, প্রায় পৌনে তিনটে। অপরূপের চোখ দুটো বাক্সে বন্দী ‘মমি’ র মত খোলা। পাশে রশ্মি নিশ্চিন্তে ঘুমাচ্ছে। ছটফট করতে করতে অপরূপ উঠে গেল রাস্তার দিকের বারান্দায়। এখানে বেশ শান্তি পায় সে। রাতের অন্ধকারে দুয়েকটা গাড়ি, আবার মাঝে মধ্যে লোকজনও চলাফেরা করে। অপরূপ রেলিংয়ে হেলান দিয়ে দাঁড়াল। ঠাণ্ডা হাওয়া ওর সমস্ত বিক্ষিপ্ত মন আর শরীরকে শান্ত করে দিয়ে যাচ্ছে। ঘুম পাচ্ছে আস্তে আস্তে অপরূপের, চোখদুটো বন্ধ হয়ে আসছে। সেদিনও তো এরকমই দু চোখের পাতা বন্ধ হয়ে আসছিল ঘুমের নেশায়।

অপরূপ আর সন্দীপ, দুজনে বেড়াতে গেছিল সুন্দরবন। অফিসের গেস্ট হাউসে উঠেছিল। দুই রাত আর তিন দিন, বেশ আনন্দের সঙ্গেই কাটিয়েছে ছুটিটা। থাকা খাওয়ার কোন অসুবিধাই হয় নি, চৌকিদার সম্পূর্ন নজর রেখেছিল ওদের আপ্যায়ন করার জন্য। যা কিছু পাওয়া যেত না গেস্ট হাউসে তা সবকিছুই চৌকিদার এনে দিত বাইরে থেকে, ওদের শুধু কষ্ট করে মুখ থেকে অর্ডারটা দিতে হত।

সন্দীপ একটু অন্য ধরনের মানুষ। অপরূপের শান্ত নির্ভেজাল জীবনের সাথে ওর কোন মিলই নেই। সন্দীপ জঙ্গলে ঘুরতে ভালোবাসে, জংলী প্রানী শিকার করে খেতে ভালোবাসে। জংলী মেয়েরা ওর ভীষণ পছন্দের। বলে রাখা ভালো – ওর স্ত্রী স্মিতা উচ্চ শিক্ষিতা, রুচি সম্পন্ন, বেশ আধুনিক। ওরা কি করে যে এত বছর ধরে একসাথে আছে বলা মুশকিল। সন্দীপ সবসময় একা একাই বেড়াতে যায়, ওর নাকি পোষায় না ওর স্ত্রীর সাথে। আর অপরূপ ওর স্ত্রীকে বাদ দিয়ে বাজার করতে যাওয়ার কথাও ভাবতে পারে না। সন্দীপের জোরাজুরিতে একরকম বাধ্য হয়েই প্রায় এসছে সুন্দরবন বেড়াতে। এ একেবারে অন্যরকম অভিজ্ঞতা স্বীকার না করে উপায় নেই। কোন কিছুর সময় ঠিক নেই, কোন পরিকল্পনা নেই, যেমন ইচ্ছা ঘুরে বেড়াও। সেই ইচ্ছাটাও আবার সন্দীপের ইচ্ছা অনুযায়ী। এক কথায় আদিম আনন্দ।

অপরূপের ঘুমের নেশা ভাঙছে আস্তে আস্তে; সেদিন ওখানে কি ছিল? যেটা সন্দীপ বাঘের খাবার বলে ওদের বসার টিলার থেকে বেশ কিছুটা দূরে বেঁধে রেখেছিল অন্ধকারে? ছটফট করছিল নিজেকে ছাড়ানোর জন্য, অপরূপের খুব কষ্ট হচ্ছিল দেখে। সন্দীপ ওকে বলেছিল – চুপচাপ বসে থাক। কথা বললে আমার কন্সেনট্রেশন

নষ্ট হবে। ঐ খাবার খেতে বাঘ আসবে আর আমি তাঁকে এখান থেকে গুলি করে মারব।

অপরূপ আঁতকে উঠে বলেছিল – তোমার কি মাথা খারাপ হয়েছে সন্দীপ! বাঘ মারবে, তোমাকে পুলিশে ধরবে। সন্দীপ বিরক্ত হয়ে বলেছিল – আঃ, চুপ করো তো, শিকার করতে না পারো, অন্তত দেখে আনন্দ নাও। তাছাড়া আমি না মারলে গ্রামের লোকেরা মারবে। তার চেয়ে আমি মারি। অপরূপ আর কোন কথা না বলে চুপচাপ বসে ছিল টিলার উপর। বাঘের জন্য অপেক্ষা করতে করতে ঘুমে চোখ দুটো জড়িয়ে আসছিল ওর। প্রায় ঢুলতে শুরু করেছে এমন সময় একটা অস্বাভাবিক শব্দ আর ধস্তাধস্তির মত নড়াচড়া অপরূপের দুচোখ খুলে দিয়েছিল। কিছুই বোধগম্য হচ্ছিল না তার, ঐ দূরে জলের কাছাকাছি এক মূহুর্তের মধ্যে কি ঘটে গেল। অন্ধকার থাকার জন্যই আরও বেশী করে বুঝতে অসুবিধা হচ্ছিল। কিছুক্ষণ তাকিয়ে থাকার পর অপরূপ বুঝতে পারল বাঘটাকে সন্দীপ গুলি করেছে, তবে সাইলেন্সার থাকার ফলে ও শব্দটা বুঝতে পারে নি। সামনের দুটো প্রানীই ছটফট করছে। বাঘের পায়ে গুলিটা লেগেছে। বাঘটা পালানোর চেষ্টা করছে আবার শিকারও ফেলে যাবে না। তাই আহত অবস্তাতেই মুখে করে অন্য প্রাণীটাকে টেনে হিঁচড়ে সঙ্গে করে নিয়ে যাচ্ছে।

সন্দীপ টিলা থেকে নামবার উপক্রম করতেই অপরূপ তাঁকে বাঁধা দিয়ে বলে – তোমার কোন কথাই আর আমি শুনব না, তুমি একপাও নামবে না। প্রথমত পায়ে গুলি করেছ, সামনে গেলে তোমাকে ও ছাড়বে না। তোমাকেও টেনে নিয়ে যাবে সাথে। সন্দীপ হাতের বন্দুকটা কাঁধে ঝুলিয়ে কোন উত্তর না দিয়ে অপরূপকে ধাক্কা মেরে নীচে নেমে যায়। অপরূপের সাহস হোল না একা টিলা থেকে নেমে যাওয়ার। এই অবস্তার মধ্যে সে ভয়ে ভয়ে কোনক্রমে টিলার উপর হাঁটুগেরে বসে রইল। ভোরের আবছা আলো ফুটতেই অপরূপ টিলা থেকে নেমে গেস্ট হাউসে ফিরে আসে।

আজ দুপুরেই কোলকাতা ফিরবে ওরা। এখন সকাল সাতটা। চায়ের কাপ হাতে নিয়ে দু-জন মুখোমুখি অথচ কোন ভাষা নেই মুখে। আর ধৈর্য রাখতে না পেরে অপরূপ নিজেই জিজ্ঞাসা করল - কি হোল বাঘটার শেষ পর্যন্ত? চায়ে চুমুক দিয়ে সন্দীপ গলা ঝেড়ে বলল – আমি পৌঁছানোর আগেই ও পালিয়ে গেছে। আমি জঙ্গল, গ্রাম ঘুরে যখন নদীর ধারে ফিরে আসি তখন দেখি ও জল খেতে এসেছে। আর সময় নষ্ট না করে তিনটে গুলি ছুঁড়ে দেই। গুলি খেয়ে বাঘটা একেবারে নীচে নেতিয়ে পড়ে।

অপরূপ কিছু বলতে যাচ্ছিল, এমন সময় চৌকিদার এসে কড়া নাড়ায়, দরজা খোলা ছিল, ভিতরে ডাকতেই চৌকিদার ঢুকে কাঁদো কাঁদো মুখে বলে – বাবু আমার ছেলেটাকে খুঁজতে এসেছিলাম। অন্যদিন এসময়ে চলে আসে। কাল রাত থেকে...... বলতে বলতে চৌকিদার এবারে কেঁদেই ফেলে, বলে – দেখি ছেলে ঘরে নেই। কোথাও নেই, সব জায়গায় খুঁজে এসেছি। অপরূপ উঠে গিয়ে গায়ে হাত বুলিয়ে বলে – কি বলছ কি? রাত থেকে নেই মানে?

চৌকিদার এবারে কাঁদতে কাঁদতে নীচে বসে পড়ে, নিজেকে একটু সামলে নিয়ে বলে – রাতে দরজা খুলে বাইরে প্রস্রাব করতে গেছিল আর ফেরে নি। সেই থেকেই খুঁজছি বাবু। অপরূপ বেশ চিন্তিত হয়েই বলল, চলো আমি যাব তোমার সঙ্গে খুঁজতে। আর চলো পুলিশেও একটা...

এতক্ষণে সন্দীপ এবারে প্রথম মুখ খুলে বলল – আর পুলিশের কি দরকার, ও হাতের কাছেপিঠেই কোথায়ও আছে। চলে আসবে, তুমি চিন্তা করো না। এবারে অপরূপ বেশ বিরক্তির সঙ্গে বলল – কি বলছ কি? রাত থেকে একটা ছোট্ট বাচ্চা ছেলে উধাও তাকে খুঁজতে হবে না! আর কথা না বাড়িয়ে অপরূপ ঘর থেকে বেড়িয়ে যায়, চৌকিদারও একবার মুখ কাঁচুমাচু করে সন্দীপের দিকে তাকিয়ে অপরূপের পিছু নিল।

যতটা সম্ভব ঘোরাঘুরি করে ব্যর্থ হয়ে শেষে পুলিশে খবর দিয়ে অপরূপ চলে আসে গেস্ট হাউসে। বেলা বেশ গড়িয়ে গেছে, এখন রওনা না দিলেই নয়। সন্দীপ তাড়াতাড়ি বলল – রাস্তায় খেয়ে নেওয়া যাবেক্ষণ, এখন চলো তাড়াতাড়ি বেড়িয়ে পড়ি, না হলে দেরী হয়ে যাবে। অপরূপ ক্লান্ত মুখে বলল, না খেয়ে যেতে পারব না। সকাল থেকে কিছু পেটে নেই। একেবারে লাঞ্চ করেই বের হব। বাধ্য হয়ে সন্দীপও লাঞ্চ করার জন্য থেকে গেল।

সারা রাস্তা কোন বিশেষ কথা হয়নি এখনো পর্যন্ত, অনেকটা রাস্তা চলার পর চা খাওয়ার জন্য গাড়ি থামিয়ে সন্দীপ চায়ের দোকানে ঢুকেছে অর্ডার দিতে। অপরূপ নামতে যাবে এমন সময় চায়ের দোকানে চকলেট দেখে ওর মনে পড়ে, সন্দীপ কিছু চকলেট কিনেছিল গতকাল রাতে। সেগুলো কি করেছে? এর আগে কখনও ওকে চকলেট খেতে দেখে নি ও। সন্দীপের কাছে গিয়ে চায়ের কাপটা হাতে নিয়ে অপরূপ জিজ্ঞাসা করে, কালকের অতগুলো চকলেট কি করলে? সঙ্গে সঙ্গে সন্দীপের মুখ থেকে বেড়িয়ে আসে, চৌকিদারের ছেলেটাকে দিয়েছিলাম।

একটু থেমে আবার অপরূপ বলে, কখন দিলে? ওকে তো রাত থেকেই পাওয়া যাচ্ছে না। এবারে সন্দীপ চায়ের কাপ শক্ত করে ধরে দাঁত চিবিয়ে বলে, রাতেই দিয়েছি। অপরূপ কিছুক্ষণ কিছু একটা চিন্তা করে, তারপর চায়ে চুমুখ দিয়ে গম্ভীরভাবে জিজ্ঞাসা করে, কত রাতে? কখন দেখা হল ওর সাথে?

সন্দীপ প্রচণ্ড রেগে গিয়ে সোজা অপরূপের দিকে ঘুরে দাঁড়িয়ে বলে, বাঘ শিকার দেখবে আর টোপ ফেলবে না?

অপরূপের মাথা এক মূহুর্তের জন্য জ্ঞানশূন্য হয়ে গেল। মনে হল ও এই জগতেই নেই। কিছুই মাথায় ঢুকছে না, অন্ধকার হয়ে আসছে চারপাশ। মাথাটা হালকা হয়ে আসছে, পা-দুটো মনে হয় আর শরীরের ওজন নিতে পারবে না। গাড়ির হর্নের শব্দে টনক নড়ল। অনেক কষ্টে পা-দুটোকে টেনে হিঁচড়ে নিজের শরীরটাকে গাড়ির ভিতর নিয়ে গিয়ে ফেলল। আর কোন কথা হয় হয় নি সন্দীপের সাথে সারা রাস্তায়।

ফিরে এসে আজ সকালেই অফিসে ঢোকে দুজনেই। সকাল থেকে এখনো পর্যন্ত কোন কথা বলার ইচ্ছা হয় নি অপরূপের। মানসিক চাপ আর অফিসের কাজ দুয়ে মিলে আজ দিনটা প্রচণ্ড কঠিন মনে হয়েছে।

সন্ধেতে অপরূপ ঘরে ফিরেও স্ত্রীর সাথে তেমন কথা বলে নি। টিভির খবরটা ওর ভিতরটাকে কুঁড়ে কুঁড়ে খেয়েছে সারা রাত। ভালো ঘুম হয় নি। সকালে খবরের কাগজটা ভয়ে ভয়ে হাতে নিয়ে বসে, এমন সময় হঠাৎ ওর দশ বছরের ছেলে প্রীতম দৌড়ে এসে ঝাঁপিয়ে পড়ে ওর ঘাড়ের উপর আহ্লাদে।

অপরূপ প্রীতমকে দুহাতে জড়িয়ে ধরে আদর করতে থাকে। ওর দুচোখ বেয়ে জলধারা বয়ে যায় ওরই অজান্তে। সেটা কার জন্য? ও ঠিক বুঝতে পারে না, প্রীতমের জন্য, নাকি চৌকিদারের ছেলের জন্য। আরও বেশী করে আঁকড়ে ধরল ছেলেকে বুকের মধ্যে।।

গল্প - মৌ দাশগুপ্তা

মাতৃহীন
মৌ দাশগুপ্তা


সায়কের বাড়ীতে মানুষ বলতে তিনটে প্রাণী। সায়কের বাবা, সৎ মা আর সায়ক। ওর নিজের মা মারা গেছে সে ছোট থাকতে। সাধারণ মৃত্যু না খুন তা সে জানেনা। কিন্তু তার মায়ের মৃত্যুর পর তার বাবাকে বেশ কিছুদিন জেলে থাকতে হয়েছিল। মামাবাড়ী তার একটা আছে বলে সে কানাঘুষোয় শুনেছে কিন্তু সে বাড়ীতে কে কে থাকে, তা ওর জানা নেই। যেমন জানা নেই সে জায়গাটাই বা কোথায়? পাড়া প্রতিবেশীদের বদান্যতায় ও জানে ওর বাবামায়ের বছর দশেকের বিবাহিত জীবনে বারো ঘর এ উঠানের বাসিন্দা ওর বর্তমান সৎ মাটির অসময় আগমনের কারনেই নাকি আজ ও মাতৃহারা। ওর মায়ের নামও এখন এ বাড়ীতে কেউ নেয় না। একটা ছবি থাকা তো দূর অস্ত। মাকে এখন আর মনে পড়ে না সায়কের। আর মাঝে মধ্যে এই না মনে পড়ার অসহায়তা ওকে হিংস্র করে তোলে। সায়ক তাই তার সৎ মাকে মা ডাকে না। এর জন্য ছোটবেলায় প্রায় প্রত্যেকদিন মার খেতে হত তাকে। এখন ও বড় হয়েছে। তাই সায়কও ভুলে যেতে চায় কিরকম শারীরিক-মানসিক নির্যাতনের মধ্য দিয়ে পার হয়েছে তার ছেলেবেলা । এখন ও কলেজে ভতি হয়েছে তাও নিজের টিউশনি পড়ানো আর খবরের কাগজ ঘরে ঘরে পৌঁছে দিয়ে আসার কাজটার সুবাদে। পাড়ায় ওর পরিবারের খুব বদনাম, এজন্যই বোধহয় তার স্কুলে পড়াকালীন সহপাঠীরা বা পাড়ার সমবয়সীরা খুব একটা তার সাথে মিশতো না। একটু বোধবুদ্ধি হওয়ার পর সায়কের মনে হয়েছে তার সৎ মা মহিলাটিও খুব একটা সুবিধার নয়। ওনার সম্পর্কে কানাঘুষোয় পাড়া বেপাড়ায় অনেক কথাই এখনো শোনা যায়। ঘৃণায়- লজ্জায় সায়ক আপাতত ঘরের সাথে পাট চুকিয়েই দিয়েছে। সটান মেদিনীপুরের সুতাহাটা ছেড়ে কলকাতার কলেজে ভরতি হয়েছে। থাকেও কলকাতায় মেসে।আসার আগে খালি হাত ছিলো, জীবনে প্রথমবার বাবার মনিব্যাগটা তুলে নিয়ে এসেছিলো সায়ক কিন্তু তার জন্য কোনদিন অনুতাপ হয়নি। আগে অনেকবার চুরি না করেই যখন বাবার হাতে চোরের মার খেয়েছে তখন নালিশকারিনী সৎমার মুখ টেপা হাসিটা মনে পরলেই আর খারাপ লাগতো না ওর। এর মাঝে কেটে গেছে দীর্ঘ একটি বছর।

-তিলু ,তোর কি হয়েছে বল তো? একটা সামান্য ভাগের অঙ্ক করতে কারো এতক্ষণ লাগে?
- ঘুম পাচ্ছে সায়কদা।
- তোর তো পড়তে বসলেই ঢুলুনি লাগে রোজ। নতুন আর কি।
- ঢুলুনি লাগে তো জানি। আগেতো এরকম ঘুম পায় নি কখনো।
- সারা দুপুর বিকেল করিস টা কি? তখন ঘুমাতে পারিস না?

- না, দুপুরে ঘরে কেউ থাকে না তো। ঘুমাবো কি করে? পাহারা দিতে হয় না?

- পাহারা আর তুই? কি পাহারা দিস শুনি? খালি বাজে বকা। মারবো এক থাপ্পড়।

তিলু প্রতিবাদ করে কিছু বলতে গিয়ে দিদির দিকে তাকিয়ে থেমে গেল। তান্নি আর তিলু, দুজনেই ঘরে প্রাইভেট টিউটরের কাছে পড়তে বসেছে। তিলু সবে ক্লাস ফোর, ওর দিদি তান্নি ক্লাস এইট। তিলুটা পড়াশুনোয় অমনোযোগী, তুলনায় তান্নিটার মাথা খুব পরিস্কার। দুজনকেই একসাথে পড়াতে হচ্ছে বলে কিছুটা সমস্যা হলেও সায়ক মানিয়ে নেয়। কি করবে? এই ক’টা মাত্র টিউশন। দুর্দিনে যা পেয়েছে সেটাই অনেক বেশি। এর ওপরই ওর পড়াশুনো, খাইখরচা, যাতায়াত। মন্দের ভালো যে তান্নির দিকে বেশি মনোযোগ দেয়ার দরকার নেই। ওদের কথার মধ্যেই বাড়ির ভেতর থেকে হঠাৎ চিৎকার আর কান্নার মাঝামাঝি একটা বোবা চিৎকারভেসে এল। প্রায়ইএটা আসে। মনে হচ্ছে বিকৃত গলায় কেউ যেন কাউকে ডাকছে। মা মা বলার চেষ্টা করছে। মনে হচ্ছে বাক-প্রতিবন্ধী কেউ আছে এখানে। যে কথা বলতে পারেনা। তিলুর মুখটা গম্ভীর হয়ে গেল, যেন প্রবল অস্বস্তি নিয়ে বসে আছে। উঠতে চাইছে না। তান্নি কিন্তু ঝট করে উঠে দাঁড়িয়ে ভাইয়ের দিকে এক ঝলক তাকিয়ে বলল,

- আমি একটু আসছি সায়কদা, বলেই লঘু পায়ে বেরিয়ে গেল।

সায়ক জিজ্ঞাসা করলো,

- তিলু, কে কাঁদছে রে?

- কাঁদছে না, ডাকছে,

- কে ডাকছে? কাকে?

- বলতে মানা আছে।

- কে মানা করেছে?

- বলতে পারবো না।

কথার মাঝে তান্নি ফেরত আসে। হাতে ট্রেতে এককাপ চা আর পকৌড়া। রোজই এই সময় এ বাড়ীর কেউ না কেউ চা আর চায়ের সাথে টা দিয়ে যায়। সায়কের সামনে ট্রেটা নামিয়ে বললো,

- দিদা পাঠিয়ে দিলেন সায়কদা, সেই কলেজ থেকে সিধে এসেছেন। খিদে তো পেয়েছে নিশ্চয়ই।

হাত বাড়িয়ে চা টা নিয়ে সায়ক আবার একই প্রশ্ন করলো,

- কে কাঁদছে রে তান্নি?

তান্নি প্রশ্নের উত্তর না দিয়ে ভাইকে বললো,

- তোকে দিদা ডাকছে কেন দেখ,

তিলু লাফাতে লাফাতে বেরিয়ে গেলে সায়কের দিকে না তাকিয়ে নীচু কিন্তু পরিস্কারগলায় তান্নি বলল,

- ও আমার মা সায়কদা, কথা বলতে পারেন না কিনা। বাবা রেললাইনে কাটা পড়ার পর কাউকে চিনতেও পারেননা।

চরম অস্বস্তি সায়ককে ছেঁকে ধরল। প্রশ্নটা করা খুব জরুরী ছিলো কি?

- এ্যাই! মাত্র সওয়া আটটা বাজে, এখনই হাই তুলছিস ক্যানো? বীজগণিতের পাঁচের চ্যাপ্টারের সবগুলো অঙ্ক কষা হলে ছুটী পাবি। এর আগে নো ঘুম। আমিও বসে রইলাম। নে অঙ্ক কর।
- আজ আর ভাল লাগছে না। কাল তো বিজ্ঞান এক্সাম। রিভিশন শেষ করে নিয়েছি তো। আজ একটু গল্প করো না সায়কদা।

- তুই কিন্তু বড্ড ফালতু কথা বলছিস আজকাল । কোথায় পড়ার সময়টা কাজে লাগাবে না শুধু ফাঁকিবাজি।
- কিন্তু আজ আমার পড়তে মন লাগছে না সায়কদা।
- এটা কি কথা হল মিঠু? এখন বাজে রাত সাড়ে আটটা।

মিঠুর মা ঢুকলেন। মাকে দেখেই মিঠু হাসিমুখে দৌড়ে গিয়ে জড়িয়ে ধরলো।

- আজ আর পড়ব না মামনি প্লীজ। সায়কদাকে বলো না আজ তাড়াতাড়ি ছেড়ে দিতে।

ক্লাশ নাইনের তুলনায় মিঠু বেশ লম্বা, বরঞ্চ ওর মা বেশ ছোটখাটো।এখানে ওদের মা ছেলের সম্পর্কটা ভারী ভালো লাগে সায়কের। ও খেয়াল করে দেখেছে মিঠু কিন্তু ওর বাবাকে বেশ সম্ভ্রমভরে দূর থেকে কথা বলে আর যত আবদার ওর মায়ের কাছে। সায়ক এখানে এলে নিজের মায়ের অভাবটা খুব বেশী করে বুঝতে পারে। মিঠুর মা হাসিমুখে ছেলের মাথার চুলটা আদর করে ঘেঁটে দিয়ে বললেন,

- আজ পাগলটাকে না হয় ছেড়েই দাও সায়ক। একবার যখন বলেছে পড়তে মন নেই তখন কিছুতেই পড়াতে পারবে না। তবে মিঠু, কাল এমনটা হবে না তো বাবা? প্রমিস?

- হ্যাঁ মা, প্রমিস।

- আচ্ছা, সায়ক একটু বসো তবে। আজ বাড়ীতে নারায়ন পূজা ছিল কিনা। প্রসাদ এনে দিই। খেতে খেতে একটু গল্প করে নিয়ে তুমিও আজ একটু তাড়াতাড়িই না হয় ছুটী নাও। বলতে বলতে সায়কের মা বেরিয়ে গেলেন।

- আজ কিসের পূজো রে মিঠু?

একটু থমকে গিয়ে বলবে কি বলবে না ভেবে মিয়ানো গলায় মিঠু বললো,

- আজ আমার মায়ের বাৎসরিক ছিল সায়কদা।

- মানে?

- আমার তো নিজের মা নেই সায়কদা। আমার তাকে মনেও পড়ে না। কিন্তু মামনি বলেছে বছরে এই অন্তত একটা দিন আমায় সেই না দেখা মায়ের আত্মার শান্তির জন্য ভগবানের কাছে প্রার্থনা করতে। মামনি কিছু বললে কি আমি না শুনে পারি?

নাঃ,এখন না সত্যিই বড় কান্না পাচ্ছে। মায়ের জন্য নয়, সায়কের নিজের জন্য চোখ জলে ভরে উঠছে। বাইরে বুঝি বা অঝোরে বৃষ্টি নেমেছে , আজকের বৃষ্টিটা বড়ই অদ্ভুত। থামার নামই নিচ্ছেনা। শুধু ঝরেই যাচ্ছে। আর ঘরের ভিতর লুকানো কান্নার চাপা গমকে কেটে যাচ্ছে এক মাতৃহারা সন্তানের জীবনের কয়েকটি সামান্য সময়ের একক।



শুক্রবার, ২০ সেপ্টেম্বর, ২০১৩

গল্প - অনুপ দত্ত

মনের সঙ্গে খেলা
অনুপ দত্ত



দিন দুই আগে শীতটা একটু কমে এসেছিল৷ আজ সকাল থেকে আবার বেশ জাঁকিয়ে বসেছে৷ ভোরের ঝিলে স্নান করতে নেমে অন্তরা অনুভব করলো ঠান্ডাটা বেশ জবর৷ করতোয়া নদীর বাঁধের উপরে কয়েকটা লোক উঁবু হয়ে বসে আগুন তাপাচ্ছিল৷ পাশ দিয়ে যেতে যেতে অন্তরা টের পেল আগুন তাপানো মানুষগুলোর শরীর থেকে বেশ আগুন লাগা দৃষ্টি এসে ওর ভেজা কাপড়ের শরীরে পড়ছে৷.ভালই লাগছে অন্তরার৷ ভিজে কাপড় চোপর যদি অগ্নি দৃষ্টিতে একটু শুকিয়ে যায় আর কি৷

পরমেশের সকাল হয় বেলা আটটার পর৷ অনেককিছু শুধরেছে পরমেশ বিয়ের পর কিন্তু এটাকে আর শোধরাতে পারেনি৷ আজ যিশু আর পরমেশের ছুটির দিন৷ অনেকক্ষণ ধরে নিরিবিছিন্ন কাজ করল অন্তরা ঠাকুর ঘরে৷ এর মাঝে যিশু এসে একবার উঁকি দিয়ে গেল৷

-ও মা তোমার পুজো হোল ? প্রসাদ দেবে না?

যিশু, ছুটির দিনগুলোতে পারলে বিছানায় গুটিসুটি হয়ে শুয়ে থাকে৷ঠিক যেন বেড়াল ছানা । শুধু লেজটাই নেই আরকি৷ এখানে পরমেশের প্রশ্রয় পায় যিশু৷ সাধারণত সংসারের কোনো কাজ পরমেশের জমে না৷ তার এই সংসারের প্রতি উদাসীনতা ছোট শিশু যিশু কেও স্পর্শ করে৷ সেটা পরমেশ বোঝে না৷ শাশুড়ী মা জীবিত থাকতে বলতেন --

- মা অন্তরা৷এটাতো ওদের বংশে৷ ভয় পাসনি মা৷ নিজেকে শক্ত কর৷.আমিও করেছি৷ তুই একা নোস৷ এটাই বোধ হয় জীবনের খেলা৷ মনের সঙ্গে খেলা৷ মন শক্ত কর৷

যিশুকে ঘিরেই সমস্ত স্বপ্ন রোজকার বেলার মতো আবর্তে ঘুরেছে৷গড়ে উঠেছে তার এক আবাসিক অস্তিত্ব৷ কোনো এক দুর্বল মুহুর্তে পরমেশকে জিগ্যেস করেছিল অন্তরা

-যিশু কে নিয়ে তোমার কোনো স্বপ্ন নেই?

ম্যাগাজিনের পাতা থেকে চোখ তুলে নীরবে হেসে বলেছিল পরমেশ

-দেখ অন্তরা, আমার নিজের কোনো স্বপ্ন সফল হয় নি৷ তাই কারো জন্য স্বপ্ন দেখি না, বরং বলি , ভয় পাই আমি৷ হতে চেয়েছিলাম কত কি৷ বিদেশ যাব৷.ডলারে টাকা ইনকাম করব৷ তা না হতে পেরে হলাম গিয়ে একটা ব্লকের বি ডি ও কেরানি ৷ যার না আছে কোনো আশা না ভরসা৷ রোজকার এই না পাওয়া মরার মাঝে আবার স্বপ্ন দেখে নতুন করে মরব নাকি কারো জন্যে৷

অন্তরা লক্ষ করলো৷.কথাটা বলে পরমেশ টবিলে রাখা যিশুর ফটোটার দিকে কেমন করে যেন চেয়ে রইলো৷

- তুমি কি স্বপ্ন দেখ অন্তরা, যিশু কে নিয়ে ? পরমেশ পাল্টা বলেছিল৷

অন্তরা আর উত্তর করেনি৷পরমেশের হাত থেকে শেষ হয়ে যাওয়া চায়ের কাপটা নিয়ে রান্না ঘরের দিকে এগিয়ে গেছে৷ জানালা দিয়ে বাইরের দিকে দেখে নেয়৷যিশু খেলছে ঝিলের পাশের মাঠটাতে৷ যিশু বেশ রাজা সেজেছে৷

ঠাকুর ঘরে আজ অনেক্ষণ কাটাল অন্তরা৷ আলমারিতে বাসন গুলো সাজিয়ে রাখতে যাছিল৷ পেছন থেকে হঠাত যিশু এসে জড়িয়ে ধরলো৷ ছুটির দিনের আবদার৷অন্তরা বুঝতে পারল৷

পেছন ফিরে দেখে যিশুর মুখ ভর্তি ঘাম..জামাটাও প্রায় ভেজা৷

- হ্যাঁ রে যিশু৷এত ঘামছিস কেন? শরীর খারাপ নয় তো৷

- ও কিছু না মা৷ এত গরম পড়েছে তাই৷ ও মা শোনো না৷.ইস্কুলের মাঠে ক্লাস টেন'এর পিনাকিদা অবিরাম সাইকেল চালাচ্ছে ২৮ ঘন্টা ধরে৷ আগের বাদলদার ২৭ ঘন্টার রেকর্ড ভাঙবে বলে৷ ও মা , ওই যে শুনছো না মাইকে গান বেজে চলেছে৷বলতে বলতে জুতো হাতে নিয়ে এক দৌড় লাগালো যিশু৷দূর থেকে বলল--

-মা দুপুরে খেতে আসব৷ আজকে তো তুমি মাংস রাঁধবে বলেছিলে৷ তোমায় সব দেখে এসে পরে বলবো মা৷

খবরটা যখন এলো তখন দুপুর গড়িয়ে গেছে৷ যিশুর ক্লাসমেট সুনিত প্রায় কাঁধে করে যিশু কে বাড়ি পৌছে দিলো৷ পেটের যন্ত্রণায় যিশুর মুখ কালো হয়ে আছে৷ শরীর কেমন বার বার কুঁকড়ে যাচ্ছে৷ কোলে টেনে নিতে ঝর ঝর করে কেঁদে ফেলল যিশু--

-ও মা আর তোমার অবাধ্য হবো না৷ আমায় ভালো করে দাও মা৷ তুমি যেমন বলবে আমি তেমন হবো মা৷

বাড়িতে কেউ নেই ! পরমেশ ছুটির দিনে তাস পেটাতে গেছে বন্ধুদের সাথে৷ হাসপাতালে অন্তরা নিয়ে গেল একা৷ পাশের ফ্লাটের অর্ক'র বাবাকে রিকোয়েস্ট করলো একটু পরমেশকে খবর দিতে৷

পরমেশ যখন খবর পেয়ে এলো যিশু তখন ঘুমের ইন্জেকশনে ঘুমাচ্ছে৷ পরমেশ দেখে , মাথাটা বালিশের একপাশে হেলে পড়েছে৷ আস্তে করে সোজা করে দিলো পরমেশ যিশুর মাথাটা৷ সারা মুখটা কেমন কালচে হয়ে আছে৷

অন্তরা ডাক্তারের কাছে পরমর্শের জন্য গিয়েছিল৷ ফিরে এসে দেখে পরমেশ এক দৃষ্টিতে চেয়ে আছে যিশুর মুখের দিকে বেডের পাশে দাঁড়িয়ে৷

নিবিষ্ট মনে বড় পরমেশ দেখছে ছোট পরমেশকে৷ কেন জানি সমস্ত স্বপ্ন ভাঙ্গার কারণগুলো একসঙ্গে যেন প্রতিবাদ করে উঠলো পরমেশের ভেতরে৷ তবে কি এই স্বপ্ন দেখার স্বপ্নটাও তার ভেঙ্গে যাবে ? কি একটা ভয়ের আতঙ্ক নিয়ে দ্রুত সে ঘর থেকে বেড়িয়ে এলো ! পাগলা ঘোড়ার মতো মনটাকে ছুটিয়ে শেষ এক চাঙ্গর হাওয়া ফুসফুসে ভরে নিয়ে বাঁধের দক্ষিণ দিকে স্লুইস গেটের রেলিং'এ বসলো পরমেশ৷ তার একদা প্রিয় নদী করতোয়া’র দিকে তাকাতেও যেন ভয় পেল৷.কি জানি করতোয়া নদীর জল’ও যদি শুকিয়ে যায় তার মতো কিছু না পাওয়া মানুষের দৃষ্টিতে৷ ভেতরে ভেতরে একটা সুপ্ত পরমেশ যেন ছোট্ট পরমেশের দিকে এগিয়ে যাচ্ছিল৷

যিশুকে যখন অপারেশন থিয়েটারের নিয়ে যাওয়া হচ্ছিল, .পরমেশ উদ্ভ্রান্তের মতো ছুটে ছুটে এলো৷ ডাক্তার মজুমদার ভ্রু কুঁচকে দেখলেন এই পাগলের মতো লোকটাকে৷ অন্তরা বললে, পরমেশ চক্রবর্তী৷.যিশুর বাবা৷

-ডাক্তার মজুমদার৷অস্ফুট উচ্চারণ করল পরমেশ৷

-ইয়েস৷পরমেশ বাবু৷

- .আমাদের মানে আমাকে কি অপারেসন থিয়েটারে থাকতে দেবেন ?

- না না তা হয় না পরমেশবাবু৷ এরকম নিয়ম তো নেই আমাদের৷

পরমেশের এই মানসিক অস্হিরতায় অন্তরাও স্তব্ধ হয়ে রইলো৷ এ কোন পরমেশ? মধ্যবিত্তের সমস্ত আশা ভঙ্গের নজীর পোড় খাওয়া উদাসীনতার ব্যাকুল পরমেশ৷ তা হলে যিশুর জন্য সে একা নয়৷

অন্তরার ভেতর এবার কেমন টিপ বাঁধা জল ভিজিয়ে দিয়ে যাচ্ছিল তার সমস্ত সত্বাকে ! মার্জনা চাইবার লজ্জা হারিয়ে স্থানুর মতো দাঁড়িয়ে রইলো৷ও'টির লাল আলোটা নিভে গেল হঠাৎ ! দরজা খুলে ডাক্তার মজুমদার বেড়িয়ে এলেন৷.পরমেশ আবার ছুটে এলো ! ডাক্তার একবার তাকালেন পরমেশের দিকে

- Don’t worry ...everything is alright৷যিশু খুব ভালো আছে৷ ঘন্টা তিনেক বাদে দেখা করতে পারেন৷ প্লিজ এখন যেন ডিস্টার্ব করবেন না৷

যিশুর বেডটা দুটো মেল নার্স আস্তে আস্তে ঠেলে নিয়ে যাচ্ছিল কেবিনের দিকে৷.পরমেশ ঝুঁকে পড়ল যিশুর মুখের কাছে! স্পষ্ট অথচ অস্ফুট উচারণ করে বলল পরমেশ

-ভালো হয়ে ওঠ রে বাবা তাড়াতাড়ি৷ভালো হয়ে তোর মার মতো হোস যিশু৷ আমার এই আশা ভঙ্গের কপাল যেন তোর কপালে না লাগে বাবা৷ভালো হয়ে যা৷ভালো হয়ে যা....

আরো কিছু যেন বলতে যাচ্ছিল পরমেশ৷ নার্স দুটো যিশুকে তখন অনেকটা দূর ঠেলে নিয়ে গ্যাছে৷ এবার অন্তরার দিকে তাকালো একবার পরমেশ৷

ওর উদ্ভ্রান্ত চোখের দিকে তাকিয়ে অন্তরার এতক্ষণ টিপ বাঁধা জল উপচে পড়ল অঝোরে৷ সমস্ত পরিবেশ ভুলে গিয়ে সে পরমেশকে জড়িয়ে ধরে কেঁদে ফেলে নীরবে৷ মনের ভেতরে এক কথা গুমড়ে গুমড়ে বেজে গেল তার৷

-ক্ষমা করো পরমেশ৷ক্ষমা করো আমায়৷

ওদের পাশ দিয়ে দুটো ফিমেল নার্স নতুন রুগী কে নিয়ে আবার ও'টির ভেতরে ঢুকে গেল৷

গল্প - আইভি চট্টোপাধ্যায়

ভদ্রা
আইভি চট্টোপাধ্যায়


আমি ভদ্রা । বরাহপর্বত থেকে যাত্রা শুরু করেছি । বরাহপর্বত মানে, সেই পশ্চিমঘাট পর্বতমালা । গঙ্গামুলা থেকে এতদূর এসে পড়েছি । চলছি তো চলছিই । চলাটা আমার ভালোবাসা, চলাটা আমার নেশা । যতক্ষণ না মাযের বুকে ঝাঁপিয়ে পড়তে পারছি, আমাকে চলতেই হবে ।

আমার মা, কৃষ্ণা । মা যে কি সুন্দর, মাযের গায়ের গন্ধে কি যে টান । মাযের কোলে চড়ে আমি সাগরে যাব । আমি একা নয়, আমরা সব ভাইবোনেরা একসঙ্গে সেখানে যাব । এই তো কুদালি পৌঁছে গেলেই আমার বোনের সঙ্গে দেখা হবে আমার । আমার বোন তুঙ্গা । তারপর থেকে তো আমাদের আর আলাদা করে চেনাই যাবে না । তখন আমাদের দুজনের একটাই নাম । তুঙ্গভদ্রা । আমাদের কৃষ্ণা-মা আমাদের পথ চেয়ে বসে আছেন । মায়ের বুকে ঝাঁপিয়ে পড়ে তবে শান্তি । সাগরে যাবার জন্যেই যে আমার এতখানি পথ চলা ।

ভদ্রাবতী পৌঁছে বেশ ভয় হয়েছিল, এই বুঝি চলা শেষ হয়ে গেল । ভদ্রাবতী একটা মস্ত শহর, বড় বড় কারখানা । অনেক মানুষের ভিড় । মস্ত একটা ব্রীজ । অনবরত গাড়ি আসছে আর যাচ্ছে । ব্রীজের ওপর তলায় আবার রেললাইন। যখন ট্রেন যায়, ঝম ঝমাঝম বাজনা বাজে । ব্রীজটা কাঁপতে থাকে । আমার বুকের মধ্যে বান ডাকে ।

ব্রীজ পার হলেই লেভেল ক্রসিং । দুদিকে উপছে পড়া বাজার । আলু, পটল, কুমড়ো, কাঁচা লঙ্কা । একদিকে ছোট বড় মাছ । টপাটপ কেটে ফেলছে দোকানী । আরেকদিকে মুরগির গলা কাটছে মুরগির দোকানে । ছাল ছাড়ানো পাঁঠাগুলো দুলছে আরেক দোকানে । হার্ডওয়ারের দোকানে লোহার আওয়াজ । উল্টোদিকে সাইবার কাফে । কম্পিউটার আর ইন্টারনেট । শান্তিপূর্ণ সহাবস্থান ।

এদিকে মস্ত মুদির দোকান । ওহ না, মুদির দোকান না । শপিং মল । ওখানে মুদির দোকানের জিনিসপত্র থেকে সব্জী জামাকাপড় জুতো মোজা সব পাওয়া যায় । বড় বড় খাবারের দোকান থেকে বিউটি পার্লার । সব ।

শপিং মল ছাড়িয়ে আর একটু এগোলে শাড়ির দোকান । সোনার গয়নার দোকান । মেকী সোনা, ঝুটো পাথরের গয়নার দোকানও আছে একটা । পাশাপাশি । শান্তিপূর্ণ সহাবস্থান ।

রাস্তার ওপারে ঝাঁ চকচকে খাবার দোকান । কে-এফ-সি চিকেন । ম্যাক ডোনাল্ড । একটা শিঙারা কচুরির দোকান। বাজে ডালডায় গরম গরম জিলিপি ভাজা হচ্ছে । আমার নি:শ্বাস বন্ধ হয়ে আসে । নদীর ধার ঘেঁষে গড়ে উঠেছে সব । এত ভিড়, এত আওয়াজ, আমার কষ্ট হয় খুব ।

এইখানে এই ছোট্ট জায়গাটায় এসে আমি হাঁফ ছেড়ে বেঁচেছি । এই জায়গাটার নাম আমি জানি না । কেউ বলে কালসা, কেউ বলে কাজরা । তবে ভদ্রাবতীর ভিড় ছাড়িয়ে এসে এখানে নিঝুম শান্তি ।

একদিকে বড় বড় সবুজ গাছ । গাছের ফাঁক দিয়ে দেখা যায় ছোট ছোট কুঁড়েঘর, সবুজ সবুজ ক্ষেত । এদিকে একটা গ্রাম । বড্ড ইচ্ছে করে একবার গ্রাম দেখে আসি । আমার তো আর সে উপায় নেই । তবে গ্রাম দেখা না হলেও গ্রামের লোকজন সবাইকেই চিনি । সবাই আসে আমার কাছে ।

ছোট ছোট ছেলেমেয়েরা আমার কাছে এসে খেলাধুলো করে । বর্ষাকালে ঘাসে আগাছায় ভরে যায় । তখন সাপখোপ এসে ঘোরাফেরা করে । পোকামাকড়, ফড়িং, প্রজাপতি । রঙ বেরঙের পাখি । ঘাসফুলে ভরে ওঠে জায়গাটা । আরেকদিকে অনেকখানি বালির চড়া । একটু উঁচু হয়ে ওদিকে ঢাল নেমেছে । তাই ওদিকটা দেখা যায় না । কে জানে ওদিকেও গ্রাম আছে কিনা । ওদিক থেকে লোকজনও তো বিশেষ আসে না । তবে মাঝে মাঝে কাঁসর শিঙা ঢোলক বাজে । মনে হয় কোনো আদিবাসী গ্রাম আছে । হয়ত কাছে নয় । হয়ত ওদিকে আর একটা নদী বা পুকুর আছে । তাই ওরা আমার কাছে আসে না ।

আমারই বা আছে কি ! ভদ্রাবতীতে বিশাল বাঁধ দিয়ে আমার তো সব নিয়েই নিয়েছে । ইচ্ছেমতো ঢেউ নিয়ে চলার স্বাধীনতা নেই আমার । এখানে এসে তো একেবারেই সব হারিয়ে আছি । এই যে মাঝে এতখানি চড়া পড়ে আছে, এই যে এদিকে কালো পাথরগুলো জেগে উঠেছে, এসব তো জলের নিচে থাকার কথা । ছোট মাছ, ব্যাঙাচি, ছোট ছোট জলের পোকাগুলো কি কষ্টে যে বেঁচে আছে ।

কাজরা গ্রামের ছোট্ট রাখাল ছেলেগুলো গরু চরাতে এসে যখন ঝাঁপিয়ে পড়ে জলের মধ্যে, কি ভালো যে লাগে আমার । একমাত্র তখনই মনে হয়, আমি বেঁচে আছি ।

এমনি সারাদিন আমি একা একাই থাকি । রাজি ছাড়া কেউ এমন নেই, যে রোজ আমার কাছে আসে । গাঁয়ের লোক অবশ্য আসে নদীর ধারে । তবে তারা কেউ আমার কাছে আসে না । মেয়ে-বউরা জল নিয়ে যায়, গাঁয়ের মোড়ল ওই অশ্বত্থ গাছটার তলায় বসে কাজিয়া মেটায় । ছেলেরা কখনো কখনো খেলা করতে আসে । আর আসে গাঁয়ের গরু ছাগলগুলো ।

আজকাল মাঝে মাঝে একটা লম্বা ছায়া এসে দাঁড়ায় । মানুষটাকে অবশ্য দেখি নি । ও কোনোদিন আমার কাছে এসে বসে নি । ছায়ামানুষ এসে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে কি দেখে আমি জানি । ও রাজিকে দেখতে আসে ।

রাজি । রাজশ্রী । নামে রাণী, নামে শ্রী । কিন্তু রাজির মুখে এক পৃথিবী বিষাদ ।

আমার মতই শীর্ণ, নিষ্প্রাণ, প্রায় গতিহীন জীবন । আমার বুকের মধ্যে এতখানি চড়া, বড় বড় কালো পাথর জেগে আছে । রাজির শিরা বের হয়ে যাওয়া হাতে কড়া । শুকনো মুখে চোয়ালের হাড় জেগে থাকে আমারই মত । রাজিকে দেখলেই আমি নিজেকে দেখতে পাই ।

সারাদিন যন্ত্রের মত খাটে মেয়েটা । কিন্তু কেউ খুশি হয় না । মা, বাবা, ভাই, বোন, একটা বিয়েওলা বড় দিদি আসে মাঝে মাঝে, সে-ও না । মারের দাগে ওর হাতে কপালে গালে কালশিটে । কেন যে ওরা অত মারে ওকে, কে জানে । মেয়েজন্মের অপরাধ কিনা কে জানে । রাজির অন্য বোনেরা, দিদি, বৌদিরা, মা .. তারাও তো মেয়ে । তবে কেন তারা সমব্যথী নয় ?

রাজি আসলে নিজের কথাটা বলতেই পারে না । যে আত্মবিশ্বাস থাকলে সংসারে নিজের জায়গা ধরে রাখা যায়, নিজের ভেতরে যে জোর থাকলে ‘আত্মদীপো ভব’ বলা যায়, রাজি তা জানে না । রাজির জীবন বয়ে চলেছে আমারই মত । গতিহীন, দিশাহীন ।

আমার চলার ওপর যেমন আমার কোনো হাত নেই । কোথাও মস্ত বাঁধ, কোথাও ঢাল কেটে রাস্তা বন্ধ । স্বছন্দে বয়ে চলার আনন্দ নেই । আমি আজ গতিহীন, দিশাহীন । রাজিরই মত ।

অথচ প্রবাহ রক্ষা করাই নদীর ধর্ম । তার প্রবাহ রক্ষার মধ্যে দিয়েই মানুষের স্নান, পান, ক্ষেতের কাজ । ঠিক মানুষের জীবনের নানা প্রবাহের মতই । জীবনের নিজস্ব গতির প্রবাহ । সম্পর্কের প্রবাহ । বর্ণে ছন্দে কাটানো দিনরাতের প্রবাহ।
রাজির জীবনে এ প্রবাহ থেমে গেছে । রাজিকে শ্বশুরবাড়ি থেকে তাড়িয়ে দিয়েছে । রাজির কোথাও যাবার জায়গা নেই। তাই রাজি আমার কাছে আসে বারবার । বাড়ির লোকে রাগ করে । কাজে ফাঁকি দেওয়ার অভিযোগে ওকে শাস্তি দেয় ।

কিন্তু রাজি আবার আসে । ওর আর কোথাও জায়গা নেই । নইলে আমারই বা আছে কি ! এই তো শুকিয়ে যাওয়া নদী । জল নেই, ঢেউ নেই । কালো কালো পাথর জেগে আছে । গাঁয়ের বৌরা কাপড় কাচতে গিয়ে দেখেছে, সেই শীর্ণ রেখার দিকে তাকিয়ে চুপ করে বসে আছে রাজি । বিকেলে নদীর ধারে খেলা করতে গিয়ে ছেলেরা দেখেছে, নদীর জলে নিজের ছায়ার দিকে চেয়ে বসে আছে রাজি ।

ভোরবেলা যখন পাখিরা জেগে ওঠে, গাছে গাছে দোলা লাগে, তারও আগে রাজি উঠে পড়ে । আকাশ বাতাসের কথা বাদই দাও, গ্রামের রাস্তাটাও তখন মায়া মায়া ।

রাজি এসে নদীর জলে নামে । অঞ্জলি ভরে চোখে মুখে দেয়, মাথায় ছোঁয়ায় । পুবের আকাশ তখন লাল হয়ে উঠছে । জলের মাঝে দাঁড়িয়ে সেইদিকে তাকিয়ে থাকে রাজি । রাজির সঙ্গে সঙ্গে আমিও আকাশকে হেসে উঠতে দেখি । গাছে গাছে পাখিরা জেগে উঠে গান গায় । রাজির সঙ্গে সঙ্গে আমি সেই গান শুনি । ভোরবেলা এই স্নিগ্ধ শান্ত সময়ে কুরূপা রাজির মুখখানা সোনা আলোয় মায়া মায়া হয়ে থাকে ।

আর সেই মায়া মায়া সময়ে আমার নতুন করে সাধ জাগে, আবার চলা শুরু করি । এই যে বালির চড়া, তাকে পেরিয়ে যাই । আমার বুকের মধ্যে সাগর ডাক দেয় ।

কিন্তু রাজির মতই আমি নিরুপায় অসহায় । গ্রামের লোকে আমার একদিকে বাঁধ দিয়ে খাল কেটে দিয়েছে । যেটুকু জল আছে, তা খালের দিকেই বয়ে যায় । কি করে এগিয়ে যাব আমি ! কে পথ করে দেবে আমায় !

কে পথ করে দেবে রাজিকে !

অনেক রাতে, চারদিক নিঝুম হলে রাজি একবার আমার কাছে আসে । আকাশে মায়াবী চাঁদ । চাঁদের আলোয় আমার জলের ওপর চিকচিকে রূপোলী মায়া । সেই মায়ার দিকে তাকিয়ে চুপ করে বসে থাকে রাজি ।

দুপুরবেলা সব কাজ শেষ করে গাঁয়ের বৌরা আমার কাছে এসে বসে । নদীর ধারে, গাছের ছায়ায় । সেখানে রাজিকে কেউ ডাকে না । রাজি তখন খালের মুখটায় বসে কাপড় কাচে । তখন আবার ছায়াটা এসে দাঁড়ায় । লম্বা ছায়াটার দিকে তাকিয়ে কেমন চমকে উঠে রাজি গায়ের কাপড় টেনে নেয় ।

শুধু একদিন চঞ্চল হয়েছিল । যেদিন মানুষের ছায়াটা একেবারে নদী পেরিয়ে এসে রাজির মুখোমুখি দাঁড়িয়েছিল ।

‘চলে যাও । আর কক্ষনো এসো না তুমি ।‘

ছায়ামানুষ বুঝি রাজির চেনা মানুষ ! আমার কৌতুহল হলেও জানতে পারি না । সেদিন চলে গেলেও ছায়ামানুষ আবার আসে । আবার । বারবার ।

শুকনো দু’চোখ তুলে রাজি বলে, ‘কেন আসো বারবার ?’

‘না এসে পারি না যে । তুমি বুঝি সব ভুলে গেছ রাজি ?’

‘হ্যাঁ, ভুলে গেছি । তুমিও ভুলে যাও । বেশ তো সংসার করছ, কাজকর্ম করছ । সে নিয়ে থাকো না কেন? কেন বারবার আসো ? মায়া ? করুণা ?’

আমার মনে হয়, এইসময় যদি রাজির চোখে দু’ফোঁটা টলটলে জল আসত কিংবা আঁচল দিয়ে মুখ ঢাকত রাজি, তবে ছবিটা সম্পুর্ণ হত । তা হয় না । রাজি যেমন হাসতে ভুলেছে, তেমনই কাঁদতেও ভুলে গেছে । গলার কাছে নীল একটা শিরা জেগে উঠে শুধু রাজির মুখটা আর কুরূপ হয়ে যায় ।

সেই নীল শিরাটার দিকেই মায়ার চোখে চায় ছায়ামানুষ, ‘আর একবার রাজি । আর একবার ..’

নদীতে জল নিতে এসে, কাপড় কাচতে এসে গাঁয়ের মেয়ে বউরা আজকাল রাজির দিকে আড়ে আড়ে চায় । কখনো বা হেসে গড়িয়ে পড়ে । ‘ও রাজি, কি রে ? এতদিন পর ফিরে এসেছে, তোর জন্যে নাকি ?’

‘ও রাজি, তাহলে তোকে বিয়ে করার ভয়ে পালিয়ে গেছিল কেন ? জিজ্ঞেস করিস নি ?’

রাজি উত্তর দেয় না ।

রাজির বৌদি সবার সামনেই রাজির চুল ধরে টানে, ‘নদীর ধারে এসে বসে থাকিস এই জন্যে ?’

রাজি মুখ নামিয়ে থাকে ।

‘বাড়ির লোক তাড়িয়ে দিয়েছে তো ওকে । ওর অসুখ হয়েছে না ? ওর রক্ত খারাপ হয়ে গেছে ।‘ কেউ কেউ খবর
আনে, ‘তাই তো একলা এখানে ঘর বেঁধে থাকে । এখন আবার পুরোনো ভালোবাসা জেগেছে তাই ।‘

অসুখের কথাটা বুঝি রাজি জানত না ! ওর ভাষাহীন চোখ অমন চমকে উঠল কেন !

আমি নিজে নিজেই একটা না-বলা গল্প বুঝে ফেললাম । রাজির সঙ্গে বিয়ের কথা উঠেছিল যার, সে গাঁয়ের কাউকে কিছু না বলে চলে গেছিল । অলক্ষুণে মেয়েকে সেই লগ্নেই বিয়ে দিয়ে পর করে দিয়েছিল রাজির বাড়ির লোক । আর রাজির কপাল যেমন । সে বাড়ি থেকেও একদিন চলে আসতে হয়েছিল । আজ অসুস্থ মানুষটা বুঝি সেদিনের দোষ মুছে ফেলতে চায় ।

অসুখ হোক, আর যা-ই হোক, এমন বিশ্রী ব্যাপার মানবে কেন কেউ ? দোষ তো রাজিরই । নইলে এত বছর পর একটা লোক আবার এমন নির্লজ্জ হয়ে ওঠে ? রূপ নেই, গুণ নেই, এমন মেয়ের টানে কোনো মানুষ আসবে কেন ? কখন আসে?
কুরূপা মেয়েরা কি সংসার করে না ? তাহলে রাজি কেন পারে নি ? কেন স্বামী রাজিকে ছেড়ে অন্য মেয়েকে ঘরে তোলে? সব দোষ রাজির । কিছু তো একটা কারণ আছেই, নইলে দিনের মধ্যে দশবার করে নদীর ধারে যাওয়া কেন ? ওই তো শুকিয়ে যাওয়া নদী । জল নেই, ঢেউ নেই ।

গাঁয়ের মেয়ে বউরা বলতে লাগল, ‘সারাদিন নদীর ধারে থাকে কেন রাজি ? বদ মতলব না থাকলে এমন হয় ?‘
গাঁয়ের মোড়ল বলল, ‘এই নদীটাই অপয়া । এই নদীর জলে শয়তান বাস করে ।‘

সবাই সায় দিল, ‘ঠিক । ঠিক । নদীতে জল নেই । ঢেউ নেই । একটা ব্যাঙাচিও বাঁচে না এ জলে । নদীর জলে বিষ আছে নিশ্চয় । নৌকো চলে না । চাষের কাজেই বা কতটুকু লাগে ? এ নদীটা বুজিয়ে দাও । তবেই শয়তানের মরণ হবে।‘

আরো অনেক কথা হল । গাঁয়ের বুড়োরা এই নদীর ধারে বসেই তো রাজনীতি করে । নেশাখোর ছেলেগুলোর নেশার ঠেকও তো এই নদীর ধারেই । শাশুড়ি-ননদের নামে নিন্দামন্দ এই নদীর ধারে এসেই বেশি হয় । গত বছর দু’ দু’জন কিশোর ডুবে গেল এ নদীতে । অথচ এমন কিছু ডুবে যাবার মত জল নেই । মাথাটা জলের মধ্যে পাথরে লেগে গিয়েই হল । ছোট ছোট ছেলেমেয়েরা এসে নদীর ধারে খেলা করে, নদীটা খারাপ বলেই ওদের শরীর খারাপ হয় । নদীর ধারে এত গাছ । ছেলেমেয়েদের মাথায় গাছের ডালও ভেঙে পড়তে পারে । গাছের ওপর বজ্রপাত হতে পারে ।

দরকার কি এত ঝামেলা রেখে ! নদী না থাকলেই কেউ আর এদিকে আসবে না । গাঁয়ের সব মানুষ সজাগ হয়ে উঠেছে এবার ।

খুব ভয় করছে আমার । তাহলে কি এখানেই যাত্রা শেষ ? আর দেখা হবে না বোনের সঙ্গে ? মাযের কোলে ঝাঁপিয়ে পড়া হবে না ? মোহানার মুখে দাঁড়িয়ে সাগর দেখা হবে না ? সাগরের সঙ্গে সঙ্গম .. আহ, আর হবে না আমার ?

গাঁয়ের লোকেরা রাজ্যের নোংরা ফেলা শুরু করেছে । নদীতে বাসন মাজা, কাপড় কাচাও বন্ধ । কেউ আর স্নান করতে, জল নিতে নামে না । সরু ধারাটা বয়ে যাচ্ছিল, সেখানে গাছের গুঁড়ি ফেলে মাটি ফেলে রাস্তা বন্ধ হচ্ছে । আসল কথাটা জেনে ফেলেছি আমি । এই নদী, নদীর ধারের জমি সব নিতে চায় ওরা । এখান দিয়ে পাকা রাস্তা হবে । বড় বড় বাড়ি উঠবে । বাঁধ দিয়েও আশ মেটে নি মানুষের ।

এই নদীর জমি নিয়ে দু’ দল লোকের লড়াই লেগেছে । নদী নিয়ে তাদের কোনো আগ্রহ নেই । নদী না থাকলেই বা কি ! জলের জন্যে ভাবনা নেই । ভদ্রাবতী থেকে জল আসছে । ওখানে বাঁধ দেবার পর জলের বড় পুকুর তৈরী হয়েছে যে । না না, পুকুর না । সরোবর । লেক । লেক ঘিরে চমত্কার বাগান । ওটা একটা ট্যুরিস্ট স্পট ।

বোতলে ভরে, বড় বড় ক্যানে ভরে আমার জল বিক্রী হয় এখন । রাস্তার নিচে দিয়ে পাইপ করে কত দূর পর্যন্ত আমার জল নিয়ে যাওয়া হয় । আমার এই শুকিয়ে যাওয়া নদী ওদের কাজে লাগবে না আর ।

রাতারাতি বদলে গেছে এ গাঁয়ের লোক । তাদের কারো চোখে লোভ, কারো চোখে ভয় । বিদ্বেষ, ঘৃণা ।

খুব কষ্ট হচ্ছে আমার । গভীর কষ্ট ।

রাজি এসে মুখ শুকনো করে বসে থাকে আমার কাছে । একদিন ফিসফিস করে বলেছে, ‘তোমার সঙ্গে সঙ্গেই আমারও যাত্রা শেষ হবে ।‘

এ কথাটার মানে কি, আমি বুঝি নি । কিন্তু একজন মানুষ, অন্তত একজন যে আমার কষ্ট বোঝে তা জেনে আমার বুকের মধ্যে থেকে জল উছলে উঠেছে ।

আমি অবশ্য জানতাম না, আরো একজন মানুষ আমাকে গভীর ভাবে দেখে । সেই দৃষ্টিতে লোভ, ভয়, বিদ্বেষ নেই । রাজির মুখ থেকে চোখ সরিয়ে নিয়ে সে আমারই দিকে চেয়ে থাকে । সে দৃষ্টিতে মায়া, মমতা, ভালোবাসা । আর আজ এতদিন পরে ছায়ামানুষকে আমি চিনতে পারলাম ।

এ তো সেই ছেলেটা । হাফপ্যান্ট পরে খালি গায়ে আমার জলে দাপাদাপি করত । এই তো সেই ছেলেটা, যে একদিন ছোট্ট নৌকো করে রাজিকে নিয়ে আমার জলে ভেসেছিল ওই চাঁপা গাছের তলা থেকে । তখন তো আমার দুই ধারে কত নৌকো । সারাদিন ধরে কত পারাপার । তবু ওদের মনে আছে আমার । নৌকোয় বসে আমার জলে ভালোবেসে হাত দিয়েছিল রাজি । তারপর এই এতগুলো বছর কোথায় ছিল ও ?

কেন জানি না, বেশ স্বস্তি হল আমার । সেই যে হাফপ্যান্ট, সময়ে অসময়ে এসে গাছের ডালে চড়ে পাখির বাসা খুঁজে বার করত, তরতর করে নারকোল গাছে চড়ে পড়ত, নদীর জলে ঝাঁপিয়ে পড়ে সাঁতার কেটে পারাপার করত, সে এখন কত শান্ত ভদ্র সুন্দর । আমি বেশ নিশ্চিন্ত হলাম ।

গাঁয়ের লোকের কাছে অন্য কথা বলতে লাগল সে । নদী ঈশ্বরের আশীর্বাদ । নদীর ধারে সারাদিন ধরে মানুষের মেলা। তা কোনো শয়তানের টানে নয় । নদী একজন মানুষকে আরেকজন মানুষের কাছে টেনে আনে । নদী মানুষকে সামাজিক হতে শেখায় ।

নদীর জলে আলো-ছায়ার খেলা । নদীর ধারে ধারে সবুজ ক্ষেত, চিরসবুজ বনানী । নদী সুন্দর । নদী প্রাণ দেয় । তাই না যত জলের প্রাণী, শামুক গেঁড়ি গুগলি থেকে ছোট বড় মাছ, না-দেখা অসংখ্য জলের প্রাণী বেঁচে থাকে । শুধু প্রাণী কেন, উদ্ভিদ নেই ? সবুজ শ্যাওলা থেকে রঙিন শালুক পদ্ম । আহা, বড় সুন্দর । এই যে কত হাঁস .. ওই একটা পানকৌড়ি ডুব দিয়ে উঠল .. সকালবেলা যে সাদা বকের সারি আকাশ আলো করে উড়ে উড়ে আসে .. নদী না থাকলে এমন হত ?
 
নদী সুন্দর । নদী ভালো । নদীর জল ভালো । নদীর হাওয়া ভালো । আমাদের ক্লান্তি দূর করে, অবসাদ বিষাদ দূর করে। নদী না থাকলে মানুষের অনেক ক্ষতি । নদীর জল নোংরা করলে মানুষের ক্ষতি ।

শুধু মুখে বলা নয়, আমার চলার রাস্তা থেকে সব বাধা দূর করার ইচ্ছেও জানিয়েছে সে । বন্ধুদের সঙ্গে নিয়ে আমার জল পরিষ্কার করা, কেউ যাতে নোংরা না ফেলে সে জন্যে পাহারা দেওয়া ।

গাঁয়ের লোকেরা এখন তিন ভাগে ভাগ হয়েছে । একদল লোক, যারা নদী শয়তান শুনে রাগ করেছিল, তারা নদীর এত গুণের কথা শুনে শান্ত । তারা আর নদী নিয়ে মাথা ঘামায় না ।

আর একদল লোক, রাজিও তাদের মধ্যে একজন, তারা ভালোবেসে রোজ আমার কাছে আসে । আমার চলার পথের বালি, পাথর, গাছের ডাল সরিয়ে দেয় ।

কিন্তু আরেকদল লোক নির্মম, নিষ্ঠুর । তারা প্রতিজ্ঞা করেছে, এই জমি তারা নেবেই । দরকার হলে রক্ত ঝরবে, লাঠি বল্লম সড়কি বন্দুক সবরকম দিয়ে তারা লড়াই করবে ।

নতুন করে ভয় হচ্ছে আমার । আমাকে নিয়ে মানুষে মানুষে এমন সংঘর্ষ হবে ?

সেদিন সারা বেলা ধরে সে কী হট্টগোল । একদল মাটি ফেলতে এসেছে । ট্রাক ট্রাক মাটি, বালি । নদী বুজিয়ে ফেলবে । আরেকদল সার দিয়ে নদীর ধারে বসে । মাটি ফেলতে দেবে না ।

পাখিরা ভয় পেয়ে এ গাছের মাথা থেকে ও গাছের মাথায়, তারপর ছটফটিয়ে আকাশে উড়ে গেল । একদল ছাগল এ পাশের সবুজ ঘাসে মাথা ডুবিয়ে ঘাস খাচ্ছিল, তারা ভয় পেয়ে ছুটে চলে গেল । বড় বড় কালো মোষগুলো ভয় পেয়ে জল ছেড়ে উঠে গেল । গাছের ডালগুলো মাথা নাড়িয়ে নাড়িয়ে পাতা ঝরাতে লাগল । আশেপাশের বাড়িগুলো দরজা-জানলা বন্ধ করে নিঝুম হয়ে গেল ।

রাত হল । চারদিকে নি:সীম অন্ধকার । নিস্তব্ধ । নি:শব্দ । মাথার ওপর চাঁদ নেই আজ । আকাশের তারাগুলো কেমন ভয় পেয়ে তাকিয়ে আছে ।

রাজি বসেছিল আমার কাছে । ওপারে বসেছিল রাজির ছায়ামানুষ । নিশ্চুপ । তাকে নিয়ে রাজিকে নানা বদনাম দেবার পর থেকে সে আর রাজির কাছে আসে না । গাঁয়ের মেয়ে-বউরা অবশ্য অন্য কথা বলে । ওর অসুখের কথাটা জানাজানি হয়ে গেছে বলেই ভয় পেয়ে সরে গেছে ও । রাজিও নিশ্চয় সব বুঝতে পেরেছে ।

নিজের মনে ভাবছিলাম । দেখতে পাই নি । গাছের মাথায় পাখিগুলো অসময়ে কিচির মিচির করে উঠল । হাওয়া নেই, তবু পাতাগুলো দুলতে লাগল । হাতকাটা গেঞ্জি, শক্ত চোয়াল, নির্মম চোখ । হাতে ধারালো অস্ত্র । রাজিকে তুলে নিয়ে যাচ্ছে একদল নির্মম মানুষ । নদীর বন্ধু হবার শাস্তি দেবে । কুরূপা হোক, আর অলক্ষুণেই হোক, মেয়ে তো । মেয়েদের শাস্তি দেবার অধিকার পুরুষের আছেই । এমন শাস্তি দেবে, গাঁয়ের লোক আর বাধা দেবার সাহস পাবে না ।

স্তব্ধ মুহূর্ত । অনিশ্চিত মুহূর্ত ।

আকাশের একটা তারা টুপ করে খসে পড়ল । আর কে যেন আমার জলে ঝাঁপ দিল । সাঁতার । ডুব সাঁতার । সাগর সঙ্গমে আমার যেমন গতি বেড়ে ওঠে, সেইরকম বেগে কে যেন জল সরিয়ে যেতে লাগল ।

তারপর বজ্রনির্ঘোষ । কী যে হল, আমি ঠিক বুঝতে পারলাম না ।

শুধু দেখতে পেলাম, রাজিকে ছাড়িয়ে নিয়েছে ছায়ামানুষ । এখন আর ছায়া নেই, চাঁদের আলোয় পরিষ্কার দেখা যাচ্ছে তাকে ।

মুখোমুখি দুই দল ।

‘নদী থাকবে না । নদী শয়তান । ও মেয়েমানুষটাকে ছেড়ে দিচ্ছি, নদী আমাদের চাই ।‘

‘না । নদী জীবন । নদী না থাকলে জীবন থাকে না । আর মেয়েমানুষ আবার কি ? ও মানুষ । একজন আস্ত মানুষ ।
তোমাদের গায়ে বুঝি অনেক জোর ? তাই মানুষের ওপর সে জোর দেখাচ্ছ ?’

‘ও তো একটা নষ্ট মানুষ । ওর জীবনের দামই বা কি ? বেশ তো, ওকে তো ছেড়েই দিয়েছি । ওকে নিয়ে চলে যাও । আমরা নদী চাই না । নদী না থাকলেই জীবন । বড় বাজার, মাল্টিপ্লেক্স, বড় বড় বাড়ি । অনেক মানুষের জীবন । আমরা ওই কালো অন্ধকার কাটিয়ে আলো জ্বালাব । ঝলমলে আলো ।‘

‘কোথায় কালো ? অন্ধকারই বা কোথায় ? নদীর জলে ওই দ্যাখো, কেমন রূপোলী চাঁদের আলো । আকাশের তারাগুলো কেমন ঝিকিমিকি আলো জ্বেলে রেখেছে । নকল আলোয় কি আর আসল আলো আড়াল হয় ? সাদাকে কালো করে দেখলেই হল ? তাই তো আলো থাকলেও সব অন্ধকার দেখায় ।‘

‘তুমি বুঝি কালো দেখতে পাও না ? পৃথিবীতে বুঝি শুধুই আলো ? অন্ধকার নেই ?’

‘না, নেই ।‘

‘নেই ?’ হাত থেকে খসে পড়ল তীরধনুক, বল্লম বন্দুক । ‘কি করে বলছ এ কথা ? অন্ধকার একটা বাস্তব । অন্ধকার নেই ? কালো নেই ?’

‘না গো । নেই । বাস্তব অবাস্তব বলেও কিছু নেই । আমাদের জানার বাইরে আছে অনেকখানি । সব আলো, সব সুন্দর
.. কোথাও কালো নেই, কোথাও অন্ধকার নেই .. এমন কখন হয় জানো ? যখন নিজের ভেতরে আলো জেগে থাকে ।‘

এমন কথা তো কেউ বলে নি আগে ! কেড়ে নিতে হবে, ক্ষমতায় শক্তিতে বেড়ে উঠতে হবে, এই তো জেনেছিল সবাই । আলো জ্বালার কথা কেউ তো শেখায় নি । তাই তো । চারদিক আলো আলো হয়ে উঠলেই না ঠিক ঠিক দেখা যায় । নদীকে, প্রকৃতিকে, নিজেকেও ।

আমি দেখলাম দু’দল মানুষ একে অন্যের দিকে তাকিয়ে আছে । তাদের চোখে ভালোবাসা । বুকের মধ্যে আলো জেগে উঠলেই এমন চোখ হয় ।

এখন আর ভিড় নেই । শুধু দুজন মানুষ । একে অন্যের দিকে চেয়ে আছে ।

‘তুমি বাড়ি যাও রাজি ।‘

‘চলো ।‘ রাজি একদিকে এগিয়ে গেল ।

‘ওদিকে কেন রাজি ? তুমি বাড়ি যাও । আমি নিজের ভুল বুঝতে পেরেছি । আর বিরক্ত করব না তোমায় ।‘

‘তুমি যে বললে, নিজের ভেতর আলো জ্বালার কথা ? তাহলে বাধা দিচ্ছ কেন ? আমার বুঝি নিজের ভুল বোঝার কথা থাকবে না ?’

‘কিন্তু আমার অসুখের কথাটাও সত্যি । রক্ত খারাপ হয়ে গেছে আমার । ওরা বোধহয় ঠিকই বলেছে । অসুখ হয়েই মন দুর্বল হয়েছে আমার ।‘

‘তাই ?’ হাসলে যে রাজিকে এমন সুন্দর দেখায় আমি জানতাম না । ‘তাহলে কুরূপা অলক্ষুণে মেয়ের সঙ্গে অসুস্থ দুর্বল মানুষের জোড় । এক্কেবারে ঠিক ঠিক । না ?’

‘মায়া করছ রাজি ? অসুখ হয়েছে বলে করুণা ?’

‘তাই মনে হচ্ছে তোমার ? এই দ্যাখো, এই নদীর দিকে চেয়ে দ্যাখো । সব হারিয়েও বয়ে চলেছে । জীবনের অন্য নাম হল গতি । বারবার ওর কাছে এসেও আমি সেটা জানতে পারি নি । আজ তুমিই তো শেখালে আমায় । আমি বুঝি নিজের ভেতরে আলো জ্বালাব না ?’

সুন্দর করে হাসল সে । ‘এসো তাহলে । আমরা দুজন মিলে নদীকে ভালোবাসি ।‘

আমার বুকের মধ্যে বান ডাকল । উছলে পড়ল আলো । আর মানুষ নদী নিয়ে উদাসীন নয় । তাই বুঝি এতদিন পর নদীতে জোয়ার এল । আমার যাত্রা শুরু আবার ।

কুদালি পৌঁছে গেলেই আমার বোনের সঙ্গে দেখা হবে আমার । আমার বোন তুঙ্গা । তারপর থেকে আমাদের আর আলাদা করে চেনাই যাবে না । তখন আমাদের দুজনের একটাই নাম । তুঙ্গভদ্রা । আমাদের কৃষ্ণা-মা আমাদের পথ চেয়ে বসে আছেন । মায়ের বুকে ঝাঁপিয়ে পড়ে তবে শান্তি । সাগরে যাবার জন্যেই যে আমার এতখানি পথ চলা ।

গল্প - মৌ দাশগুপ্তা

অল্প-স্বল্প গল্প-গাথা
মৌ দাশগুপ্তা



বৃহস্পতিবার সকাল থেকেই সিনহা বাড়ীর মহিলা মহলে সাজ সাজ রব, অথচ দেখতে গেলে ব্যাপারটা এমন কিছু আহামরি নয়। প্রতি মাঘী পূর্ণিমায় এ বাড়ীর আরাধ্যা কমলা কিশোরীর পূজো হয়। এ বছর একে মাঘী পূর্ণিমা বৃহস্পতিবারে পড়েছে, তারওপর বাড়ীর গিন্নী সুশীলা দেবীর বিচ্ছিরি ধরনের ডায়াবেটিস ধরা পড়ায় নতুন বউ রাই এর ওপর পুরো ঝঞ্ঝাটটা এসে পড়েছে। সে বেচারা এমনিতেই একটু ধীর স্বভাবের , তায় মেজাজী শাশুড়ীকে একটু ভয়ই পায়, কখন কোন কাজে কি খুঁত ধরা পড়বে আর মিষ্টি কথার হূল খেতে হবে, সেটা ভেবেই একটু তফাত থাকে, আজ আর বেচারীর রেহাই নেই।

বাড়ীর লোকসংখ্যা যে অনেক তা নয়, গৃহকর্তা কেশব বাবু, বাড়ীর গিন্নী সুশীলাদেবী,তাঁদের ছেলে কৃষ্ণমোহন, ছেলে-বৌ রাই, কলেজ পড়ুয়া দুই মেয়ে কান্তা আর করুণা,কেশব বাবুর দূর সম্পর্কের বিধবা ভাগ্নে-বৌ বনলক্ষ্মী (বাড়ীর বিনা পয়সার রাঁধুনী), আর সব সময়ের কাজের লোক সাবিত্রী, কূল্যে আটজন। বাড়ীর পুরুষমানুষরা অত ভক্তিমান নন, দুজনেই যথানিয়মে এবং যথাসময়ে অফিসের উদ্দেশ্যে বেরিয়ে গেছেন অতএব মহিলা মহল সোৎসাহে ভীড় জমিয়েছেন দোতলার ঠাকুরঘরে। আজ ঘরের হেঁসেলে নিত্যকালীন ভাতডাল রান্নার পাট নেই, ছেলেরা পূজোয় ভাগ নেবেন না, তবে ঘরেও ভাত জোটেনি তাই আজ অফিস ক্যান্টিনেই খেয়ে নেবেন। ঠাকুরঘরের পাশের একফালি ছাদটাই ধুয়ে মুছে গঙ্গাজল ছিটিয়ে শুদ্ধ করে,নতুন তোলা উনুনে পূজোর হাঁড়ি পাতিলে ভোগ বানানোর প্রস্তুতি চলছে।

রান্নাবান্নার দায়িত্ব রোজকার মত বনলক্ষ্মীর ওপর, রাই-র ওপর ঠাকুরঘরের কাজ,যে যার কাজে লেগে পড়েছে। সাবিত্রীর রোজকার ঝাঁটপাট,মোছামুছি,ধোয়াধুয়ি চলছে, বাড়ীর বড় মেয়ে কান্তার সাথে সকালেই তর মায়ের একচোট লড়াই হয়ে গেছে, আজ বাড়ীর পূজোর অজুহাতে সুশীলাদেবী কান্তাকে ঘরবন্দী করেছেন, এদিকে ওর বন্ধু, (ইয়ে, মানে বিশেষ ছেলেবন্ধু) মাধব আজ একটু বিশেষ ধরনের জায়গায় বেড়াতে নিয়ে যাবে বলে সারপ্রাইজ দিতে চাইছে, এখন কান্তা কি করে? মাকে বলতে পারছে না মাধবের কথা, আর মাধব বুঝছে না বাড়ীর অসুবিধার কথা। তাই দুজনের উপর রাগ করে দোতলাতেই নিজের ঘরে দরজা বন্ধ করে শুয়ে আছে । ছোট মেয়ে করুণার ঠাকুর দেবতায় অত ভক্তি-শ্রদ্ধা নেই, নেহাত কলেজে সেমিষ্টার পরীক্ষা চলছে, কলেজ বা বন্ধুর বাড়ী গিয়ে বসে থাকতে পারছে না, আর দিদির সাথে মায়ের ঝামেলার বহরটাও দেখে নিয়েছে,তাই কানে হেডফোন গুঁজে বইপড়ার ভান করছে। সুশীলাদেবী ঠাকুরঘর আর রান্নার জায়গার মাঝে চেয়ার পেতে বসে সবদিকে নজর রাখার মহান কাজটি করছেন।

কথায় বলে কর্তার ইচ্ছেয় কর্ম, এখানে সেটা একটু পাল্টে কর্ত্রীর ইচ্ছেয় হয়ে থাকে।পূর্ণিমা লাগবে সন্ধ্যা নাগাদ, ততক্ষণ অবধি সব নির্জলা উপোষ। না খেয়ে থাকলে একদিনে কেউ চোখে অন্ধকার দেখে না, বা অসুস্থ হয়ে পড়ে না সেটা ঠিক-ই, খালি পেটেয় ছুঁচোর দঙ্গল ডন-বৈঠকি মারে। তবে নিজের থেকে মন স্থির না করলে, মানে, বাধ্য হয়ে, বা অন্যের কথামত উপোষ করে আছি ভাবলেও খিদে তেষ্টা বুঝি বা মানুষকে একটু বেশীই কাবু করে তোলে।এখানেও তার ব্যতিক্রম হয়নি।সবাই যে যার বরাদ্দ কাজ মুখ বুঁজে করে যাচ্ছে বটে,অন্যদিকে ইন্দ্রিয়গুলো কিন্তু পূজোর পাকশালাতেই ঘোরঘুরি করছে। সাবিত্রী আবার সুশীলাদেবীর খাস লোক। ঘরের সবার গোপন এবং নির্ভরযোগ্য খবরটি যথাসময়ে যথাস্থানে পৌঁছানোটাও ওর কাজের মধ্যেই পড়ে। বয়স খুব বেশী না হলেও বোঝে খুব বেশী,তাই সময় থাকতেই উঁচু ডালে মই বেঁধে রেখেছে। বাড়ীতে রান্নার পাট নেই, কেউ যাতে লুকিয়ে খাবার খেয়ে উপোষ ভেঙ্গে বাড়ীর অকল্যাণ না করতে পারে তার জন্য গিন্নী স্বয়ং রান্নাঘরে,ভাঁড়ারঘরে,তালা দিয়ে চাবি আঁচলে বেঁধে রেখেছেন।সকালে যেখানে কর্তামশাই দাদাবাবু না খেয়ে বেরিয়েছেন সেখানে কে আর হেঁচিপেচি সাবির জন্য খাবার কোলে বসে আছে? অথচ সাবির মত কাজ সকাল থেকে কে করছে? সেই কোন কনকনে ঠান্ডা ভোর রাত থেকে গোটা দোতলা বাড়ী ঝাঁটপাট,মোছামুছি, এতগুলো লোকের গত রাতের এটোঁ বাসন ধোয়াধুয়ি, কাপড় কাচা চলছে, হাত-পা ভেরে গেছে, কিন্তু পেটে দানাটি অবধি নেই।গিন্নীমাটির রোগজনিত কারণে খাই খাই ভাবটা ইদানীং খুব বেড়েছে, আসল খিদে কি চোখের খিদে বলা মুশকিল , ডাক্তারের কড়া নির্দেশে খাবারের পরিমানতো অনেক কমেছেই, তার সাথে না খেতে পারার তালিকায় অধিকাংশ প্রিয় খাবারের অন্ত্রভুক্তি ঘটায় মনোকষ্টটাও বেড়েছে বই কমেনি। আজ হয়ত তাই সেগুলোই ভোগে উৎসর্গ করার নির্দেশ দিয়েছেন, যেগুলো এখন ওনার নাগলের বাইরে বললেই হয়। কমলাকিশোরীর পরিতৃপ্তির থেকেও কিছুটা নিজের রসনাতৃপ্তির ব্যাপারটাই বোধহয় অবচেতনে কাজ করেছে এদিকে লিস্টি বানিয়েছে যজ্ঞিবাড়ীর,কিন্তু কার যে লোভের পরিতৃপ্তি হচ্ছে দেবতার নামে, সে কি আর কারো জানতে বাকি আছে? । খিচূড়ী, লাবড়া, চরু, নারকোলের নাড়ু,তক্তি,মোয়া,মুড়কি,পুলি পিঠে, মুগতক্তি, রাঁধিয়ে একমনে ঘাড় গুঁজে সকাল থেকে ঘেমে নেয়ে বানিয়ে যাচ্ছে, আর সেদিকে তাকিয়ে থাকতে থাকতে ঘ্রাণে অর্ধভোজন তো হচ্ছেই সাথে মুখের ভিতরে লোকচক্ষুর অন্তরালে যা জল কাটছে তাতে তেষ্টাটাও পাবে না বোধহয়।

গিন্নীমাটি অবশ্য গতর নেড়ে কাজটিওতো করেন না, হাঁটাচলাও তো ঘরের মধ্যেই,এ ঘর থেকে ওঘর। বেশী খেলে হজম হবে কি করে? শকুনির দৃষ্টি মেলে সক্কাল থেকে থানা গেড়েছে সামনে, যেন রাঁধতে রাঁধতে লক্ষী বউদিই আধা পেসাদ পেটে লুকিয়ে রাখবে! সবাইকে নিজের মত নিখাউন্তী ভাবছে ! এদিকে ঠাকুরকে দেবার আগে যে নিজেই চোখ দিয়ে গিলছে সে কি আর কেউ টের পাচ্ছে না? পূজো যাদের ঘরের, উপোষও বাপু তারাই করুক না, কি দরকার অন্যদের জোরজার করে নিয়ম মানানোর?

তারপরে ঐ লক্ষী বৌদি, নিজের বলতে সেরকম কেউ কোথাও নেই বলে, বলতে গেলে একরকম দু’বেলা দু’মুঠো খাওয়া পরার বিনিময়ে এখানে আছেন, বদলে সংসারের হেঁসেল সামলাচ্ছেন। তাতেও কথা তো আর কম শুনতে হয়না! কিন্তু এই যে এ বাড়ীতে ওনাকে ঠিক পরিবারের একজন বলে মানা হয়না । বরং মাঝে মধ্যে বোঝাই যায় যে ওনার জায়গাটা সাবিত্রীর থেকে খুব একটা আলাদা না, তাও তো সাবির না পোষালে অন্য বাড়ীতে কাজ নিয়ে বেরিয়ে যাবে, বনলক্ষ্মী তো সেটাও পারবেন না। অথচ বাড়ীর পূজোর বাহানায় এই শীতে কাঁপতে কাঁপতে ভোর রাতে স্নান সেরে সারাটি দিন জল অবধি না খেয়ে সেই যে পাকশাল সামলাচ্ছেন তাতে কারো কিন্তু সামান্য কৃতজ্ঞতাটুকু অবধি নেই। তা ওনার তো কারণে অকারণে ব্রত পার্বন,সাত-সতেরো, তার ওপর ছোঁয়াছুয়ি, মানামানিটাও লোক দেখিয়ে একটু বেশী করতে হয়, পূর্ণিমা, অমাবস্যা, একাদশী সবই মানেন, উপোষ করাটা ওনার কাছে হাঁচি কাশির মত নিত্যি ব্যাপার ।অথচ সারাদিন তো রান্নাঘর আর ভাঁড়ারঘরেই খুচখাচ চলে, তা মুখ কি আর চলে না? খুব চলে। নয়তো অত টুসটুসে চেহরাটা থাকে কি করে? আজও সব নিয়ে যে ভাবে সবার দিকে পিছু ফিরে মুখ গুঁজে বসেছে দু এক গাল মুখ চালালেও কেউ টেরটি পাবেনা।

বড়দি তো সাতসকালেই মায়ের সাথে ঝগড়া করে গোঁসাঘরে খিল দিয়েছে, ও প্রায়ই হয়।বাপের আদুরী কিনা, যতক্ষন না বাপে এসে “বাবা বাছা” বলে ডাকাডাকি করবে,ততক্ষন দরজা খুলবে না, আজকাল তাই বড়দি ঘরে দোর দিলে কর্তাবাবু না ফেরা অবধি কেউ ডাকেও না।আর রাগ হলে বুঝি ওদের খিদে টিদেও পায় না।ওদের আর কি? খিদের জ্বালা জিনিষটা কোনদিন ভুগতে হয় নি কিনা! এই যেমন ছোড়দি, খেলে মোটা হয়ে যাবার ভয়ে সেধে একবেলা খায়, ভাত রুটি খায়না, ভাজভুজি,মশলাদার খাবার, মিষ্টি এসব কিচ্ছু খায় না। সারাদিন তো ঐ লেবুর রস, টকদই, ফল, স্যালাডই খায়, সপ্তাহে একদিন নিয়ম করে কারণ ছাড়া উপোষ।

দুই মেয়ের পর ঐ টিংটিং চেহারার কনে বৌটি, আলালের ঘরের দুলালী কিনা,রীতিমত খুঁটে টিপে ফেলে ছড়িয়ে ছাড়া খেতে পারেনা। না খাবার লিস্টিটাই এত বড় যে, কি খায় কে জানে,ডাল খেলে পেট ফাঁপে,ফল খেলে অ্যাসিড হয়,শাক দেখলে বমি আসে,মাটির নীচে হওয়া সব্জিতে অ্যালার্জি আছে।কত ঢং যে জানে। ঘনঘন পেটের প্রবলেমে ভোগে আর খাওয়া দাওয়া ছেড়ে চোখ উল্টে পড়ে থাকে।নেহাত বাপে ডাক্তার , তাই রক্ষে।নয়ত ঐ রক্ষাকালীর অসুখ সারাতেই সব ফতুর হয়ে যেত।

তা সাবির তো আর অত সুখের জীবন না,শখেরও না, রীতিমত গতর খাটিয়ে পেটের ভাত জোগাতে হয়।সাবিকে নিজের ভালোটা নিজেকেই বুঝতে হবে। কাজপাট সেরে গিন্নীমার পা টিপে দেবার আছিলায় বসে থাকতে হবে, ঐ দুই পথের কাঁটা নিজেদের এলাকা থেকে একটু সরলেই টুক করে হাত আর মুখের কাজটা সেরে নিতে হবে, এমনিতেও সকাল থেকে এতপদ রান্না হলে কি হবে, সাবিকে দিতে করো হাত সরবে না তখন সাবির ভাগে যত গুঁড়ো-গাড়া ফেলা-ছড়া জিনিষ!

ভাবনা চলে ভাবনার মত আর সময় চলে সময়ের মত, দুজনেই নিরন্তর বহমান কিন্তু একসঙ্গে যে গতিশীল তা নয়।সময়ে ছেদ পড়ে না, ভাবনায় পড়ে। পুরোহিত এসে পড়ায় সাবিকে চিন্তায় যতি দিতে হল। রাই,করুণা,পুরোহিতের সাথে ঠাকুরঘরে ঢুকলো, বনলক্ষ্মী সারাদিনের ক্লান্তি সরিয়ে নীচে গেল একটু গরম জলে স্নান সেরে সে অঞ্জলি দেবে, সাবির বাবা ত পূজো পাটে ভক্তি নেই।দুমুঠো পেটের ভাত জুটলেই হোল,তা পূজো শেষ হতে এখনও অনেক দেরী, সকালের উপোষী শরীর আর টানছে না অতএব সাবি গায়ে কাপড়টা টেনে গুড়িসুড়ি মেরে নীচের বৈঠকখানায় বসতে গেল, টিভি দেখতে , সুশীলা বোধহয় বড় মেয়েকে ডাকার বৃথা চেষ্টায় যাচ্ছিলেন, এমন সময় হঠাৎ বনলক্ষ্মীর আর্ত চিৎকার। জল গরম করতে গিয়ে বেখেয়ালে শাড়ীতে আগুন ধরে গেছে, বিপদের ওপর বিপদ,চিৎকার শুনে তড়িঘড়ি নামতে গিয়ে সুশীলা সেই যে আছাড় খেয়ে পড়েছেন আর উঠতে পারছেন না।এদিকে পূজো শুরু হয়ে গেছে, থামাতে গেলে অমঙ্গল। নেহাত কান্তা গাড়ী চালাতে জানে,গোঁসা ঘর থেকে বার হয়ে কান্তা তৎক্ষণাৎ মা,বোন,বনলক্ষ্মীকে নিয়ে কাছেই রাইয়ের বাবার নার্সিংহোমের দিকে রওনা দিল, রাই ও চললো সাথে, দু’জন আহতকে সামলাতে দুটো লোক তো লাগবে, নাকি? সপুত্র কেশব বাবুকেও খবর দেওয়া হোল।

যথাবিহিত পূজো-পাঠ, হোম-আহূতি সেরে পুরোহিত মশাই অঞ্জলি দেবার জন্য ডাকলেন যখন, তখন বাড়ীতে সাবি ছাড়ার কেউ নেই। খুব মন দিয়ে পুষ্পঞ্জলি দিল সাবি।“সবার মঙ্গল কোর ঠাকুর, সবার মনের ইচ্ছা পূর্ণ কোর।“

গল্প - পূজা মৈত্র

ভালোবাসার অঙ্ক
পূজা মৈত্র



বিকালের রোদ পড়ন্ত হয়ে এসেছিলো। সূর্য পশ্চিম দিগন্তে, ডুববো ডুববো করছে। পাখিদের ঘরে ফেরার সময় হয়ে এসেছে। অনুমিতার মনে পড়ে গেল, ছোটবেলায় এমন সময় ওদের খেলা ভাঙ্গত। সারা বিকাল মাঠে দৌড়ে বেড়াবার পর, ঠিক এই সময় লুকোচুরি, চোর পুলিশ, কুমীর ডাঙ্গা শেষে, কা-কা ডাক ডাকতে ডাকতে ঘরে ফিরত ওরা। আরও একটু খেলতে মন করত না তা নয়, কিন্তু বাড়িতে সন্ধ্যার পরে ফিরলে কপালে দুর্ভোগ ছিল। সেই ভয়েই ঘরের ছানার ঠিক সময়ে ঘরে ফেরা। আজকেও বড্ড দেরী হয়ে গেছে। স্কুল থেকে ফিরতে এতোটা দেরী কখনো হয়না। আজ দিনটাই ছিল অন্যরকম। সব হিসাব উলটপালট করে দেওয়া একটা দিন। সবাই চলে যাওয়ার পর, অনুমিতা একা একা কমন রুমে বসে ছিল, ফিরতে ইচ্ছাই করছিল না। অনিরুদ্ধ ফোন না করলে, আরও অনেক দেরি হয়ে যেত। অনিরুদ্ধ সব জেনেও অদ্ভুত শান্ত আছে। কি করে যে আছে, কে জানে? খুব চাপা স্বভাবের মানুষ। কম কথা বলে। ধৈর্য্য প্রচুর। কিন্তু এত বড় দুঃসংবাদ জেনেও কোন প্রতিক্রিয়া থাকবে না, তাও তো অস্বাভাবিক। অনিরুদ্ধ কি কোন ঝড়ের পূর্বাভাস পেয়েছে? ওদের বাড়িতে কথাটা জানাজানি হলে কি যে হবে,অনুমিতা জাস্ট ভাবতে পারছেনা।ওর মাকে বোঝানো, প্রায় অসম্ভব। অনুমিতার মা-বাবা দুজনেই বুঝবেন। অনিরুদ্ধর বাবাও। কিন্তু অনিরুদ্ধর মা হাউস ওয়াইফ। বাইরের দুনিয়ার সম্পর্কে উনার ধারণা সীমিত। ভুলটা যে দুই বাড়ির তরফ থেকেই হয়ে গেছে, একা অনুমিতাদের নয়, এটা উনাকে বোঝাতে অনিরুদ্ধকে বেশ বেগ পেতে হবে। অনুমিতা বুঝতে পারছিলো না, কিভাবে শাশুড়ি মায়ের সামনে কথাটা পাড়বে। নাকি সব দায়িত্ব অনিরুদ্ধকেই দিয়ে চুপ করে থাকাটাই শ্রেয়। তলপেটটা ব্যথা করছে। বেশ ভারী হয়ে উঠেছে আজকাল। হবে না? তিনমাস হতে এল। অনুমিতা এখন একটানা বেশী হাঁটতে পারে না। অল্প হাঁফ ধরে। তাই ধীরে ধীরে যাতায়াত করে এখন। আগামী ছয় মাসও এভাবেই সাবধানে কাটাতে হবে, ডাক্তারবাবু বলেছেন। কথাটা মনে পড়তেই অনুমিতার মনটা মোচড় দিয়ে উঠল। অবান্তর চিন্তা। সাবধানতার দিন কালকেই শেষ হয়ে যাবে। অনুমিতার মা হওয়া এবারের মত আর হল না।
অনিরুদ্ধ আগেই ফিরে এসেছিল। অনুমিতা ফিরে দেখল, ফ্ল্যাটের কোলাপসিবেল গেট ভিতর থেকে তালা দেওয়া। গড়িয়ায় ভাড়ার ফ্ল্যাটে দুজনে থাকে। অনিরুদ্ধ যাদবপুরে লেকচারারশিপ করে। দর্শনের অধ্যাপক। অনুমিতা গড়িয়াতেই একটা উচ্চমাধ্যমিক স্কুলের রসায়ন শিক্ষিকা। বছর দুয়েক বিয়ে হয়েছে। দেখাশোনা করে। অনুমিতার বৌদির দাদার বন্ধু অনিরদ্ধ। দুবছরে দুজনে দুজনকে জেনেছে, বুঝেছে, ভালবেসেছে। দুজনের যাতায়াতের সুবিধার জন্য অনিরুদ্ধর শ্যামনগরের বাড়ি থেকে উঠে এসে এখানে ফ্ল্যাট নিয়েছে। অনিরুদ্ধর মায়ের আপত্তি ছিলনা, তা নয়। তবে অনিরুদ্ধ মায়ের একমাত্র এবং আদরের ছেলে। ওর চাওয়ার ব্যাপারে খুব একটা না করতে পারেন না। বেল বাজাল অনুমিতা। অনিরুদ্ধ দরজা খুলে দিল। থমথমে মুখ দেখবে, আশা করেছিল অনুমিতা। কি আশ্চর্য অনিরুদ্ধ মৃদু হেসে দরজা খুলল। অনুমিতা কিভাবে কথা শুরু করবে বুঝতে পারছিলনা। নিজেকেই নিজের কাছে খুব ছোট লাগছিলো। ওর জন্য অনিরুদ্ধর স্বপ্ন ভেঙ্গে যাবে।
____ গরম পড়েছে খুব। বসার ঘরের পাখাটাকে জোরে দিতে দিতে বলল অনিরুদ্ধ।
____ হ্যাঁ, তুমি কখন এলে?
____ দুপুরেই ফিরে এসেছি। তেমন ক্লাস ছিল না। গ্লাসে করে অনুমিতাকে জল দিল অনিরুদ্ধ।
____ তোমাকে খুব ক্লান্ত দেখাচ্ছে অনু। টিফিন করেছ? নাকি না খেয়েই কাটিয়ে দিলে?
____ খেয়েছি। এতটা হেঁটে এলাম। তাই। এখন একটু হাঁটলেই হাঁফ লাগে।
____ যত্ন নাও। যাও, ফ্রেশ হয়ে এসো। অনিরুদ্ধ সোফায় বসে বলল।
____ তুমি এতটা শান্ত রয়েছ কি করে বলতো? অবাক চোখে তাকাল অনুমিতা।
অনিরুদ্ধ হাসল। কষ্টের হাসি মনে হল অনুমিতার।
____ তা নাহলে কি করব? সত্যিটাকে মেনে নিতেই হবে। ভুল যখন হয়েই গেছে, তার শাস্তি পেতেই হবে।
____ ভুল?
অনিরুদ্ধ চোখ থেকে চশমা খুলল।
____ হুম। ভুলই। শিক্ষিত হয়েও আমরা শিক্ষার প্রয়োগ করতে পারিনি। প্রি- ম্যারিটাল চেক আপ করে নেওয়া জরুরী জেনেও আমরা করাইনি।করালে আজকে এই দিন দেখতে হতনা।
____ বিয়েটাই খুব ভুল হয়ে গেছে, বল?
অনিরুদ্ধ অনুমিতার অভিমান বুঝল।
____ আমি তা বলিনি অনু। যেহেতু আমাদের দেখেশুনে বিয়ে, তাই চেক আপ করিয়ে নেওয়াই শ্রেয় ছিল। দুজনেই থ্যালাসেমিয়া ক্যারিয়ার জানলে আমাদের কেউই বিয়েতে মত দিতাম না। ক্যারিয়ার নয় এমন কাউকে বিয়ে করাটাই তখন উচিৎ ভাবতাম।
____ যা হয়ে গেছে, তাকে নিয়ে আফসোস করা ছাড়া উপায় কি? অনুমিতা চোখ মুছল। একটা আশা ছিল, জানো? বেবি যদি থ্যালাসেমিক না হয়? এমনও তো হয়। কিন্তু আজকের অ্যামনিয়োসেন্টেসিসের রিপোর্টটাই সব গোলমাল করে দিল।
____ বরং বাঁচিয়ে দিল বল।
____ মানে? অনুমিতা অবাক হল।
অনিরুদ্ধ ওর পাশে এসে ওর হাতে হাত রাখল।
____ দেখ অনু, যদি তোমাদের স্কুলে থ্যালাসেমিয়ার স্ক্রিনিং দল না আসতো, আর তুমি যদি সেখানে রক্ত না দিতে, তাহলে আমরা জানতেই পারতাম না ছয় মাস পরে যে পৃথিবীতে আসছে, সে অসুস্থ। তাকে অজান্তে পৃথিবীতে এনে কষ্ট দিয়ে ফেলতাম। আমাদের দোষের বোঝা তাকে জীবন দিয়ে বহন করতে হত। তার থেকে জেনে গেছি, ভালই হয়েছে।
____ ডাক্তারবাবু বললেন, কালকেই অ্যাবোরশনের ডেট।
অনিরুদ্ধ অনুমিতার হাতে চাপ দিল।
_____ যা করতেই হবে, তাকে ফেলে রেখে লাভ কি? মিথ্যা মায়া বাড়িয়ো না অনু। কাল আমি ছুটি নিয়েছি। তোমার পাশে থাকব।
_____ মিথ্যা মায়া বলছ? আমি যে ওর মা। ওকে নিজের হাতে মেরে ফেলব?
অনুমিতার চোখ থেকে অঝোর ধারা বইছিল।
_____ সুস্থ জীবন যাকে দিতে পারবে না, তাকে এনে শাস্তি দেবে কেন? কষ্ট হলেও ওর ভালর জন্যই তোমাকে আমাকে এই কঠিন সিদ্ধান্ত নিতে হবে।
_____ তোমার বাড়িতে কি বলবে?
_____ সত্যিটাই বলব।
_____ তোমার মা?
_____ কি আর বলবে? প্রথমে বুঝতে চাইবে না। পরে বুঝতে হবে।
_____ আমাকে দোষ দেবেন। শাপ-শাপান্ত করবেন।
অনুমিতার কথা ফেলতে পারল না অনিরুদ্ধ।
_____ হয়ত। তবে মাকে আমি বুঝিয়ে বলব, যে তোমার যতটা দোষ ততটাই আমার। না বুঝলে কি আর করব? সচেতনতার অভাবেই তো ভুগতে হচ্ছে সবাইকে।
_____ ডাক্তারবাবু বলছিলেন প্রায় ২৫% ক্ষেত্রে মা-বাবা দুজন বাহক হলেও বাচ্চা নাকি থ্যালাসেমিক হয় না? বলছিলেন কয়েক মাস বাদে আবার চান্স নিতে।
অনিরুদ্ধ ঘাড় নাড়ল, না- বাচক।
_____ আমিও নেটে দেখেছি অনু। তবে আমি এই জুয়োখেলায় আর যেতে চাই না। তোমাকে আবার এক নিদারুণ কষ্টের মধ্যে দিয়ে নিয়ে যাওয়ার কোন অভিপ্রায় আমার নেই। কি গ্যারান্টি আছে যে পরের বার সুস্থ সন্তান আসবে? না আসলে? আবার পরের বার? না, না। আমি এতে রাজি নই।
অনুমিতা বিহ্বল হয়ে গেল। তার মানে অনিরুদ্ধ চায় না, যে অনুমিতা আর মা হোক? অন্তত চেষ্টা করে দেখতে চায় অনুমিতা। ভাগ্যে থাকলেও তো থাকতে পারে।
____ তাহলে আমি কখনো মা হতে পারব না অনিরুদ্ধ? চেষ্টাও করব না?
_____ নিজের শরীরের দিকে তাকিয়ে দেখ অনু। এই কয়েকদিনে নিজের কি অবস্থা করেছ সে খেয়াল আছে? তোমার শরীর মন কে বিপদে ফেলে, বারংবার কষ্ট দিয়ে সন্তান আসুক, আমি চাই না। বিয়ের আগে রক্ত পরীক্ষা করালে হয়ত বিয়েটাই হত না, কিন্তু বিয়ের দুবছর পরে, তোমাকে ভালবেসে ফেলার পরে, তোমার কষ্টের বিনিময়ে কোন কিছুই চাইনা আমি।
অনুমিতা কথা বলার ভাষা ছিল না। মিতবাক অনিরুদ্ধ এই প্রথম এত জোর গলায় ভালবাসার কথা বলল।
____ কিন্তু...
____ কোন কিন্তু নয়। কালকের কাজটা সেরে আসি। তারপর দুজনে মিলে তোমার মা হওয়ার খোঁজ শুরু করব। কেমন?
_____ মা হওয়ার খোঁজ? এই যে বললে, চেষ্টা করবে না?
_____ চেষ্টা করব না বলিনি তো? অনিরুদ্ধ হাসল। একটু অন্যভাবে করব, বুঝলে? আজ সুজয়ের মেয়েটাকে দেখলাম। দারুন ফুটফুটে হয়েছে।
_____ সুজয়দা এনেছিলেন নাকি?
_____ হ্যাঁ। শ্রীতমাও ছিল। দারুণ খুশি আছে ওরা। বাচ্চাটা এত কিউট কি বলব? তোমার ফোন পেয়ে মুড অফ ছিল। ওকে দেখেই সমাধান খুঁজে পেলাম।
অনুমিতা বুঝল অনিরুদ্ধ কি বলতে চায়। সুজয়দা শ্রীতমা বৌদি মাস ছয়েক আগে সৃজাকে দত্তক নিয়েছেন। এখন বছর খানেক বয়স মেয়েটার। অনুমিতা আগেও ওর ছবি দেখেছে। ফেসবুকে। খুব সুন্দর। পরীর মত।
____ অ্যাডপট করবে?
____ আপত্তি আছে?
____ আমার নেই। কিন্তু তোমার মা?
_____ মানবে না? এই তো? আমাদের সন্তানকে যাতে মানে, বোঝাবো। বুঝবে আশা করি। না বুঝলে কি আর করার আছে? সময়ের হাতে ছেড়ে দিতে হবে। অসুস্থ কাউকে আনার থেকে, সুস্থ যে, তাকে অনাদরের জায়গা থেকে এনে আপন করে নেওয়াই শ্রেয়, কি বল?
অনুমিতা অনিরুদ্ধর বুকে মাথা রাখল। সায়েন্সের ছাত্রী ও। সায়েন্স না মেনে নেওয়া সিদ্ধান্তটা জীবনের সবচেয়ে বড় ভুল বলে কষ্ট পাচ্ছিল। অঙ্কে ভুল হয়ে গেছে ভেবে চোখের জল ফেলছিল। এই মুহূর্তে মনে হচ্ছে ভুল হয়েই ভাল হয়েছে। না হলে ভালবাসার অঙ্কটা এ জীবনে মিলত না।

অনুগল্প - অভিলাষা দাশগুপ্তা আদক

স্বপ্ন
অভিলাষা দাশগুপ্তা আদক


ন্যাশনাল এ্যথলেটস মীট । এবার হচ্ছে যুবভারতীতে। তাই ১০০ মিটার, ৪০০ মিটার, ৮০০ মিটার (সিঙ্গল) আর ৪০০ মিটার রিলে রেসে একটা স্থানীয় মেয়ের নাম ঘোষিত হওয়ার সাথে সাথে গোটা স্টেডিয়াম দুলে উঠছে হাততালি, জয়ধ্বনি আর খুশীর চিৎকারে। সোহনী পাল, মাত্র ১৬ বছরেই তাক লাগিয়ে দিচ্ছে তাবত ক্রীড়ামোদীর, ক্রীড়া সমালোচকদের। সোহিনীকে মিলখা সিং বা পি টি উষার আগামী দিনের উত্তরসুরী বলে অনেকেই মনে করছেন । ভিক্ট্রি স্ট্যান্ডে দাঁড়ানো মেয়েটার ঘর্মাক্ত লালচে মুখে মুর্হূমুহূ ফ্ল্যাশবাল্বের ঝলক। সাথে যুগপত জয়ধ্বনি “সোহিনী,সো-হি-নী,সোহিনীইইইইইইই”, আস্তে আস্তে আওয়াজের তীব্রতাটা কমে গেল, কে যেন গায়ে ধাক্কা দিয়ে ডাকছে, “সোহিনী,সো-নী,সোনীইইইইইইই”.., মায়ের আদরের ডাকটা বুঝতে একটু সময় লাগে সোহিনী ওরফে সোনীর, চোখ খুলতেই টিউবের চড়া আলো, ইসসস, সন্ধ্যা হয়ে গেছে। এতক্ষন ঘুমিয়েছে? কাঁচা ঘুমভাঙ্গা চোখে মায়ের দিকে তাকায় সোহিনী, সোমা, সোহিনীর মা আলতো হেসে বলেন,

- আর ঘুমায় না সোনী, রাতে ঘুম হবেনা যে। বাবা এসে গেছেন। ডিমের চপ বানিয়েছি আজ, খাবিতো ? তোর বাবা কখন থেকে বসে আছে তোর জন্য, আয় তাড়াতাড়ি।

বিছানার পাশে হেলান দেওয়া অ্যালুমিনিয়াম-ফাইবারের ক্রাচটা মেয়ের দিকে বাড়িয়ে ধরেন সোমা।

বৃহস্পতিবার, ২০ জুন, ২০১৩

গল্প - আইভি চট্টোপাধ্যায়

কাকুমণি
আইভি চট্টোপাধ্যায়



-এক-

বাবা অচিন পথে পাড়ি দিয়েছিলেন, অপর্ণাবৌদি তখন সাত বছর । বাবার অভাব বোঝার অবশ্য সুযোগই হয় নি । কাকা তাঁদের মা-মেয়েকে আগলে রেখেছেন । ব্যারাকপুরে গঙ্গার ধারে কাকার বাড়িটাই নিজের বাড়ি ছিল । সেই বাড়ি, যার বারান্দায় দাঁড়ালে গঙ্গা দেখা যায় আর ছাদে উঠলে গঙ্গার ঢেউ । যে বাড়িটায় সারাক্ষণ নদীর বাতাস ঠান্ডা করে রাখে ।

বিয়ে পর্যন্ত করেন নি কাকা । পাছে 'পরের মেয়ে' এসে তাঁর বৌদিকে, ভাইঝিকে অবহেলা করে ।

আজ অপর্ণাবৌদির ভরা সংসার । কর্পোরেট স্বামী, ইঞ্জিনিয়ার ছেলে । তিনটে গাড়ি, বাংলো বাড়ি, সবুজ লনে সাদা দোলনা । বাগানে পাম ক্রোটন ঝাউ । ঋতুর হিসেবে মরশুমি ফুল । মালী সারাবছর বাগান ঝলমল করে রাখে । রোজ বিকেলে লনের দোলনায় বসে অপর্ণাবৌদি চা আর মাছের চপ খেতে খেতে বাগানের তদারকি করেন । লম্বা কান দুলিয়ে লুসি বাগানে খেলা করে । সন্ধে হলে লুসিকে কোলে নিয়ে হণ্ডা সিটি চেপে বৌদি বেড়াতে যান ।

মাকে কাছে এনে রেখেছেন । মেয়ের সুখ দেখে মাযের চোখ জুড়োয় । মা সঙ্গে থাকায় রান্নাবান্নার দিকটা মসৃণ । আরেকদিকেও সুবিধে হয়েছে । শ্বশুরবাড়ির কেউ পাকাপাকি থাকতে চায় নি । বৌদির সংসারে সর্বক্ষণ ঠান্ডা বাতাস ।

কিন্তু অপর্ণাবৌদির মনে শান্তি নেই ।

বন্ধুদের কাছে আক্ষেপ করেন, ‘কি মুশকিলে যে পড়েছি ! সামনের জানুয়ারীতে কাকু রিটায়ার করবে । বলছে, আমার তো আর কেউ নেই .. তোর কাছেই শেষ জীবনটা কাটাব ।‘

‘ভালোই তো । এত বড় বাড়ি তোমার, এমনিই তো তিন চারটে ঘর খালি পড়ে আছে । ছেলে বাইরে, সোমেনদা মাসের মধ্যে পনেরোদিন ট্যুরে । মুশকিল কেন ? কাকা খুব মেজাজী বুঝি ? খুব বায়নাক্কা ?’

‘না, তা নয় । কাকু চুপচাপ মানুষ, নিজের কাজ নিজেই করে । দেখেছ তো তোমরা ।‘

‘হ্যাঁগো, দেখেছি তো । সেবার এলেন, সারাদিন তোমার বাগানে থাকতেন । কতরকম গোলাপ, ডালিয়া করেছিলেন । রবিবার হলেই টাটকা সব্জি কিনতে বাজারে । নাতি খাবে বলে মাংস, জামাই খাবে বলে ইলিশ । খুব ভালোবাসেন তোমাদের । তাছাড়া এমনিও তোমার আউটহাউসে এতগুলো কাজের লোক । কাকুর কাজে তোমায় লাগবেও না । তাহলে ? সোমেনদা আপত্তি করছেন ?’

‘না, তা নয় । আপত্তি আমারই । তোমাদের সোমেনদা আমার কোনো কাজে বাধা দেয় না । ও তো উল্টে আমাকেই বলছে, কাকু যখন নিজে আসতে চাইছে তখন আপত্তি কোরো না । ভালো দেখায় না । আসলে কাকুর সব সম্পত্তি, টাকা পয়সা আমিই পাব যে । তাই তোমাদের সোমেনদার সঙ্কোচ । যদিও এ সঙ্কোচের কারণই নেই । কাকুর আর কে আছে যে সম্পত্তি দাবী করবে ? কি করে যে ঝামেলাটা ঘাড় থেকে নামাই !’

বৌদির মাও বিরক্ত, ‘একে আমি জামাইবাড়িতে আছি, আবার ঠাকুরপো আসতে চাইছেন । একটু যদি সাংসারিক বুদ্ধি থাকত !’

সাংসারিক বুদ্ধি থাকলে আজ কাকুরও যে ভরা সংসার থাকত, সে কথাটা অবশ্য কারো মনে আসে না ।

ভাবতে ভাবতেই জানুয়ারী এসে গেল । কাকুর অবসর জীবন শুরু হল । অপর্ণাবৌদি আর সোমেনদা গিয়ে টাকাপয়সার সব ব্যবস্থা করে এলেন । পোস্ট-অফিসের এম-আই-এস, ব্যাঙ্কের ফিক্সড ডিপোজিট, সিনিয়র সিটিজেন ডিপোজিট । সব কাকুর খুকুর সঙ্গে জয়েন্ট । তাছাড়া বাড়ির নমিনেশন, পেনশনের নমিনেশন । কাজ কি একটা ! সাতদিন থেকে সব ব্যবস্থা করে বৌদি ফিরে এলেন ।

কাকু বলেছিলেন, ‘একেবারে তোদের ওখানে গিয়েই নাহয় অ্যাকাউন্টগুলো খুলতাম খুকু । আবার সব ট্রান্সফার করার ঝামেলা ..’

খুকু হেসে হেসে বলেছে, ‘এখন কদিন এখানে থেকে সব গুছিয়ে নাও কাকুমণি, তারপর ..’

তা ঠিক । বাইশ বছর কাজ করছিল রঘু, দেশে তার বাড়িঘর কাকুই করে দিয়েছিলেন, এবার ছুটি দিলেন । চোখের জল মুছতে মুছতে রঘু দেশের বাড়ি চলে গেল । পাড়ায় একটা লাইব্রেরী করার কথা দিয়েছিলেন, এবার সে কাজটাও শুরু হল ।

শান্তিপুরে মাসিমার মেয়ের বিয়ে, নৈহাটির পিসতুতো দাদার চিকিত্‍সার ব্যবস্থা । কাকু রিটায়ার করেছেন খবর পেয়ে কত ভুলে যাওয়া সম্পর্কই যে নতুন হয়ে উঠেছে ।

ভালোবেসে করার কাজও অবশ্য আছে । পাড়ায় মশামাছির উপদ্রব, লোক ধরে নালা নর্দমা পরিষ্কার । শ্রীরামপুরে বাড়ি করেছে দীর্ঘদিনের সহকর্মী বিনয়, তার গৃহপ্রবেশের ব্যবস্থা । ছোটবেলার বন্ধু পলাশ বৃদ্ধাশ্রমে আছে, দেখা করে এলেন একদিন । পাকাপাকিভাবে খুকুর কাছে যাবার আগে এদিকের সব মিটিয়ে নেওয়াই ভালো ।

কিন্তু খুকুর কাছ থেকে ডাক আসে না । কাকুমণি অপেক্ষায় রইলেন । ছ’মাস .. আটমাস .. এক বছর । খুকুরা নিজে থেকে খবর না পাঠালে আসেন কি করে ? তবু একবার নিজে থেকেই এলেন । কি হল কে জানে, আবার ফিরেও গেলেন ।

পাড়ার লোক বলে, ‘ফিরে এলেন যে ?’

‘এই ব্যাঙ্কের কাজ আছে একটু ।‘

‘আমরা ভাবলাম, নতুন জায়গা, তাই বুঝি অসুবিধে । তাহলে খুকুর কাছেই থাকবেন ? থাকতে পারবেন নতুন জায়গায় ?’

কাকুমণি হাসেন, ‘স্নেহ নিম্নগামী, জানো না ?’ কি কথার কি উত্তর !

হঠাত্‍ একদিন সকালে বৌদির বাড়িতে ফোন । পুলিশের ফোন ।

ক’দিন ধরে কাকুকে বাইরে দেখা যায় নি । বাড়ির বন্ধ দরজায় তিনদিনের খবরের কাগজ, তিনদিনের দুধের প্যাকেট । মর্নিংওয়াকে গিয়ে রোজ যে কুকুরছানাটাকে রুটির টুকরো খাওয়াতেন, সে নাকি দরজার কাছে বসে চিত্‍কার করেছে খুব, তারপর আশেপাশের বাড়ির দরজায় দরজায় গিয়ে চিত্‍কার করেছে । কুকুরটার কান্ড দেখে লোকের সন্দেহ হয়েছে। তারপর পাড়ার ছেলেরা দরজা ভেঙে ঘরে ঢুকেছে । পাড়ার ছেলেরাই পুলিশকে খবর দিয়েছে ।

ম্যাসিভ হার্ট অ্যাটাক । একলা ঘরে একা একা । কে জানে কেমন ছিল সে যাত্রা, নিকটতম প্রতিবেশীকেও ডাক দিতে পারেন নি ।

কাকুর হিমশীতল শরীর তিনদিন ধরে কোনো আপনজনের অপেক্ষায় ছিল ।

ব্যারাকপুরের একলা বাড়িটা, কাকুর একাকী জীবনের সঙ্গী বাড়িটা নিঝুম । শুধু গঙ্গার দিকে বারান্দাটা, যে বারান্দায় বসে জলের দিকে চেয়ে আর গঙ্গার বাতাস মেখে একাকী সময় কাটাতেন, সেই বারান্দার দিকের খোলা দরজাটা আপনমনে কপাটে ধাক্কা দিয়ে দিয়ে কিসের যেন প্রতিবাদ করছিল । পুলিশ দরজাটা বন্ধ করে তালা দিয়ে দিল ।

পুলিশ, পোস্টমর্টেম । দাদা-বৌদি গেলেন, সত্‍কার করে এলেন । বন্ধুরা সমবেদনা জানাতে গিয়ে অপ্রস্তুত । অপর্ণাবৌদি খুব বিরক্ত, শুধু শুধু কাকা ঝামেলায় জড়িয়ে গেছেন । কাকার বাড়ি, ব্যাঙ্কের টাকা, সম্পত্তি পেয়েও ঝামেলাটা ভুলতে পারছেন না ।

বৌদির মাও বিরক্ত, ‘কোন জন্মের শত্রুতা ছিল কে জানে । থানা পুলিশ মর্গ পোস্টমর্টেম .. কত ঝামেলায় জড়িয়ে দিল।‘

দিন কয়েকের মধ্যে বন্ধুদের কাছে ফোন এল বৌদির, ‘বেনারস থেকে গুরুজি এসেছেন, বাড়িতে নামগান হবে । চলে এসো বিকেল বিকেল, পুজো আছে । অবশ্যই এসো সবাই, বিশেষ পুজোর ব্যাপার ।‘

বিশেষ পুজো ! কী ব্যাপার ! এখন তো কোনও বিশেষ তিথি নেই । অমাবস্যা গেল এই দুদিন আগে । কৌতুহলী বন্ধুরা সবাই এলেন ।

বৌদি ঠান্ডা ঠান্ডা শরবত দিয়ে আপ্যায়ন করলেন, ‘শান্তি-স্বস্তত্যয়ন করাচ্ছি, বুঝলে ? অপঘাত মৃত্যু । ভূত প্রেতকে আমার খুব ভয়, কখন ঘাড়ে চেপে বসে ! ছেলেপুলে নিয়ে ঘর করি । কদিন ধরে কি সব কান্ড হচ্ছে, জানো ? এই রান্না করে রেখে এলাম, কে যেন সব খেয়ে নিচ্ছে । কাল মালাই চিকেন করেছিলাম, কে যেন ওপর থেকে মালাইটা খেয়ে নিয়েছে । তোমাদের সোমেনদা সেদিন বাগানে দাঁড়িয়েছিল, কে এসে পিঠে দুমদুম করে কিল মেরে গেছে । লুসি তো সর্বক্ষণ ভয় পেয়ে খাটের তলায় লুকিয়ে থাকছে । ওরা সবার আগে অপদেবতাকে টের পায়, জানো তো ? কাকু যে আমাদের কি সর্বনাশ করে গেল !’



-দুই-


মুম্বাইতে ছেলের বাড়ি বেড়াতে এসেছেন অপর্ণাবৌদি ।

বেড়াতেই । ছেলে-বউয়ের সংসারে থাকা তাঁর না-পসন্দ । বউ নিয়ে অবশ্য সমস্যা নেই । দেখেশুনে বড়লোকের একমাত্র মেয়ের সঙ্গে বিয়ে দিয়েছেন । রূপে লক্ষ্মী, গুণে সরস্বতী । ইন্দিরা মেয়েটা বেশ বাধ্যও । যদিও সাজ পোশাকে তেমন সাব্যস্ত নয় মেয়ে । হয় ঝুলুর ঝুলুর একটা সালোয়ার কামিজ, নয় যেমন তেমন একটা শার্ট আর জিনস প্যান্ট । ব্যস । একটু বেভুল আছে মেয়েটা । সে একদিক দিয়ে ভালোই । বেশি বায়নাক্কা নেই বউয়ের ।

তবু বৌদি শান্তিতে নেই ।

সমস্যা বৌদির মা । স্বামী গত হবার পর মাঝে মাঝেই এ বাড়িতে এসে থাকেন । ছেলেটা ভ্যাবলা । বোঝেই না যে শাশুড়ির দায় ঘাড়ে চাপছে । একমাত্র মেয়ে দেখে বিয়ে দিয়েছিলেন, যাতে শ্বশুরবাড়ির উটকো ঝামেলা বাবাইকে বইতে না হয় । যোধপুর পার্কের অত বড় আর সুন্দর বাড়ি ছেড়ে মহিলা এই দু’কামরার ফ্ল্যাটে এসে থাকতে চাইবেন কে জানত । কার সঙ্গে যে এ নিয়ে আলোচনা করেন !

দাদাকে বলতে গেলেই .. ‘আহা, মেয়ে মাকে একা একা থাকতে দেবে না, তাই নিয়ে এসেছে । ভালোই তো । তোমার ছেলেরও তো বেশ যত্ন হচ্ছে । যাই বলো, বেয়ানের হাতের রান্না কিন্তু দারুণ । আমারই খাওয়া বেড়ে যাচ্ছে..’

বৌদির মুখের দিকে চোখ পড়তেই শুধরে নেবার চেষ্টা, ‘তোমার মাও তো সারাজীবন আমাদের সঙ্গে থেকেছেন । কিছু অসুবিধে হয়েছে, বলো ?’

এই লোকের সঙ্গে মন্ত্রণা করা যায় !

ভেবে ভেবে এই উপায় করেছেন বৌদি । মাঝে মাঝে এ বাড়িতে এসে থাকা । তিনি এলে ও মহিলার বাধো-বাধো লাগে । নিজের বাড়িতে ফিরে যান । শত হোক, মেয়ের মা । চক্ষুলজ্জা তো আছে ।

মাকে তো এইভাবে সামলানো যাচ্ছে, তবু শান্তি নেই । মেয়ে আরেক কাঠি বাড়া । মাকে নিয়ে মেয়ের আদিখ্যেতার শেষ নেই ।

এই তো আজ যেমন । অফিস কামাই করে মেয়ে চললেন পোস্ট-অফিস থেকে মাযের টাকা তুলতে । পোস্ট-অফিস থেকে টাকা তুলে সে টাকা কলকাতায় মাযের ব্যাঙ্কে পাঠাবে ।

কেন বাপু ! কলকাতার পোস্ট-অফিসে কি কাজ হয় না ? এত দূরে মুম্বাই শহরে পোস্ট-অফিসে টাকা রাখার দরকার কি ? নাকি মেয়ে দেখাশোনা না করে দিলে নিজের টাকাপয়সা সামলানোর ক্ষমতা নেই ?

কই, বাবাইকে দিয়ে তো নিজেদের কাজ করান না বৌদি । বাবাইও তাঁদের একমাত্র ছেলে । তার তো বাড়ি নিয়ে, বাপমা নিয়ে এত মাতামাতি নেই । রীতিমতো প্র্যাকটিকাল ছেলে তৈরি করেছেন বৌদি ।

মুখে অবশ্য বলেন নি কিছু । কায়দা করে ইন্দিরার সঙ্গী হয়েছেন । মেয়েটাকে চোখে চোখে রাখতে হবে । এইভাবে অন্যের জন্যে, হোক না নিজের মা, সময় নষ্ট করা কি আজকের দিনে মানায় ? সময় বুঝে ব্যাপারটা মেয়ের মাথায় ঢুকিয়ে দিতে হবে । প্র্যাকটিকাল হবার শিক্ষা দিতে হবে মেয়েটাকে । নইলে বাবাইটার কপালে দু:খ আছে ।

পোস্ট-অফিসে লম্বা লাইন । বসে বসে বিরক্ত লাগছে । এক সময় কাজ শেষ হল । ‘চলো মা, আজ তোমায় কেএফসিতে খাওয়াব । বাবার জন্যেও নিয়ে যাব ।‘

ভালোই হল । ওই কেএফসি-তে বসেই ইন্দিরাকে বোঝাবেন আজ । বাড়িতে তো সর্বক্ষণ প্রজাপতি হয়ে উড়ে বেড়ায়, এইবার একলা পাওয়া যাবে ।

পোস্ট-অফিসের দরজার কাছটায় বেশ ভিড় । ইন্দিরা শক্ত করে হাত ধরে আছে, বৌদি যেন ভিড়ের মধ্যে হারিয়ে যাবেন । মনের কাছে লুকোনো নেই, মেয়েটার এইভাবে আগলে রাখাটা বেশ লাগছে । বৌদি যেন ছোট মেয়েটি, আর এই মেয়েটা যেন তাঁর মা ।

বেরিয়ে আসছেন .. হঠাত্‍ দাঁড়িয়ে পড়ল ইন্দিরা । ‘মা, একটু দাঁড়াও তো । এসো, এইখানে বসো । আমি আসছি ।‘

ভিড় ঠেলে এক বৃদ্ধ ভদ্রলোককে ধরে ধরে এনে পাশের চেয়ারে বসিয়ে দিল, ‘আপনি এখানে বসুন, আমি দেখছি ।‘ ভদ্রলোকের হাতের পাশবই আর কাগজপত্র নিয়ে অন্য একটা লম্বা লাইনে দাঁড়াল ।

অচেনা মানুষের সঙ্গে গল্প করা বৌদির স্বভাব নয়, তবু পাশাপাশি বসে কতক্ষণ আর চুপ করে থাকা যায় ! যে লম্বা লাইনে দাঁড়িয়েছে ইন্দিরা, ঘণ্টাখানেক সময় লাগবেই । পনেরো মিনিটেই বৃদ্ধের নানা গল্প শোনা হয়ে গেল । একা থাকেন, কাছেই ফ্ল্যাট । নিজের রান্না নিজেই করেন, ঠিকে কাজের মেয়ে বাসন মেজে ঘর মুছে যায় । দোকান বাজার, ব্যাঙ্ক পোষ্ট-অফিস, সব একা একা ।

‘যতদিন হাত পা চলছে, চিন্তা নেই । করুণাময়ের কাছে একটাই প্রার্থনা, বিছানায় পড়ে থাকার অবস্থা যেন না হয় । আর সব তবু হয়ে যাচ্ছে, রাতের বেলায় আজকাল সাহস পাই না । একলা ঘরে কবে মরে পড়ে থাকব, কেউ খবরও পাবে না । একলা জীবন, অভিশপ্ত জীবন ।‘

‘একলা কেন ? বাড়িতে আর কেউ নেই ? মানে .. আপনার স্ত্রী .. ছেলেমেয়ে ..’

‘না, সেসব পাট নেই । সংসারে নিজের বলতে এক ভাইঝি । দাদা অল্পবয়সে চলে গেলেন, কাকু কাকু বলে মেয়েটা বুকের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ে কেঁদেছিল । সে-ই আমার সব । সে-ই একমাত্র । বিয়ে করলে ওকে কি আর এমন করে দেখতে পারতাম ?’

‘সে কোথায় ? আপনার ভাইঝি ? তার কাছে গিয়ে ..’ বলতে গিয়ে কেন কে জানে বৌদির গলা ধরে এল ।

উজ্জ্বল হাসলেন বৃদ্ধ, ‘চেন্নাইতে আছে আমার ভাইঝি । খুব ভালো ঘরে বিয়ে হয়েছে । তার সংসারে থাকা তো উচিত নয় আমার ।‘

একটু থামলেন, তারপর চোখ তুলে তাকালেন লম্বা ভিড়ের লাইনটার দিকে, ‘ভাবছি একটা বৃদ্ধাশ্রমে চলে যাব । ভাইঝিকে একবার আসতে বলেছি । টাকাপয়সা সব বুঝিয়ে দিয়ে, ফ্ল্যাটটা ওর নামে করার ব্যবস্থা করে ..’

‘ভাইঝি বলে না ওর কাছে থাকার কথা ?’ বলতে গিয়ে বুকের মধ্যে চাপ ।

‘ওর সংসারে আমার থাকা উচিত নয়, না ?’ উত্তরটা এড়িয়ে গিয়ে হেসে ফেললেন বৃদ্ধ মানুষটি, ‘আপনার মন খারাপ করে দিলাম, না ? আপনার চিন্তা নেই । ভারি ভালো মেয়ে আপনার । মাযের সঙ্গে সঙ্গে পেনশন তুলতে এসেছে কেমন । একজন অপরিচিত মানুষের জন্যেও ওর মায়া । আজকের দিনে এমনটা দেখা যায় না ।‘

তারপর কেমন অন্যমনস্ক হয়েই বুঝি বলে ফেললেন, ‘আমার ভাইঝিও যদি এমন করে ..’ কথা শেষ না করেই চুপ করে গেলেন ।

‘কি ? ভাইঝিও যদি ..? কি ?’

‘কিছু না । স্নেহ নিম্নগামী, জানেন না ?’ বৃদ্ধ আবছা হাসলেন । বড় বিষন্ন হাসি ।


ঘর্মাক্ত কলেবরে উজ্জ্বল হাসি নিয়ে ফিরেছে ইন্দিরা । প্রজাপতির উপমাটাই ঠিক । পলকে ঝলমল করে উঠল চারধার । উলোঝুলো মাথাটা নাড়িয়ে নাড়িয়ে বলল, ‘এই নিন কাকু, আপনার টাকা । চলুন, আপনাকে অটো রিক্সায় তুলে দিই । আমরাও তো অটো স্ট্যান্ডে যাব, না মা ?’
কাঁপা কাঁপা হাতখানা মাথায় রাখলেন বৃদ্ধ । মুখে কিছু বললেন না । কিন্তু অনুচ্চারিত আশীর্বাণী স্পষ্ট শোনা গেল, ‘কল্যাণ হোক তোমার ।‘

বৃদ্ধকে অটো-রিক্সায় তুলে দিয়ে এল ইন্দিরা । কিছুক্ষণ চুপচাপ দুজনেই । তারপর বৌদির হাত ধরল ইন্দিরা, ‘রাগ করলে, মা ? তোমার অনেক দেরি করিয়ে দিলাম । আসলে এরকম মানুষ দেখলেই বাবার কথা মনে পড়ে । প্রতি মাসে বাবাও এমনি লাইন দিয়ে টাকা তুলতে যেত । আমি তো কলেজ যেতাম, সব মাসে বাবার সঙ্গে যেতে পারতাম না । হার্টের পেশেণ্ট ছিল তো, খুব কষ্ট হত ভিড়ে ।‘
মেয়ের গলাটা ছলছল করতে লাগল ।

আর কেন কে জানে, অপর্ণাবৌদির দু’চোখ ভরে জল এলো । রাস্তার ভিড়, মানুষের অনর্গল কথার শব্দ, গাড়ির শব্দ । কোলাহল ।

হঠাত্‍ কেমন নি:শব্দ হয়ে গেল চারপাশ ।

কে যেন বহু দূর থেকে ডেকে উঠেছে, ‘খুকু .. খুকু উ উ উ ..’

‘খুকু .. খুকু .. আমার খুকুমণি .. এই নাও রংপেন্সিল ..’

‘জ্যামিতি নিয়ে ঝামেলা ? কোনো চিন্তা নেই .. আয় খুকু, তোকে জ্যামিতি বুঝিয়ে দিই ..’

‘খুকু কলেজ যাবে, বাসে তুলে দিয়ে আসি ..’

‘মিত্রার বাড়ি যাবি ? চল খুকু, আমি পৌঁছে দিয়ে আসি .. মাকে আমি ম্যানেজ করছি ..’

‘খুকুর বিয়েতে অন্তত তিরিশ ভরি গয়না দিতে হবে বৌদি ..’

‘মধ্যমগ্রামের সম্বন্ধটা বারণ করে দিই বৌদি .. অত বড় পরিবার .. খুকুর কষ্ট হবে ..’

স্কুলের ছুটির পর বাইরে এসেই দেখতে পায় খুকু, কাকুমণি দাঁড়িয়ে আছে । খুকুকে দেখতে পেয়েই এগিয়ে এসে মাথায় ছাতা ধরবে । বন্ধুদের সামনে কি লজ্জাই যে পায় খুকু !

কথা নেই, বার্তা নেই, ডজনখানেক শাড়ি কিনে আনবে কাকুমণি, খুকু নাকি রোজ একই শাড়ি পরে কলেজ যাচ্ছে । মাঝে মাঝেই মনে হয় কাকুমণির, খুকুর মুখটা যেন শুকনো শুকনো লাগছে । অমনি রাশি রাশি ফল, হরলিক্স, মাল্টিভিটামিন ।

মা নিশ্চিন্ত, খুকুর কাকুমণি আছে ।

কাকুমণির জন্যে কিন্তু খুকু ছিল না । কাকুমণির কেউ ছিল না । এই বৃদ্ধ মানুষটির মত । দুই বৃদ্ধে কি অসম্ভব মিল !

সমবয়সী হলেই বুঝি মিল হয় ? এই ইন্দিরার মতই বয়স ছিল না খুকুর ? তাহলে ? মস্ত অমিল হল কি করে ?

বড্ড ভয় । বুকের মধ্যে জমাট বাঁধা ভয় । এই বুঝি সংসারে অঘটন ঘটল । এই বুঝি সংসারের ছন্দ কেটে গেল । প্র্যাকটিকাল হতে গিয়ে, শুধু নিজেরটুকু বাঁচাতে গিয়েই কি এত বড় ভুল হয়ে গেল ? না না, ভুল নয় । অন্যায় । নিষ্ঠুরতম অপরাধ ।

নইলে কাকুমণিকে হারিয়ে ফেলা হয় ? আজ ইচ্ছে হলেই খুকু বারবার হিমালয়ে ফিরে যেতে পারে, ফিরতে পারে সাগর সঙ্গমে । কিন্তু কাকুমণিতে ফেরার উপায় নেই আর ।

আহা ইন্দিরা । ওকে কোনো ভয় নিয়ে, কোনো অপরাধবোধ নিয়ে বাঁচতে হবে না । মায়ায়, মমতায়, ভালোবাসায় সবরকম ভয় মুছে ফেলার মন্ত্র জানে ও । ইচ্ছে হলেই ওর নিজের বাবার কাছে ফেরার সুখ আছে । দু’দন্ড বাবার কাছে বসার শান্তি আছে ।

রাস্তায় কড়া রোদ্দুর । লম্বা লম্বা সবুজ গাছগুলো নিশ্চল, নিস্তব্ধ । একটা পাতাও হাওয়ায় দুলছে না । কালো পিচের রাস্তা থেকে গরম হলকা ।

চোখে কালো চশমা পারে নিলেন বৌদি । চোখের জলটা লুকোতে হবে । এমন করেই যদি নিজের কাছ থেকেও লুকিয়ে থাকা যেত !

ইন্দিরার মায়াময় হাতখানা শক্ত করে জড়িয়ে ধরলেন । এই হাত ধরেই নিঝুম রাস্তাটা পার হতে হবে । কি করলে অপরাধের প্রায়শ্চিত্ত হয় কে জানে । যত কষ্টকর হোক, তাই করবেন এবার । কাকুমণির কাছে ফিরতেই হবে ।



শনিবার, ১৯ জানুয়ারি, ২০১৩

গল্প - রামকৃষ্ণ ভট্টাচার্য্য




ইনভেস্টমেন্ট

ক্ষেতু বাগচীর বেশ কয়েক দিন দর্শন নেই। চন্দন ডাক্তারের চেম্বারে, সন্ধে সাতটার পর আড্ডাটা বেশ ঝিমিয়ে আছে। সত্য কম্পাউন্ডার ওরফে সত্য কম্পুর ইংরেজি বলার তোড়টাও কম।
তারক মোত্তির একদিন খবর নিয়ে এলেন, ক্ষেতু বাগচী ফেসবুক প্রোফাইল খুলেছেন।  সেখানেই দিনরাত আড্ডা দিচ্ছেন লিখিত ভাবে। প্রচুর যুবতী মেয়ে ফ্যান জুটে গেছে ওনার। একটা লজঝরে বিংশ শতাব্দীর স্কুটারও নাকি কিনেছেন। সেটা চেপে মাঝে মাঝে বিভিন্ন গ্রুপের গেট টু গেদার থেকে লিটল ম্যাগাজিন মেলাতেও যথেচ্ছ যাতায়াত ক্ষেতু বাগচীর
চায়ের দোকানের হরি স্বচক্ষে দেখেছে, বৌদিকেও মাঝে মাঝে পেছনে বসিয়ে নিয়ে যাচ্ছেন। খালি, চন্দনের চেম্বারেই আসছেন না।
আজ, ধড়পড়  করে একটা স্কুটার ক্ষেতু বাগচীর দেহটা নিয়ে এসে থামল চন্দনের চেম্বারের সামনে। বিশাল দেহটা বয়ে নিয়ে এসে মনে হল, স্কুটারটা হাঁপাচ্ছে।
ক্ষেতু বাগচীর পদার্পণ হলো চন্দন ডাক্তারের চেম্বারে। সবাই প্রথমে একটু হতচকিত হল নাটু লাহিড়ী বলে উঠলেন :-
-                      একি,  ক্ষেতুদা! আপনার চেহারা দেখছি পূর্ণিমার চাঁদের মত চেকনাই দিচ্ছে।
-                      শুক্লপক্ষের শশিকলার ন্যায় বর্ধিত?
-                      মানে না,  হ্যাঁ।
-                      ভাগ্যিস জটায়ুর মত হাঁয়ে স বলনি! ক্ষেতুদার দরাজ গলা।
-                      তা, ঐ পুরোনো স্কুটারটা আপনার বপুর ভার সইতে পারছে?
-                      বল কি হে! আমার কাছে তো ঐ কোম্পানি চিঠি দিয়ে জানতে চেয়েছে আমার এই স্কুটারে চড়ার একটা ফোটো নিয়ে ক্যাপশন দেবে :- ইভেন দিস ওল্ড ব্র্যান্ড অফ আওয়ার স্কুটার ক্যান বিয়ার দিস ওয়েট! থিংক আ্যবাউট দি নিউ মডেল উই আর গোয়িং টু লঞ্চ সুন।
-                      বলেন কি?
-                      হুঁ হুঁ বাওয়া, যা বলি- ঠিকই বলি! একি আর তারক! কথায় কথায় মুখেন মারিতং জগ?
-                      কিন্তু, ক্ষেতুদা আজকাল তো স্কুটারের প্রোডাকশন তো আর হয়ই না! ওরা নতুন মডেল বের করবে বলেছে?  বিরাট ইনভেস্টমেন্ট করে, এই সব তো আর খাবে না মার্কেটে,  তালে লাভ কি? তারক মোত্তির উবাচ।
-                      তুমি একটা শাখামৃগ, তারক। বলি, স্কুটারের উন্নত সংস্করণ এখন স্কুটি বোয়েচ? ইনভেস্টমেন্ট দ্বিগুণ ফেরত আসবে !
-                      ইনভেস্টমেন্ট ছাড়া দেখছি কিছু হয় না!
-                      হবে কি করে? ভিক্ষা করতেও ইনভেস্টমেন্ট দরকার হয়।
-                      সে কি? সবাই হতভম্ব
-                      হুঁ! হুঁ! একটা বিড়ি আর এক কাপ চা! এই দুটোর তো ইনভেস্টমেন্ট লাগেই ভিক্ষে করতে!
-                      ইন্টারেস্ট! হাউ ফ্লিজিং! নোয়াখালীর পূর্বতন বাসিন্দা সত্য কম্পু বললেন।
-                      তা, ক্ষেতুদা আপনার এই বিংশ শতাব্দীর স্কুটারের পেছনে ইনভেস্টমেন্টের রহস্য কি?
-                      দেড় হাজারে কিনেছি। আর চার হাজার টাকা লেগেছে সারাই করতে। মোট সাড়ে পাঁচ হাজার টাকা।
-                      আপনার লাভ?
-                      বল কি হে! রিকশা ভাড়া কত বাঁচছে জান?
-                      কি রকম?
-                      আর বলো না! রিকশাওয়ালাদের প্রচুর বায়নাক্কা। বাজার করতে যেতে লাগে ছয় টাকা। আর এরা কিছুতেই সেই ভাড়া নেবে না। শীতের সময় বলবে, প্রচণ্ড ঠাণ্ডা, দুটাকা বেশী দিন। ঠিক আছে, সেটা না হয় দিলাম কিন্তু দশ টাকার নোট দিলেই বলবে, খুচরো নেই ফেরত দেবার। বাকী দুটাকা নাকি গোবিন্দের ভোগে লাগাবে। কার ভোগে লাগে কে জানে! সবই উড়ো খই। গরম, আর বৃষ্টির দিনেও এক কথা। তাই কিনেই ফেললাম।
-                      কিন্তু পেট্রোল যা দামী!
-                      তা হলেও আমার পুষিয়ে যায়। হিসেব করে দেখেছি- আমার মাসিক রিকশা ভাড়ার থেকেও কম লাগে এই স্কুটারের খরচা।
-                      আপনার জীবনে সব চেয়ে বড় ইনভেস্টমেন্ট কি, ক্ষেতুদা? চন্দন, হরির চায়ে চুমুক দিয়ে জিজ্ঞেস করল।
-                      বিয়ে
-                      কার বিয়ে?
-                      তোমার বৌদির বিয়েতে!
-                      আমার বৌদির বিয়েতে আপনার ইনভেস্টমেন্ট কেন হবে দাদা?
-                      আরে,  আমার বৌ, তো তোমাদের বৌদি!
-                      সেটা বলুন! তা প্রফিট অ্যান্ড লস রেশিও কি?
-                      মাইনাস ব্যালেন্স! মানে রেকারিং লস! তাও মেনটেন করছি। ভাগ্যিস আমার ক্রেডিট কার্ড হারিয়েছে।
-                      সর্বনাশ! আপনি পুলিসকে আর ব্যাংকে জানান নি, এই ব্যাপারে!
-                      নাঃ!
-                      সে কি! এটাও তো আপনার হেব্বী লস!
-                      না হে না! চোরটা আমার গিন্নির থেকেও অনেক কম খরচ করছে। তাই ওটা আমার রাইট ইনভেস্টমেন্ট! বুইলে কিনা!
-                      আপনি তো ইদানীং কোলকাতা শহরেও যাচ্ছেন স্কুটার নিয়ে। পুলিশের খপ্পরে পড়েন নি?
-                      পড়েছি! আর ব্যাটারা আমার ফাইন করবে বলেছিল।
-                      তালে, ফাইনটাও তো আপনার ব্যাড ইনভেস্টমেন্ট!
-                      মোটেই না!
-                      সে আবার কি! আপনাকে ফাইন দিতে হয় নি?
-                      না!
-                      কি রকম?
-                      আমি বললাম,  দেখুন আপনারা আমায় দাঁড় করিয়েছেন, আর আমি দাঁড়িয়েছি কিনা?  ওরা বলল- হ্যাঁ! তারপর বললাম, আমি সিনিয়র সিটিজেন। আপনারা তাড়া করলে এই স্কুটার জোরে চালিয়ে আমি পালাবো আর পালাতে গিয়ে উল্টে পড়লে, আমি শেষ! সরকার থেকে আমার পরিবারকে  দু লক্ষ টাকা ক্ষতিপূরণ দেবে। আর আপনার চাকরটি যাবে! ভেবে দেখুন- কি করবেন!
-                      তারপর?
-                      রাস্তার শেষ মোড়ে এক অফিসার বাবু বসেছিল। তার কাছে নিয়ে গেল আমায়। আমি ওর কাছে যেতেই বলল- এটা ওয়ান ওয়ে। আপনি এখান দিয়ে এলেন কেন? আমি বললাম এখন সব ওয়ান উইন্ডো! এসব আবার বললে, আমি কিন্তু কমপ্লেন ঠুকবো আপনার নামে। মাথা টাথা চুলকে আমায় ছেড়ে দিল।  এটাও অবশ্য একরকমের ইনভেস্টমেন্ট
-                      মাথা চুলকে মানে তো, চিন্তা?
-                      হ্যাঁ! ওটাও একটা ইনভেস্টমেন্ট! তবে, ওরা ঠিক ভাবে করতে পারে নি!
-                      কি রকম?
-                      অত বকবক শুকনো মুখে করতে পারব না বাপু! আবার “বলো হরির” চা বল। গলাটা ভিজিয়ে নি।
ক্ষেতু বাগচী চায়ে চুমুক দিতে না দিতেই ওনার সেল ফোনে একটা বিতিকিচ্ছিরি রিং টোন বেজে উঠল। একবারও স্ক্রিনের দিকে না তাকিয়েই  ফোনটা কেটে দিলেন। এবারে তিনি  একটা ফোন করে বললেন-
-                      হ্যাঁ,  বলো! কি? টমাটো সস্ আর কর্নফ্লাওয়ার আনতে হবে? ঠিক আছে  ফেরার সময় নিয়ে যাবো। বলে ফোনটা কেটে দিলেন।
তারক মোত্তির বললেন :-
-                      কার ফোন ছিল, সেটা না দেখেই কেটে দিলেন?
-                      ওটা তোমাদের বৌদির কল ছিল! তাই কেটেছি।
-                      কি করে বুঝলেন, বৌদির ফোন?
-                      ওনার নাম্বারটা আমি পার্সোনালাইজড্ করে রেখেছি একটা রিং টোন দিয়ে। আর ওটা শুনলেই কেটে দি ফোন।
-                      এ বাবা! এরকম কেন?
-                      ফোনটা আগে ধরতাম। পরে দেখি,  মহামহিম বলছেন তোমার সাথে কথা বলতে গিয়ে আমার ব্যাল্যান্স নেই হয়ে যায়। মানে, ফোনের কথা বলার টাকা শেষ। আমাকে দুশো টাকার টক টাইম ভরে দাও। এরকম দুচার বার হতেই আমি ফোন কেটে দিয়ে রিং ব্যাক করি। আর সেই টাকা ভরার বখেরা থাকে না!এত ইনভেস্টমেন্ট আর পোষায় না!
-                      বৌদি বেশ ব্যালান্সিং ক্যারেক্টার! চন্দন ডাক্তারের হাসিমুখে জবাব।
সবাই হো হো করে হেসে উঠল। ক্ষেতু বাগচী বললেন ঐ জন্যই তো মাঝে সাজে এনাকে নিয়ে আমি পিকনিক আর জিটি তে যাই। না হলেই সব ব্যাল্যান্স শেষ হয়। এই বয়সেও ফেসবুকে মেয়ে বন্ধুদের মধ্যে আমার জনপ্রিয়তার জোয়ার দেখে তিনি আবার অন্য ইনভেস্টমেন্ট করে না বসেন।
তারক মোত্তির জিজ্ঞাসা করলেন : -
-                      ক্ষেতুদা, আর একটা চিন্তার  ইনভেস্টমেন্ট নিয়ে কোন উদাহরণ দেবেন?
-                      এ আর বেশী কথা কি! ভাবছি এবার ধূপ কাঠি শিল্প গড়ে তুলবো। বাংলার বুকে শিল্পের জোয়ারে ধূপ কাঠির একটা সদর্থক ভূমিকা বরাবরই আছে আরও একটা আছে!
-                      কি সেটা?
-                      চাকরীর প্রয়োজনে আমাকে প্রায়ই প্লেনে চড়ে এদিক সেদিক যেতে হত। কয়েকবার আমার বসও গিয়েছেন সাথে। প্লেনে চড়েই তিনি ভালো করে ভেতরের চারপাশটা দেখে নিতেন। কয়েকবার এরকম হওয়াতে একবার জিজ্ঞেস করেই ফেললাম কি এত দেখেন বলুন তো!
-                      দেখি, বাচ্চা বেশী আছে কিনা!
-                      বাচ্চা বেশী থাকলে আপনার লাভ?
-                      বুঝলে না, বাচ্চা গুলো সব নিষ্পাপ। বুড়ো গুলো সবই এনারজেটিক তো! তাজা জিনিস। তাই এদের পাপের ভাগ বেশী। বুড়ো গুলো বেশী থাকলে প্লেন আবার এক্সিডেন্ট করে না বসে।
-                      দারুণ দিয়েছেন তো উনি!
ক্ষেতু বাগচীর আর ফোনে সেই বিতিকিচ্ছিরি রিং টোন! ফোন কেটে দিয়ে, রিং ব্যাক করে বললেন আসছি।
স্কুটারে স্টার্ট দিয়ে বাড়ীর পথে রওনা হলেন “ইনভেস্টার” ক্ষেতু বাগচী।