সৌকর্য গ্রুপের একমাত্র ওয়েবজিন।

About the Template

শুক্রবার, ২০ ডিসেম্বর, ২০১৩

প্রবন্ধ - ফাল্গুনী মুখোপাধ্যায়

নারী ও আমাদের সমাজ
ফাল্গুনী মুখোপাধ্যায়



খ্যাতিমান ঔপন্যাসিক শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায় সম্প্রতি একটি সংবাদপত্রে লিখেছেন “...এই যে এখন প্রায় দিনই ধর্ষণ বা যৌননিগ্রহের ঘটনার কথা জানতে পারছি, এ সব আগেও প্রচুর পরিমানেই ছিল। তখন এমন জানা যেত কম । এখন এটা সম্ভব হচ্ছে মিডিয়া হাইপের জন্য । মিডিয়া এখন এগুলোকে নিয়মিত তুলে ধরছে । আমারতো বয়স অনেক হয়ে গেল । মেয়েদের ওপর অত্যাচার বরাবরই হতে দেখেছি । নতুন কিছু নয়” ।

খুব স্বাভাবিক প্রতিক্রিয়ার কারণেই অনেকেই এরকম মন্তব্য পছন্দ করবেন না । তারা মনে করতে পারেন এই রকম ক্যাজুয়াল মন্তব্য নির্যাতনকারীদের উৎসাহিত করারই সমতুল । আমার মনে আছে অনেক বছর আগে তখনকার মুখ্যমন্ত্রী জ্যোতি বসু বানতলায় নারী নির্যাতন প্রসঙ্গে সাংবাদিক দের প্রশ্নের উত্তরে ইংরাজিতে বলেছিলেন “ইয়েস,ইট হ্যাপেনস”। সাংবাদিকরা এর বাংলা অনুবাদ করে ছড়িয়ে দিলেন ‘হ্যা এরকম ঘটনা তো কতই হয়” জ্যোতি বসু নাকি বলেছেন । এবং প্রবাদের মত হয়ে গেলো উদ্দেশ্য প্রনোদিত ভুল অনুবাদ করা উক্তিটি । পাড়ার আড্ডায় কোন আলটপকা মন্তব্য আর শীর্ষেন্দুর মত সাহিত্যিকের কথার ওজনতো এক নয় ! না শীর্ষেন্দু ভুল কিছু বলেননি এবং নতুন কিছুও নয় । কিন্তু একটা তাচ্ছিল্য ভাব যে আছে এই মন্তব্যে তাতে সংশয় নেই । আসলে এ থেকে নারীর অবস্থান সম্পর্কে আমাদের সমাজের মনোভাবটাই প্রতিফলিত হয়েছে এরকম মন্তব্যে ।

সভ্যতার ঊষালগ্ন থেকেই পুরুষের প্রয়োজনে নারী ব্যবহৃত হয়ে এসেছেন, মাতৃতান্ত্রিক সমাজও এর ব্যতিক্রম ছিল না । যাযাবর জীবন থেকে মানুষের সমাজ গঠনের প্রক্রিয়ায় নারীর ভূমিকাই তো ছিল প্রধান কেননা তাকে নিয়েই পরিবার , আর অনেক পরিবার নিয়েই গড়ে উঠলো সমাজ । এবং তখন থেকেই নারী হয়ে গেলো পুরুষের অধীন । মনুর বিধান ছিল ‘ন স্ত্রীস্বাতন্ত্র্যমর্হতি’ ।

স্ত্রীলোক স্বাধীনতার যোগ্য নয় । তারা কুমারী অবস্থায় পিতার অধীন, বিবাহের পর পিতার অধীন আর বার্ধক্যে পুত্রের অধীন” ।

তো এই বন্দোবস্তই তো প্রবহমান আজকের আধুনিক ভারতীয় সমাজেও । হ্যা,গত দু আড়াইশ বছরে আধুনিক শিক্ষার প্রসার ও নানান আইন-কানুনের প্রণয়ন চোখে পরার মত অনেক পরিবর্তন হয়েছে, কিন্তু নারী সম্পর্কে সমাজের মনোভাব সেই বেদ-পুরাণ কথিত কাঠামোতেই আছে । লেনিন বলেছিলেন নারী সবচেয়ে আগে শৃঙ্খলাবদ্ধ হয়েছে আর তার শৃঙ্খল মুক্তি ঘটবে সবচেয়ে পরে ।

‘জোর যার মুল্লুক তার’ আমাদের সমাজ বন্দোবস্তের বেশ জনপ্রিয় প্রবাদ । শিশুকাল থেকেই আমাদের এইরকম শেখানো হয় । তসলিমা নাশরিন এই প্রবাদটিকেই অন্যরকম ভাবে তাঁর কবিতায় একটা পংক্তি লিখেছিলেন “হাতিয়ার যার মুল্লুক তার তখনো বোঝেনি নারী” । না, এখনো বোঝেনি, তাকে বুঝতে দেওয়া হয়না । এই আধুনিক সমাজে নারী স্বাধীনতাবাদীরা নিজের জন্য যে স্বাধীনতার সোচ্চার দাবী করেন তারা কি তাদের ঘরের কাজের মেয়েটির ক্ষেত্রে সেই স্বাধীনতার দাবী মেনে নেন ? না নেননা । আসলে সমাজ বন্দোবস্তের মূল ভিত্তিটার বদল নাহলে তার উপরিসৌধের বদল হতে পারে না বড়জোর কিছু প্রসাধনী প্রলেপ দেওয়া যায় মাত্র । পুরুষ যেদিন অস্ত্রের দখল পেলো সেদিন থেকেই অস্ত্র বলে বলীয়ান পুরুষ নারীকে বসে রাখতে শুরু করলো । তারপর ধর্ম, আইন, লোকাচার ইত্যাদির সৌধ গড়ে উঠলো এই মূল কাঠামোর ওপর । আধুনিক সমাজে নারীকে বশে রাখার অস্ত্র যেমন রিভলবার ও শাণ দেওয়া ছুরি, তেমনই অখিলেশ যাদবদের রাজনৈতিক ক্ষমতাও । আদিযুগের অস্ত্রের ক্ষমতা এখন অর্থের ক্ষমতাও ।

পুরুষতান্ত্রিক আমাদের সমাজে নারীর অবস্থান কোথায় সেই প্রশ্নেও পুরুষ দোদুল্যমান সেই বেদ-পুরাণের কাল থেকেই । নারী ‘নরকের দ্বার’ আবার সে শক্তি রূপিণী । তার বৈদিক মন্ত্র উচ্চারণের অধিকার নেই কিন্তু দৈব আরাধনার সমস্ত উপাচার করবেন নারী । অসুর নিধনে প্রবল শক্তিধর দেবতারা স্মরণ নেন দেবী দূর্গার । কিন্তু অসুর নিধনে তার যাবতীয় প্রহরণ পুরুষ দেবকুল প্রদত্ত । তুমি দেবী বটে কিন্তু তোমার শক্তির উৎস আমরা পুরুষ দেবকুলই । এই আধুনিক বিজ্ঞানের যুগে নারীর ক্ষমতায়নের যত কথাই বলিনা কেন নারীর স্বাধীন মানবিক সত্বাকে পুরুষ স্বীকার করে না, নারীও ও এটা মেনে নেয় । সেই আদি যুহ থেকেই সমজে নারীর অবস্থন, প্রভাব ও ক্ষমতা নির্ভর করে এসেছে অর্থনীতির ক্ষেত্রে তার স্থানের উপর । আদর্শগত ভাবে একথা আমরা প্রায় সকলেই স্বীকার করে নিই যে অর্থনৈতিক স্বনির্ভরতার মধ্যেই নারীর স্বাধিকার ও মুক্তির বীজটি নিহিত রয়েছে, কিন্তু নারীর ক্ষমতায়নের প্রশ্নে আমাদের সমাজের দৃষ্টিভঙ্গির কোন আমূল পরিবর্তন হয়েহে এমন কথাও বলা যাবে না । উনিশ শতকের চেয়ে অনেক পরিবর্তন হয়েহে সত্য । উনিশ শতকে যখন অনভিজাত নারী অন্দর মহল থেকে বাইরে বেরিয়েছিলেন কাজের সন্ধানে, সমাজের চোখে তারা ছিল কুল কলঙ্কিনী । যাদের শ্রমশক্তির ওপর দাড়িয়েছিল সেকালের হিন্দু সমাজ তারা হয়ে গিয়েছিলেন গণিকালয়ের মালিকদের শিকার আর নতুন গজিয়ে ওঠা বড়লোকদের গৃহ পরিচারিকা । এযুগে শিক্ষিত মহিলারা অনেক উচ্চ ও প্রশাসনিক দায়িত্বে কিংবা ব্যবসা বানিজ্যের ক্ষেত্রে সাফল্যের শিখরে উঠছেন সত্য, কিন্তু প্রান্তিক নারীসমাজ, কৃষক রমণী, খণি শ্রমিক, আয়া, পরিচারিকারা নারীত্বের সম্মান থেকে বঞ্চিতই থেকে যান ।

ইতিহাসের সুদীর্ঘ পথচলায় কত পরিবর্তন হয়ে গেছে – হয়ে চলেছে নিয়ত । আমাদের সমহ অ পরিবারের কাঠামোয় কত পরিবর্তন হয়ে গিয়েছে, পরিবারের বন্ধন শিথিল হয়েছে, আমাদের মূল্যবোধগুলির কত রূপান্তর ঘটে গিয়েছে, কিন্তু নারীর প্রতি সমাজের মনোভাবের বিষয়টি সেই এক সনাতনী বিশ্বাসের অচলায়তনে বন্দি । নারী পুরুষের আশ্রিতা, পুরুষের ভোগ্যা সামগ্রী, লিঙ্গ-বৈষম্যের কারণে সে যেন এক আলাদা প্রজাতি । পিতৃপ্রধান যৌথ পরিবার ভেঙে এখন অনু পরিবার কিন্তু সেখানেও আধুনিক সমাজ কতটুকু স্বাধীনতা দিতে সম্মত নারীকে ? স্ত্রী তার পুরুষ স্বামীর আশ্রিতা – এ ভিন্ন অন্যকিছুই পুরুষ ভাবে না । সমাজ তাকে অন্য কিছু ভাবতে শেখায় না । নারী নিজেও এই ভাবনার অচলায়তনে বন্দি, ধর্মের বাঁধন তাকে অন্য কিছু ভাবতে দেয় না ।

এ বছর ‘আন্তর্জাতিক নারীদিবস’(৮ই মার্চ)এর কেন্দ্রীয় ভাবনা ‘লিঙ্গ বৈষম্যের অবসান’। রাষ্ট্রসঙ্ঘের নির্দেশিকায় আহ্বান জানানো হয়েছে – ‘প্রতিশ্রুতি হ’ল প্রতিশ্রুতি, এবার লিঙ্গ বৈষম্যের অবসান ভাবনাকে কার্যকরী করতে হবে’। রাষ্ট্রসঙ্ঘের প্রস্তাবে বা একটি বা কয়েকটি নারীদিবস পালনের মধ্য দিয়ে লিঙ্গ বৈষম্যের অবসান ঘটবে এমনটা মনে করেননা কেউই । নারীমুক্তির দীর্ঘ প্রক্রিয়ার প্রধানতম অংশই হ’ল লিঙ্গ বৈষম্য ভাবনার অবসান, কারণ নারী-পুরুষের যৌন বিভাজনই মানব-ইতিহাসের প্রথমতম শ্রেণী বিভাজন । মানব সভ্যতার ঊষা লগ্নে মানুষ যেদিন থেকে ব্যক্তিগত সম্পত্তির মালিকানা পেল সেদিন থেকেই শুধুমাত্র লিঙ্গ বৈষম্যের কারণেই নারী পরিণত হ’ল পৃথক এক ‘নিকৃষ্ট’, ‘নির্যাতিত’ প্রজাতিতে । মানুষের শ্রমেরও যৌন বিভাজন হয়ে গেল । আর ধর্মীয় অনুশাসনের নিগঢ়ে আবদ্ধ আমাদের সমাজ সেই ধারাকেই বহন করে চলেছে আজও ।

তাহলে শুধুই কি অন্ধকার ? নিশ্চিত ভাবেই তেমন মনে করার কারণ নেই । সমাজ রূপান্তরের যে প্রবহমান প্রক্রিয়া – লিঙ্গ বৈষম্যের অবসান ভাবনা সেই প্রক্রিয়ারই অংশ । নারী নির্যাতন রোধে মানুষের ক্রমবর্ধমান সচেতনতা কিছু আশার সঞ্চার করে , নারীর অধিকারের স্বীকৃতি ও বৈষম্যের অবসানে নানান আইন প্রণয়ন হচ্ছে । আইন সমাজের মানসপটকে আমূল বদলে দিতে পারে না ঠিকই , কিন্তু আইন সমাজ মানসের পরিবর্তনের ধারাকে কিছু রক্ষাকবচ দিতে পারে যা নারী প্রগতির প্রাতিষ্ঠানিক স্বীকৃতিও বটে ।

লেখা শুরু করেছিলাম এক খ্যাতিমান সাহিত্যিকের প্রাসঙ্গিক বয়ান উদ্ধৃত করে, আর শেষ করছি আর এক প্রবীণ সাহিত্যিকের মন্তব্যের উধৃতি দিয়ে । সম্প্রতি একটি দৈনিক সংবাদ পত্রে খ্যাতিমান সাহিত্যিক দেবেশ রায় লিখিত ‘কত উৎসব! কত টুকরো দেশ !! কত অখন্ড নারী ও বাজার !!!’ শিরোনামের নিবন্ধটির শেষ স্তবকটি এইরকম –
“আমাদে দেশের এক ব্যবসায়ী তাঁর স্ত্রীর পঞ্চাশ বছরের জন্মদিনে নিজের জেট বিমানে অতিথিদের নিয়ে যেতে পারেন দেশের আর এক প্রান্তর ঐতিহাসিক প্রাসাদে আর সেই একই দিনে কচি কচি মেয়েরা রাস্তায় মিছিল বের করে, তাদের ছোট ছোট হাতে প্ল্যাকার্ড তুলে – আমাদের ধর্ষণ করো না । মুকেশ আম্বানির স্ত্রী শতায়ু হোন । কিন্তু যে ছাত্রীটির স্কুল ব্যাগ পুকুরপাড়ে পড়ে থাকে আর তার ধর্ষিত শরীর পুকুরের জলে ভাসতে থাকে, তারা পৃথিবীর কোন সভ্য কল্পনায় এক দেশের মানুষ হতে পারে না” ।

শুক্রবার, ২০ সেপ্টেম্বর, ২০১৩

প্রবন্ধ - শ্রী শুভ্র

জন্ম যদি তব বঙ্গে
শ্রী শুভ্র


বহু যুগ আগে বৃটিশ শাসনের সেই পরাধীনতার কালেই প্রমথ নাথ বিশী বাঙালী জাতির প্রকৃতি সম্বন্ধে আলোচনা কালে বলেছিলেন, বাঙালীর মোটো হচ্ছে- "এসো ভাই টেনে নামাই"! এস ওয়াজেদ আলীর ভাষায় বলা যায়, "সেই ট্র্যাডিশান সমানে চলছে!" দেখা যাচ্ছে দেশ স্বাধীন হলেও বাঙালীর রীতি বদলায় নি! শোনা যায় দয়ার সাগর বিদ্যাসগর, যাঁর কাছে উপকৃত হওয়া বাঙালীর সংখ্যা মোটেও নগণ্য নয়, শেষ জীবনে কারুর কাছে আঘাত পেলে বলতেন, "ওহে মনে তো পড়ে না কস্মিনকালেও তোমার কোনো উপকার করেছি কিনা!" বাঙালীর কৃতজ্ঞতা বোধ তার স্বজাতি প্রীতির মতোই দূর্লভ বলা চলে! শ্রী চৈতন্য থেকে শুরু করে অনেক মহাপুরুষেরই সেই উপলব্ধি হয়েছে হাড়ে হাড়ে!

বাংলার ইতিহাস বিচ্ছিন্নতার ইতিহাস! বাঙালীর ইতিহাস আত্মঘাতী ইতিহাস! বঙ্কিম চন্দ্রের লোক রহস্যের বাবু বৃত্তান্ত থেকে নীরদ চন্দ্র চৌধুরীর আত্মঘাতী বাঙালী পর্যন্ত বাঙালীর পরিক্রমণে স্বয়ং বিধাতাও বোধ করি বারংবার বিষম খেয়ে অস্থির হন! বস্তুত বিবাদ বিসংবাদ বিদ্বেষ বাঙালীর মজ্জা গত! স্বজাতির সাথে কলহে আমরা যেমন পারদর্শী বিদেশীর সাথে গলাগলিতেও ততোধিক উৎসাহী! পরজাতির সাথে প্রীতি বিনিময় সৌহার্দ স্থাপন দোষাবহ নয়! কিন্তু ভয়াবহ আমাদের বিদেশী সংস্কৃতির অনুকরণ প্রীতি! বৃটিশ আমলে আমাদের মক্কা ছিল লন্ডন! একবার ঘুরে আসতে পারলে জীবন ধন্য হয়ে যেত! এখন হয়েছে গ্রীণকার্ড! যা না হলে সমাজে মান থাকে না! বষ্কিমচন্দ্রের ভাষায় পর ভাষা পারদর্শীতায়, মাতৃভাষা বিরোধীতায় ও পর জাতি নিষ্ঠীবনে পরিতৃপ্তিতে বাঙালীর সহজাত প্রতিভা সহজেই উন্মীলিত হয়!এহেন বাঙালী যে (ইংরেজী হিন্দী না জানা) স্বজাতি বিদ্বেষী হবে সে কথা বলাই বাহুল্য!

নকল নবিশ অনুকরণ পটু মুখস্ত বিদ্যায় ডিগ্রী ধারী বাঙালী স্বভাবতই পরশ্রীকাতর ও ঈর্ষান্বিত চরিত্রে বলশালী! তাই দূর্বলের কাছে অত্যাচারী সবলের কাছে বিনীত, সহধর্মীর কাছে মুখে হাসি আর পিছনে ছুরি বাঙালীর স্বভাব প্রকৃতি! বস্তুত কাঁকড়া প্রজাতির সংস্কৃতিতেই বাঙালীর জন্ম! তাই বিশী কথিত সেই "টেনে নামানো"র প্রয়াসে বাঙালীর উদ্যমে কোনদিন কোনো ঘাটতি ছিল না, আজও নেই! বিখ্যাত সাহিত্যিক যাযাবর একবার বন্ধু সমারোহে গুরু দেব রবীন্দ্রনাথের সাথে সাক্ষাত করতে গিয়ে বিশ্বকবির কাছে বিনীত প্রশ্নে জানতে চেয়েছিলেন, কবির "সার্থক জনম আমার জন্মেছি এই দেশে" গানটি কবি তার শেষ জীবনে লিখলে কি একই ভাবে লিখতেন? উত্তরে বলেছিলেন বাংলার সর্ব কালের সর্ব শ্রেষ্ঠ ব্যক্তিত্ব, "এখন লিখলে সার্থক কথাটা কেটে দিতাম!" আশি বছরের জীবন অভিজ্ঞতার কি নিদারুণ উপলব্ধি! দয়ার সাগর বিদ্যাসাগরের আক্ষেপের মতোই কি তীব্র ভয়াবহ! যদিও তখনও কবি জানতেন না তাঁর সেই কবি কল্পনার সোনার বাংলা খুব শীঘ্রই কেটে দু টুকরো করা হবে! আর সেই বিদেশী ষড়যন্ত্রে হাত লাগাবে তাঁরই স্বজাতির বিশিষ্ট জনেরা! হয়ত তাঁরই স্নেহভাজন কেউ কেউ!

১৯৪০ সুকান্তের কলম থেকে জন্মাল, "অবাক পৃথিবী অবাক করলে তুমি, জন্মেই দেখি ক্ষুব্ধ স্বদেশ ভূমি" আর আমরা যারা আজ জীবনের অর্ধশতাব্দী পাড় করছি তারা আরও অনেক বেশি অবাক হয়েছিলাম জ্ঞান বুদ্ধির প্রথম উন্মেষ লগ্নেই, "জন্মেই দেখে ভঙ্গ বঙ্গভূমি!" কি বিচিত্র এই দেশ! ১৯৮৯, বার্লিন প্রাচীর ভেঙ্গে মিলন হল দুই জার্মানীর! আমরা উদ্বুদ্ধ হলাম না তবু! কারণ আমরা তো জানি বিচ্ছেদই আমাদের মন্ত্র! বিভেদেই আমাদের শক্তি!

বিধর্মী স্বজাতি আমাদের বিদেশী! তাই কাঁটা তারের দংশন দহনের সীমারেখার দুই পাড়েই শৈশবাভ্যস্ত গ্রন্থগত পাণ্ডিত্য, বাক্যে সরস্বতী ও কলহ প্রিয় পরধন লোভে মত্ত বাঙালিকুল, কেমন ঠাণ্ডা ঠাণ্ডা কুল কুল হয়ে আজও বিভক্ত!ইতিহাসের দিকে ফিরে তাকালে ৪৭এর বাংলা ভাগে কোটি কোটি বাঙালী হিন্দুর নিজের জন্মভূমি পূর্বপুরুষের ভিটে ছেড়ে সহায় সম্বলহীন ভাবে দেশ ত্যাগ করে উদ্বাস্তু হয়ে এ পাড়ে চলে আসার মধ্যে দেশপ্রেমের অভাব আর ধর্মীয় সাম্প্রদায়িকতার প্রতি অন্ধ আনুগত্য স্পষ্টতই চোখে পড়ে!

কিন্তু বিষয়টা আবার এতটা সরলও নয়! মূলত বৃটিশের নির্দেশে ও সহায়তায় লাগানো সাম্প্রদায়িক দাঙ্গায় বাঙালী হিন্দুরা মুসলিম শাসনের অধীনে নিরাপদ নয় আশংকা করেই এই দেশ ত্যাগ! অর্থাৎ ইউরোপের জাতিগুলি যেখানে দেশপ্রেমের প্রয়োজনে প্রাণ ত্যাগেও ভীত ছিল না, বাঙালী সেখানে প্রাণ বাঁচানোর জন্যে দেশ ত্যাগেও পিছপা নয়! আপনি বাঁচলে দেশের নাম!বাঙালীর দেশপ্রেমের কথা বলতে গেলে গোলমাল হয়ে যাওয়ার সম্ভাবনাই বেশি! দেশ সম্পর্কে বাঙালীর ধ্যান ধারণা রীতিমত গবেষণার বিষয়! যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নতির অনেক আগে দেশ ছিল চলা ফেরা জানা শোনার গণ্ডীর সীমানায় আবদ্ধ! তার বাইরে সবটাই বিদেশ!আর আধুনিক সভ্যতায় দেশ পাসপোর্টের পরিসরে নির্দিষ্ট! আবার বৃটিশ আমলে বাংলার তথাকথিত নব জাগরণের সোনালী দিনে বাংলায় দেশ বলতে বর্ণহিন্দু দের দেশ বোঝাতো, শিক্ষিত সমাজে! অন্যদিকে বাঙালী মুসলিম সমাজে শিক্ষা প্রসারের সাথে সাথে দেশ হয়ে ওঠে ইসলামিক! যার মধ্যে মক্কা ,মদীনা, আরব্য রজনীও হয়ে ওঠে বাংলা! ফলে দেশপ্রেম হয়ে ওঠে মুলত সম্প্রদায় প্রেম! অর্থাৎ সাম্প্রদায়িক!মাটির সাথে সম্পর্ক হীন!ফলে বাংলার শিকড়ের সাথে, বাংলার ঐতিহ্য ও উত্তরাধিকারের সাথে বাংলার হিন্দু মুসলিম কোনো সম্প্রদায়েরই কোনো আত্মিক যোগ গড়ে ওঠে নি কোনো কালেই!

আর এইটি বুঝতে পেরেই সুচতুর বৃটিশ যখন বাঙালীর মেরুদণ্ডটিকে চিরকালের মতোই ভেঙ্গে দেওয়ার ষড়যন্ত্র করল তখন দুই একজন ছাড়া বাংলা ভাগের কারণে অশ্রুপাত করার মত বাঙালী খুঁজে পাওয়া গেল না! হিন্দুরা ভারতবর্ষের স্বাধীনতায় উদ্বেল হল! মুসলিমরা পাকিস্তানের! বাংলা যে স্বাধীনতা পেল না, সার্বভৌম অখণ্ড দেশ রূপে বিশ্ব সভায় আত্মপ্রকাশ করল না, তাতে সেদিনের বাঙালীর কিছুই এসে গেল না! বৃটিশরা শুধু মুচকি হাসল!অন্যদিকে বাংলার নিয়তির নীরব অশ্রুপাত কারুরই দৃষ্টিগোচর হলো না!বাংলার নিয়তির সেদিনের নীরব অশ্রুপাতের আংশিক প্রায়শ্চিত্য করতে হল পূর্ব পাকিস্তানের বাঙালীকে তিরিশ লক্ষ প্রাণের মূল্যে অর্জিত বাংলাদেশের স্বাধীনতায়! তারপর চার দশকের সময় সীমায় সরকারী সৌজন্যে ঐতিহ্য ও উত্তরাধিকারের নিরন্তর ধর্ষণে আজ বাংলাদেশের বাঙালীকে হতে হয়েছে বাংলাদেশী! মৌল বাদ ও সম্রাজ্যবাদের যুগল বন্দীর সাঁড়াশি আক্রমণে সেখানে আজ শাহবাগ আন্দোলনকে শিখণ্ডী করে দেশ ভাগ হয়ে গিয়েছে আস্তিকে আর নাস্তিকে! বাঙালী হয়ে গেলেই বিপদ! নিশ্চিন্তে থাকতে গেলে হতে হবে বাংলাদেশী! ভারতীয় উপমহাদেশের সুপ্রাচীন সভ্যতার সাথে যে নাড়ির স্পন্দন রয়ে গিয়েছে বাংলার অস্তিত্বে, ভুলতে হবে সেকথা! ভাবতে হবে মক্কা মদীনার ঐতিহ্য!

এ পাড়ের বাঙালীকে অবশ্য তেমন কোনো সংশয় দ্বন্দ্ব সংঘাতের মধ্যে দিয়ে যেতে হয়নি! কারণ এ পাড়ে বাঙালী এখন ভারতীয় হয়ে সানন্দা! একটু প্রাগ্রসররা, গ্রীণকার্ড হোল্ডাররা অবশ্য নিজেদের বিশ্ব নাগরিক ভেবে আত্ম প্রসাদ লাভ করেন বেশি! আমরা এ রাজ্যে কেউ ভারতীয় হিন্দু, কেউ ভারতীয় মুসলমান! ভুলেও কেউ নিজেদের বাঙালী জাতীয়তা নিয়ে আর গর্ব অনুভব করি না, পাছে কেউ আমাদের প্রাদেশিকতার দোষে দোষী করতে পারে!একটু গভীরে ঢুকলে দেখা যাবে বাঙালী জাতীয়তা অনেকটাই সোনার পাথর বাটিতে কাঁঠালের আমসত্বর রসাস্বাদন করার মতো! পূর্বেই বলেছি বাংলার নব জাগরণ ছিল বর্ণহিন্দু দের জাগরণ; যার অভিমুখ ছিল ভারতীয় হিন্দুত্বের সনাতন ঐতিহ্যের দিকে!

শিক্ষিত প্রাগ্রসর বাঙালী হিন্দু যেমন ভারতীয় সনাতন হিন্দুত্বের প্রাচীন ঐতিহ্যের মধ্যে নিজের আত্ম পরিচয়ের সন্ধান করল, ঠিক তেমনই শিক্ষার বিস্তারের সাথে সাথে বাঙালি মুসলিম আরবের ইতিহাসে, ইসলামের অনুশাসনের মধ্যেই নিজেদের আত্ম পরিচয় আছে ভেবে আত্ম প্রসাদ লাভ করল! উভয় সম্প্রদায়ই বিস্মৃত হল তার বাঙালী জাতিসত্ত্বার সাধারণ ঐতিহ্য ও উত্তরাধিকার! কি বিচিত্র এই জাতি! বাঙালী হিন্দু ভুলে গেল, সনাতন ভারতীয় ঐতিহ্যের
উত্তরাধিকারী হয়েও বাঙালী একটি স্বতন্ত্র জাতি! ভারতের অন্যান্য জাতির থেকে ভিন্ন সংস্কৃতির ধারক! তার এই ভিন্ন সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যে, আপন মাতৃভাষায় সে যে এক স্বতন্ত্র জাতিসত্ত্বা সে কথা স্মরণে রইল না তার!বাংলার ইতিহাসে শতাব্দীব্যাপি বর্ণহিন্দু দের দ্বারা অত্যাচারিত নিম্ন বর্ণের হিন্দু ধর্মান্তরিত মুসলমান হয়ে ইসলামের সাম্য ও ভ্রাতৃত্বের
মধ্যে আশ্রয়ের সন্ধান করল! কিন্তু উচ্চ বর্ণের হিন্দুসমাজের হাতে অর্থনৈতিক ও সামাজিক শোষণ অব্যাহত থাকল শতাব্দীব্যাপি! ফলে শিক্ষার বিস্তারের সাথে বাঙালী মুসলিম তার স্বতন্ত্র আত্মপরিচয় গড়ে তুলতে চাইল আরবের ইতিহাস ও সংস্কৃতির ঐতিহ্যে! ইসলামের কঠোর অনুশাসনের মধ্যে নিজেকে ব্যাপৃত রেখে হিন্দু সমাজের বেষ্টনীর পরিধির বাইরে আপন অস্তিত্বের ভিত্তি গড়ে তুলতে গিয়ে ভুলে গেল ইসলাম সম্পূর্ণ ভাবেই বিদেশী ধর্ম! ভিনদেশী সংস্কৃতির ধারক! খৃষ্ট ধর্মের মতোই! বাংলার জলবায়ুর সাথে সম্পর্ক হীন!বাঙালী হিন্দু নিজেকে যতই ভারতীয় বলে মনে করুক ভারতের অন্যান্য জাতির হিন্দুত্ব থেকে বাঙালী হিন্দুর আচার বিচার ধর্মীয় অনুশাসন সামাজিক রীতিনীতি প্রবল ভাবেই স্বতন্ত্র! এবং সেখানেই তার বাঙালিয়ানা! দুঃখের বিষয় ইসলামের গঠন তন্ত্রে বাঙালী মুসলিম এই রকম স্বতন্ত্র কোনো বঙ্গীয় মুসলিম সংস্কৃতি গড়ে তোলার অবকাশ পায়নি! তাই সেই অর্থে আজও হয়ত তার স্বতন্ত্র বাঙালিয়ানা গড়ে ওঠে নি! এবং গড়ে ওঠার পরিসরগুলিও রাজনৈতিক ভাবেই রুদ্ধ করে দেওয়ার প্রবল প্রয়াস দিনে দিনে বৃদ্ধি পেয়েছে বই কমেনি!

বর্তমানে বাংলাদেশে মৌলবাদী প্রবণতা যেভাবে বৃদ্ধি পাচ্ছে তাতে বাঙালী মুসলিমের স্বতন্ত্র অস্তিত্ব আজ ইসলামের হাতেই বিপন্ন!অন্যদিকে বিশ্বায়নের বিপুল ঢক্কা নিনাদে বর্তমানে শিক্ষিত বাঙালিকুল কেউ আর বাঙালী থাকতে রাজী নয়! সবাই এখন গ্লোবাল ভিলেজে পা রাখতে তৎপর! যে কারণে শিক্ষিত মাত্রেই গ্রীণকার্ডের জন্যে মরিয়া! কারণ বাঙালীর গ্লোবাল ভিলেজ এখন মার্কিন মুলক! এবিষয়ে উভয় বঙ্গের মধ্যে মানসিকতার মিল লক্ষণীয়!আর উচ্চ শিক্ষিত এই বঙ্গ সন্তানদের বাইরে যে বিপুল জনগোষ্ঠী তারা পশ্চিমবঙ্গে ভারতীয় আর বাংলাদেশে বাংলাদেশী! হিন্দু আর মুসলমান! বাংলার নিয়তি তাই আজও একটা দুটো বাঙালীর মুখ দেখার জন্য করে চলেছে নীরব অশ্রুপাত! কতযুগ আগে মধু কবি আত্ম বিলাপ করেছিলেন, "পরধন লোভে মত্ত করিনু ভ্রমণ পরদেশে, ভিক্ষাবৃত্তি কুক্ষণে আচরি!"
অথচ বঙ্গের ভাণ্ডারে যে বিবিধ রতন ছিল তার খোঁজ করতে গেলে এবং বিশ্বের দরবারে সেই আত্ম পরিচয়ের দৃঢ়তর প্রত্যয়ে আত্মপ্রকাশ করতে গেলে, যে জাতীয়তাবোধে দৃপ্ত হতে হয় (বিশ্বের প্রত্যেকটি উন্নত জাতির মতো); বাঙালীর তা কোনো কালেই ছিল না! এবং বাংলা ও বাঙালীর চিরন্তন অভিশাপ যে, আজ পর্যন্ত কোনো মনীষী বা নেতা বাঙালীকে জাতীয়তাবোধে দীক্ষিত করেন নি! না, স্বয়ং বঙ্গবন্ধুও নয়! কারণ বাঙালীর জাতীয়তাবোধ খণ্ড বাংলাকে ঘিরে গড়ে উঠতে পারে না! কখনোই না! আর স্বাভাবিক কারণেই তা কখনো গড়ে ওঠে নি বাঙালী মানসে! কারণ দুই হাজার বছরের এই জনপদে অখণ্ড বাঙালিয়ানা কোনো কালেই ছিল না! শ্রেণী বিভক্ত সমাজ অসাম্যের ভিত্তিতে বিভক্ত ছিল বরাবর!

তাই বাঙালী হয়ে জন্মালে বিচ্ছিন্নতা বিভেদ বিদ্বেষের অভিশাপ নিয়েই জন্মাতে হবে! সেই সূত্রেই বাঙালী চিরকাল ধনবান ও সাম্রাজ্যবাদী শক্তির বশ্যতা স্বীকার করে, তার ভাষা সংস্কৃতি ধর্ম অনুকরণ করে স্বজাতির মধ্যে নিজের শ্রেষ্ঠত্ব জাহির করে আত্মপ্রসাদ লাভ করে! এটাই বাঙালীর ধর্ম! আর এই একটি বিষয়ে কি হিন্দু কি মুসলমান, কি শিক্ষিত কি অশিক্ষিত, কি ধনী কি নির্ধন সবাই সমান! আর এই কারণেই বিশ্বকবি আক্ষেপ করেছিলেন, "রেখেছো বাঙালী করে মানুষ করনি!" সারা জীবনের অভিজ্ঞতায় বলতে বাধ্য হয়েছিলেন "সার্থক জনম আমার জন্মেছি এই দেশে" শেষ জীবনে লিখলে কেটে দিতেন সার্থক কথাটি! এতটাই অ সার্থক আমাদের বাঙালী হয়ে জন্মানো!

বৃহস্পতিবার, ২০ জুন, ২০১৩

প্রবন্ধ - শ্রীশুভ্র

মা মাটি মানুষ
শ্রীশুভ্র



মা মাটি মানুষ! পরিবর্তনের রথের চাকায় দুই বছর পার করার মুহূর্ত্তে সারদা ম্যাজিক! সেই মা মাটি মানুষের কষ্টার্জিত সঞ্চিত অর্থ; টাকা মাটি মাটি টাকা মন্ত্রে সত্যিই মাটি হয়ে গিয়েছে! বাস্তববাদী পোড় খাওয়া রাজনীতিবীদ আজীবনের লড়াকু আপোষহীন সংগ্রামী মুখ্যমন্ত্রী স্বয়ং তার সততার পরিচয় রেখে সত্যই বলেছেন , যা গেছে গেছে....! খুবই সত্যি! যা গেছে অর্থাৎ সেই কমবেশি বাইশ হাজার কোটি টাকা তো আর ফিরে আসবে না! এ তো পি সি সরকারের ম্যাজিক নয় যে, যা ভ্যানিশ হয়, তাই আবার পুরোপুরি মঞ্চে ফিরে আসবে? এ রাজনৈতিক মঞ্চ! এখানে ভ্যানিশটাই বাস্তব! কমিশন বসিয়ে হারানো প্রাপ্তিটা নয়! তবু কমিশন বসেছে! মা মাটি মানুষের রাজত্বে!

পরিবর্তনের দুই বছরেই এইভাবে সর্বস্বান্ত হতে হবে এটা হয়ত মা মাটি মানুষের সরকারে বিশ্বাস করে ভরসা করা বিপুল সংখ্যক মানুষের কল্পনাতেও আসেনি! কিন্তু সেই সরকারেরই হেভিওয়েট রাজনীতিবীদ সোমেনবাবু অনেক আগেই সরকারকে সাবধান বাণী শুনিয়েছিলেন, রাজ্যে মৃত্যু মিছিল শুরু হয়ে যাবে বলে! বারবার সাবধান করার চেষ্টা করে গিয়েছেন বামফ্রন্ট নেতৃত্ব! কিন্তু তবু যে মুখ্যমন্ত্রীকে পয়েলা বৈশাখের সকালে "তারা মিউজিক"কে কাঁদতে দেখে চিট ফাণ্ডের মোহিনী মায়ার ফাঁদের কথা জানতে হল সেটা জেনে রাজ্যবাসী যথেষ্ট অস্বস্তিতে! রাজ্যবাসীর এই অস্বস্তি ক্লাইম্যাক্সে পৌঁছাল সুদীপ্ত দেবযানী গ্রেফ্তার নাটকের পর্ব থেকে পর্বান্তরে!

যা গেছে তা গেছে! তবু কমিশন বসেছে! জনগন কি পরিবর্তনের স্বরূপটা বুঝেছে? হাওড়ার উপনির্বাচনের ফলাফল দেখে বোঝা যায় কিছু মানুষের অন্তত সম্বিত ফিরেছে! হ্যাঁ এটা নিশ্চিত, কিছু মানুষের এই সম্বিত ফেরায় তৃণমূল নেতুত্ব যথেষ্ট সচকিত! আর সেটা উপনির্বাচনের অনেক আগে থেকেই পঞ্চায়েত নির্বাচনকে কেন্দ্র করে কমিশন ও রাজ্য সরকারের বাকবিতণ্ডায় স্পষ্ট হয়ে উঠেছে! যার আতঙ্কিত বিস্ফোরণ ঘটে গেল অনুব্রত মণ্ডলের দেওয়া ফতোয়ায়! পঞ্চায়েত নির্বাচনে শত্রু সিপিএম কংগ্রেসেকে মনোনয়ন পত্র জমা না দিতে দেওয়ার বিষয়ে! বাম আমলে ২০০৮এ পঞ্চায়েত নির্বাচনের সাফল্যের ওপর নির্ভরতা যে ক্রমহ্রাসমান সেটা তৃণমূল নেতৃত্বের মুখভঙ্গী থেকে স্পষ্ট!

রাজ্য সরকার যে পঞ্চায়েত ভোট নিয়ে রাজ্যবাসীর সাথে একটু লুকোচুরি খেলতে চাইছেন, সেটা গত ২১শে জুলাইয়ের জমায়েতে বোঝা না গেলেও এখন অনেকের কাছেই স্পষ্ট! পঞ্চায়েত ভোট নিয়ে সন্ত্রস্ত তৃণমূল নেতৃত্ব ভোটের আগেই বিপক্ষ শিবিরে ত্রাস ছড়িয়ে দিতে মরিয়া কেন সেটা বুঝতে গেলে গ্রাম বাংলার গত পাঁচ বছরের পঞ্চায়েতের সাফল্য ব্যর্থতার হিসেবটা জানতে হবে! যেটা আমাদের নাগরিক পরিসরে সহজসাধ্য নয়! কিন্তু তৃণমূল নেতৃত্ব যে সেই খতিয়ানের বিষয়ে যথেষ্ট ওয়াকিবহাল সেটা অনুব্রত মণ্ডলের ফোতোয়াতেই স্পষ্ট! এবং নির্বাচনের প্রথম পর্বের মনোনয়নপত্র জমাদেওয়ার পর্বেই যে হিংসার সূত্রপাত হল, তাতেই তৃণমূল নেতৃত্বের আত্মবিশ্বাসের অভাবটা স্পষ্ট!

রাজ্য সরকারের কর্মকাণ্ডে সরকারী দলের এই আত্মবিশ্বাসের অভাব সেই কার্টুন কাণ্ড, পার্কস্ট্রীট কাণ্ড থেকেই স্পষ্ট ধরা পড়েছে! ২০১১-র বিধানসভা নির্বাচনে বিপুল জয়ের পর রাজবাসীর আশীর্বাদধন্য এই সরকার সঠিক নেতৃত্বের অভাবে দিশাহীন ছুটে চলেছে! সম্পূর্ণ এক ব্যক্তির দল হওয়াতে কোনো সাংগঠনিক পরিকাঠামো এবং দায়বদ্ধতার সৃষ্টি হয়নি দলীয় কর্মসংস্কৃতিতে! যার ফলে একদিকে দলের ভিতরেই গোষ্ঠীদ্বন্দ্ব এবং অন্যদিকে ব্যক্তিগত ভাবে দলীয় সর্বোচ্চ নেতৃত্বকে খুশি করে কাছে পৌঁছানোর ইদুঁর দৌড়ে ব্যাতিব্যস্ত তৃণমূলের অন্দরমহল! দলীয় নেতৃত্বের সকলস্তরেই যেন একটা অস্থিরতা, সরকার থাকতে থাকতে নিজের খুঁটিটা যত বেশি পাকাপোক্ত করা যায়!

স্বভাবতই এই অবস্থায় দলীয় নেতৃত্বের সকল স্তরেই নিজের নিজের আখের গুছিয়ে নেবার তাগিদে এক তীব্র অস্থিরতার সৃষ্টি হওয়ার কথা! আর সেই কারণেই সমাজবিরোধীরা অতি সহজেই নীচু তলার নেতৃত্বের হাত ধরে আভ্যন্তরীন গোষ্ঠীগুলির সম্পদ হয়ে উঠতে থাকে! আর তখনই জনগণ থেকে ক্রমশ বিচ্ছিন্ন হতে থাকে দল! এই পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বদলে দলীয় সর্বোচ্চ নেতৃত্বের প্রচ্ছন্ন প্রশ্রয়, অবস্থা ক্রমশই জটিল করে তুলেছে! যার বহিঃপ্রকাশ ঘটছে যত্রতত্র! বিপুল জনপ্রিয়তার ভোটব্যাঙ্কের উপর নির্ভর করে এখনই এই জটিল পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে না আনতে পারলে, অচিরেই তাসের ঘরের মতো ভেঙ্গে পড়বে জনপ্রিয়তার সুউচ্চ মিনার!

মা মাটি মানুষের স্লোগানের ভিত্তিই ছিল পরিবর্তনের প্রত্যয়ী শপথ! মানুষ বিশ্বাস করছিল বামফ্রন্টের শেষ পর্বের অপশাসন থেকে মুক্ত হয়ে আর্থ-সামাজিক ও রাজনৈতিক পরিসরে আসবে ব্যাপক পরিবর্তন! ব্যক্তি মানুষের মৌলিক অধিকারগুলি সুরক্ষিত হবে! অথচ কার্টুন কাণ্ডে মানুষের স্বপ্নভঙ্গ হল! মানুষ ভেবেছিল প্রশাসন দলতন্ত্র মুক্ত হবে! অথচ রায়গঞ্জ ও মাজদিয়া কলেজের ঘটনায় প্রশাসনের দুই ভিন্ন মুখ দেখে স্তম্ভিত হল রাজ্যবাসি! প্রশাসনের শীর্ষব্যক্তিত্ব একজন লড়াকু নারী বলে, রাজ্যে মহিলাদের অবস্থার উন্নতির আশা করেছিল মানুষ! অথচ এরাজ্যে নারীই আজ সবচেয়ে বেশি বিপদগ্রস্ত পথেঘাটে!

সবচেয়ে পরিতাপের কথা, যে পশ্চিমবঙ্গকে ট্যুরিজিম মানচিত্রে এক নম্বর দর্শনীয় স্থান হিসেবে গড়ে তোলার শপথ ছিল, সেই পশ্চিমবঙ্গ আজ ভারতবর্ষের এক নম্বর ধর্ষনীয় স্থান হয়ে উঠছে! এবং রাজ্যনেতৃত্ব এই ব্যাপারে ক্ষতিপূরণের বিভিন্ন স্কেল ঘোষনা করেই দায়িত্ব সারতে তৎপর! গ্রামবাংলা থেকে শহর নগরের গলিপথ থেকে রাজপথ মহিলাদের কাছে আতঙ্কসরূপ হয়ে উঠেছে! সমাজবিরোধীদের দৌড়াত্ম বৃদ্ধির বড়ো কারণ প্রশাসনের উপর দলতন্ত্রের প্রভুত্ব! আর এই সত্যটা কার্টুন বিতর্ক থেকেই প্রকট! ফলে দুস্কৃতীদের কাছে স্বর্গরাজ্য হয়ে উঠছে পশ্চিমবঙ্গ! প্রোমটার রাজ সিণ্ডিকেট দৌরাত্ম থেকে শুরু করে এলাকা দখলের রাজনৈতিক লড়াইয়ে সর্বত্র একই চিত্র!

পরিবর্তনের শপথের অন্যতম শর্তই ছিল দলতন্ত্রমুক্ত স্বচ্ছ প্রশাসন! অথচ পরিবর্তনের মাত্র দুই বছরেই সেই শপথের হয়েছে অকালমৃত্যু! আর এই বিষয়ে রাজ্যপুলিশের ভাবমূর্ত্তী দিনে দিনে তলানিতে! যার শুরু হয়েছিল পার্কস্ট্রীট ও কার্টুন কাণ্ডের মধ্যে দিয়ে! বামফ্রণ্ট আমলে যে পুলিশ প্রশাসন স্থানীয় ক্যাডার বাহিনীর অনুমতি ছাড়া ফাইল নাড়াতে পারতো না, আজ তারাই তৃণমূল নেতৃত্বের তর্জনী অনুসরণ করে চলেছে! পরিবর্তন হয়েছে ঠিক এইখানেই! প্রশাসনের প্রভুত্বের হাতবদল হয়েছে মাত্র! পরিবর্তনের মুখোশের আড়ালে এইটাই পরিবর্তনের আসল মুখ! আর এই মুখোশ সরে মুখের আদল যত প্রকাশিত হচ্ছে, তৃণমূল নেতৃত্ব ততই আত্মপ্রত্যয় হারিয়ে সন্ত্রস্ত হয়ে উঠছ!

রাজ্যের সাম্প্রতিক ঘটনাবলীতে পরিবর্তনের মুখোশের আড়ালে পরিবর্তনের মুখ কেবলই প্রকাশিত হয় পড়ছে! সারদা কেলেঙ্কারির পর আজ অব্দি রাজ্য সরকারের সারদার বিরুদ্ধে এফআইআর না করা, সিবিআইএর হাতে তদন্ত ভার তুলে না দেওয়া, এবং চিটফাণ্ড সংক্রান্ত অর্ডিন্যান্স বিলকে বিলম্বিত করে দেওয়ার প্রয়াসের মধ্যেই স্পষ্ট; সারদা কেলেঙ্কারীর অন্তরালে থাকা কুশীলবদের আড়াল করা, এবং হাতসাফাই হওয়া বাইশ হাজার কোটি টাকা দিনের আলোর অন্তরালেই লুকিয়ে রাখার প্রাণান্তকর প্রয়াস! এই যদি মা মাটি মানুষের সরকারের স্বরূপ হয়, তবে তার ফল যে পঞ্চায়েতের ব্যলটে পড়তে পারে, সে কথা ভেবেই আতঙ্কিত সরকারী দল মনোনয়নপত্র জমা দিতে আতঙ্ক সৃষ্টির পথ নিয়েছে!

বদলা নয় বদল চাই স্লোগান যে স্লোগান সর্বস্ব ক্যাচওয়ার্ডেই রয়ে গেল, সে বিষয়ে দলীয়নেতৃত্ব মোটেই চিন্তিত নয়! তাদের চিন্তা বিরোধী পক্ষের নীচুতলার কর্মীসমর্থকদের মধ্যে রীতিমতো ভীতি ও ত্রাসের সঞ্চার করে নিরঙ্কুশ জমি দখল করা! এবং সে বিষয়ে তৃণমূল নেতৃত্ব অনেকাংশেই সফল! কিন্তু এইবিষয়ে ভূতপূর্ব বাম আমলের সিপিএম ক্যাডার বাহিনীর যে সুশিক্ষিত সাংগঠনিক দলীয় সংহতিজনিত রাজনৈতিক রণকৌশল ছিল, তৃণমূলের তা না থাকার কারণে পরিবর্তনের মুখোশ অটুট রাখা সম্ভব হচ্ছে না! মুশকিলটা এখানেই! এর সাথে সাংগঠনিক দূর্বলতায় গোষ্ঠীদ্বন্দ্ব রাজ্যের শান্তি শৃঙ্খলা বিপর্যস্ত করে চলেছে! ফলে মানুষের মোহভঙ্গ হতে শুরু হয়েছে একটু একটু করে!

একথা অনস্বীকার্য, সামান্য হলেও, হাওড়া উপনির্বাচনের ফলাফলে এই মোহভঙ্গের একটা স্পষ্ট প্রতিফলন পড়েছে! এখন দেখার এই হাওয়াটাকে বামফ্রন্ট কতটা কাজে লাগাতে পারবে পঞ্চায়েত নির্বাচনে! মনে রাখতে হবে সারদাগোষ্ঠীর সাথে তৃণমূলের দলীয় নেতৃত্বের একটা প্রধানতম অংশের ঘনিষ্ঠ যোগসাজগের উপর ভরসা করেই অধিকাংশ মানুষ নিজেদের সর্বস্ব সারদায় আমানত করে ছিলেন! তাদের কাছে কিন্তু পরিবর্তনের মোহভঙ্গ হওয়া শুরু হয়েছে! কিন্তু দুঃখের বিষয়, বামফ্রন্ট নেতৃত্ব এই অবস্থা থেকে প্রতারিত মানুষগুলিকে রক্ষা করার দাবীকে একটা গণ আন্দোলনের রূপ দিতে ব্যর্থ হয়েছে! তখনই সন্দেহ হয় চিটফাণ্ডের গুড় বামফ্রন্টের পার্টিফাণ্ডেও একটুআধটু লেগে নেই তো?

বাম ফ্রন্টের এই ব্যর্থতা সত্ত্বেও স্বস্তিতে নেই তৃণমূল! দলের অভ্যন্তরে অন্তরকলহ, মাঠ পর্যায়ে গোষ্ঠীদ্বন্দ্ব, দুস্কৃতীদের সাথে নেতাদের প্রকাশ্য যোগাযোগ রাজ্যবাসীর চোখে তৃণমূলের স্বরূপ ক্রমেই স্পষ্ট করে দিচ্ছে! আর এখানেই অবাক করে দিচ্ছেন সেই পরিবর্তনকামী বুদ্ধিজীবী মহল! বাম অপশাসনের বিরুদ্ধে যারা যথার্থ কারণেই সেদিন পথে নেমেছিলেন নাগরিক দায়িত্ববোধে; আজ তারাই রাজ্য জুড়ে অন্যায় অবিচারে মুখে কুলুপ এঁটে যে যার নিজের জায়গায় অবিচল! এখানেই সফল মুখ্যমন্ত্রী স্বয়ং! পুরস্কার থেকে সরকারী পদ, সম্মান থেকে উপঢৌকন দিয়ে বুদ্ধিজীবীমহলকে নিজের গ্রীণরুমে বসিয়ে রাখতে পেরেছেন তিনি অনায়াস দক্ষতায়!

বামজামানার শেষ পর্বে সিঙ্গুর নন্দীগ্রাম আন্দোলনের সময়ে এই পরিবর্তনকামী বুদ্ধিজীবীরাই বামপন্থী বুদ্ধিজীবীদেরকে সরকারীদলের তল্পি বহনের জন্য দোষারপ করতেন! সেই অভিযোগের সারবত্তা নিয়ে আজো বিতর্ক নাই, কিন্তু আজ যখন পরিবর্তনের ফানুস ফেটে যাচ্ছে, রাজ্য জুড়ে আইন শৃঙ্খলার ব্যাপক অবনতিতে সহিংস নৈরাজ্যের পরিবেশ সৃষ্টি হয়েছে সর্বত্র; মানুষের মৌলিক অধিকার আহত হচ্ছে, প্রশাসনের উপর সরকারী দলের প্রচ্ছন্ন প্রভুত্ব স্পষ্ট অনুভুত হচ্ছে দুর্নীতির লাগামছাড়া দৌরাত্ম মানুষের শান্তি কেড়ে নিয়েছে, চিটফাণ্ডের জাদুতে লক্ষ লক্ষ লোক পথে বসেছে, নারী নির্যাতনে পশ্চিমবঙ্গ দেশে শীর্ষস্থানে উঠে এসেছে, তখন তাদের নীরবতা লজ্জাস্কর!

বুদ্ধিজীবীদের এই নৈতিক দেউলিয়া অবস্থান তৃণমূল নেতৃত্বকে অনেকটা স্বস্তিতে রাখলেও জনগণের ব্যালট যে স্বাধীন চিন্তা করতে পারে সেটা আশঙ্কা করেই আসন্ন পঞ্চায়েত নির্বাচনে মনোনয়নপত্র জমা দেবার সময় বিরোধী প্রার্থীদের সন্ত্রস্ত করে প্রথম দফাতেই প্রায় সাড়ে ছয় হাজার আসনে তৃণমূল বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় জয়ী হয়ে রেকর্ড করেছে! এই হল বদলা নয় বদল চাইয়ের সরূপ! মধ্যেখান থেকে মা মাটি মানুষের বাইশ হাজার কোটি টাকার ভ্যানিশিং ম্যাজিকে যারা আজ পথে বসলেন তাদের জন্য কোনো রাজনৈতিক দলই কোনো আশার আলো হাতে এগিয়ে না এসে পরস্পর দোষারপে নিজের নিজের মুখ রক্ষায় ব্যস্ত! এই পরিস্থিতিতে দাঁড়িয়ে রাজ্যবাসী আজ সত্যিই দিশাহারা!

৩৪ বছরে সমাজের সর্বস্তরে, সরকারের সমস্ত দপ্তরে বামফ্রন্ট তথা সিপিআইএম দলতন্ত্রের একটা প্রচ্ছন্ন নিয়ন্ত্রণ কায়েম করেছিল! তিনদশকের রাজত্ব দলতন্ত্রের এই সর্বগ্রাসী নিয়ন্ত্রণেই সম্ভব হয়েছিল! তৃণমূল ইতিহাস থেকে শিক্ষা না নিয়ে বামফ্রন্ট যে নিয়ন্ত্রণ তিনদশক ধরে গড়ে তুলেছিল সুদৃঢ় সাংগঠনিক দক্ষতায়, সেই একই দলীয় নিয়ন্ত্রণের আওতায় রাজ্যবাসীকে বেঁধে ফেলতে চাইছে মাত্র দুই বছরের সময়সীমায়! গণ্ডগোলটা এখানেই! আর ঠিক সেই কারণেই পেশীশক্তির আস্ফালনের এমন খোলা প্রদর্শন চলছে সর্বত্র! পরিবর্তনের এহেন পরিণতি থেকে রাজ্যবাসীকে উদ্ধার করতে পারে একমাত্র রাজ্যবাসীই! এখন অপেক্ষা সেই পরিবর্তন আসতে আর কত দেরী?




সোমবার, ২০ মে, ২০১৩

রবীন্দ্রশ্রদ্ধার্ঘ - শ্রীশুভ্র

পথের সাথী - বিশ্বপথিক
শ্রীশুভ্র


বড়ো বিস্ময় লাগে বলেছিলেন কবি! আকাশ ভরা সূর্য তারা আর বিশ্বভরা প্রাণের মাঝে নিজের অস্তিত্বকে অনুভব করে! অনাদী অনন্ত এই বিরাট বিপুল বিশ্বে মানুষের আবির্ভাব এক বড়ো রহস্য! কি বা এর উদ্দেশ্য কিই বা এর শেষ পরিণাম! বড়ো বিস্ময় লাগে,কান্না হাসির দোল দোলানো পৌষ ফাগুনের পালায় মানুষের ভালোবাসা তার আনন্দসরূপে বিশ্বের অভিপ্রায়কেই কেমন সহজ স্বতঃস্ফূর্ত প্রাণ প্রবাহে সার্থক করে তোলে! বড়ো বিস্ময় লাগে, জন্মমৃত্যুর মাঝখান দিয়ে জীবনের অনন্ত পথের আভাসে ইঙ্গিতে হাতছানিতে!
বিস্ময়ে কখনো কখনো অভিভূত হই আমরা এই বিশ্বের অপার রহস্যে! রহস্যের সেই পথে, জীবনের সেই পথে বহুদিন ধরেই সাথী হয়ে সাথে চলেছেন আমাদের রবীন্দ্রনাথ!

কবির কথায়, "কবে আমি বাহির হলেম তোমারি গান গেয়ে-/ সে তো আজকে নয় সে আজকে নয়" সত্যিই কোন অনাদি অতীত থেকে বিশ্বাত্মার গান জীবাত্মার চলার পথে বেজে চলেছে, সে পথেরও শেষ নেই, সে চলারও শেষ নেই; শেষ নেই সে গানেরও! সেই পথেই চলেছি আমরাও! চলেছেন পথের সাথী রবীন্দ্রনাথ, বিশ্বপথিক কবি! যে পথে স্বয়ং বিশ্বপথিক বিশ্বাত্মা নিজেই জীবাত্মার পথের সাথী! বড়ো বিস্ময় লাগে!
অনুভবের পরতে পরতে সে বিস্ময় রূপ হয়ে অপরূপ হয়ে ওঠে কবির জীবনবেদে! কবির দর্শনবোধের দ্বান্দ্বিকতায়! কবির সৃজনশীল সৃষ্টি প্রবাহের উৎসরণের উৎসবে! সেই বিস্ময়ের সংগীত মূর্ছণা রবীন্দ্রজীবনের ভরকেন্দ্রে সতত ঊর্মিমুখর! সতত আশ্রয় আমাদের মত পরবর্তীদের জন্য!

শান্তিনিকেতন গ্রন্থে কবি বললেন, "আমদের যথার্থ তাৎপর্য আমাদের নিজেদের মধ্যে নেই, তা জগতে সমস্তের মধ্যে ছড়িয়ে রয়েছে! সেই জন্য আমরা বুদ্ধি দিয়ে, হৃদয় দিয়ে, ও কর্ম দিয়ে কেবলই সমস্তকে খুঁজছি! কেবলই সমস্তের সাথে যুক্ত হতে চাচ্ছি; নইলে যে নিজেকে পাইনে! আত্মাকে সর্বত্র উপলব্ধি করব, এই হচ্ছে আত্মার একমাত্র আকাঙ্খা!" বড়ো গূঢ় কথা বললেন কবি! সমস্তের সাথে যুক্ত হতে না পারলে জীবাত্মা মিলবে কি করে বিশ্বাত্মার সাথে! সেই মিলনের অভিসারই তো সেই পথ, যে পথের পথিক মানবাত্মাও! সেই যাত্রায় জ্ঞানযোগ প্রেমযোগ ও কর্মযোগ আমাদের এগিয়ে চলার শক্তি! এই সহজ সত্যটিই ধরিয়ে দেন পথের সাথী রবীন্দ্রনাথ তাঁর আপন জীবনের গতিপথ দিয়ে!

পারিবারিক সূত্রে পিতা দেবেন্দ্রনাথের সান্নিধ্য কবিকে বেদান্ত দর্শনের অভিমূখী করে তোলে অনেক অল্প বয়সেই! জীবনের প্রথম দিকেই উন্মেষপর্বে তিনি প্রবল ভাবে প্রভাবিত হলেন বিভিন্ন উপনিষদ দ্বারা! বেদান্ত দর্শনের মূল আধার এই উপনিষদ গুলির সাহচর্য্যেই কবি উপলব্ধি করলেন বিশ্বপ্রকৃতির অন্তরস্বরূপকে! এই জগত সংসার ব্যাপী প্রচ্ছন্ন অনাদি অনন্ত বিশ্বসত্ত্বাকে কবি উপলব্ধি করলেন জ্ঞানযোগে
! বড়ো বিস্ময়ে অভিভূত হলেন জগত সত্যের অনন্ত আলোয়! কিন্তু সেই আলোকিত সত্যকে জ্ঞানযোগে জেনেও পরিতৃপ্ত হল না রবীন্দ্রমনন! নৈর্ব্যক্তিক জানা বৈজ্ঞানিকের কাম্য হতে পারে! হতে পারে দার্শনিকেরও! কিন্তু কবির পরিতৃপ্তি নৈর্ব্যক্তিকতায় নয়!

কবির কাজ রসতত্ব নিয়ে! দর্শনতত্ব বা তথ্যজ্ঞান নিয়ে নয়! তাই বিশ্বাত্মাকে জ্ঞানযোগে তাঁর নৈর্ব্যক্তিক সরূপে জেনেই, শুধু জানার মধ্যেই থেমে গেলেন না রবীন্দ্রনাথ! বিশ্বসরূপকে ব্যক্তিরূপে প্রেমের শক্তিতে প্রীতির সূত্রে অন্তরে পেতে চাইলেন রবীন্দ্রনাথ! নৈর্ব্যক্তিক বিশ্বদেবতা তাই দেখা দিলেন ব্যক্তিরূপী জীবনদেবতা হয়ে ভক্তের মননে! বিশ্বাসে! প্রেমে! যিনি ছিলেন জ্ঞেয় তিনি হলেন প্রেয়! যাঁকে জেনে ছিলেন জ্ঞানের আলোতে, তাঁকে কাছে পেলেন বিশ্বস্ত প্রেমের অনুভবে! উপলব্ধির পরিসর থেকে পৌঁছে গেলেন অনুভবের বাস্তবতায়! এই ভাবেই উপনিষদের সত্যকে কবি জীবনের সত্যে উদ্ভাসিত করে তুললেন তাঁর স্বকীয় অনন্যতায়!

এইখানেই কবি একেবারে নতুন একটি সত্যকে আলোকিত করলেন! তাঁর জীবনদেবতা বা মানবাত্মার ঈশ্বর ভক্তের আগমনের অপেক্ষায় বসে থাকেন না! বরং তিনি নিজেই চলেছেন ভক্তের সাথে মিলনের আকাঙ্খায়! ২৮শে আষাঢ় ১৩১৭-এ লিখলেন অবিস্মরণীয় সেই গান; "তাই তোমার আনন্দ আমার পর/ তুমি তাই এসেছ নীচে-/ আমায় নইলে ত্রিভুবনেশ্বর, তোমার প্রেম হতো যে মিছে!" ভক্তের জীবনে বিচিত্ররূপ ধরে ঈশ্বরেরই আকাঙ্খা বাসনা রূপ নিচ্ছে ক্রমাগত! ভক্তের অন্তরে যে রসের খেলা, সে তো ঈশ্বরেরই আপন লীলা! ভক্তের প্রেমে জীবনদেবতার প্রেমের সম্মিলনেই বিশ্বাত্মার পূর্ণ বিকাশ! তাই তো জীবনদেবতা কবিতায় লিখলেন, "মিটেছে কি তব সকল তিয়াষ আসি অন্তরে মম?" (২৯শে মাঘ ১৩০২)

একদিন আগে ২৭শে আষাঢ় ১৩১৭, কবি লিখেছিলেন; "সীমার মাঝে অসীম তুমি বাজাও আপন সুর-/ আমার মধ্যে তোমার প্রকাশ তাই এত মধুর!" এই যে সীমার মধ্যেই অসীমের প্রকাশ এটি শাশ্বত সত্য! নৈর্ব্যক্তিক সত্ত্বার ব্যক্তিরূপের প্রকাশের মধ্যে যে রসের খেলা, যে মধুর সৌন্দর্য্য, যে অপরূপ পরিতৃপ্তি সেটি রবীন্দ্রনাথের একান্ত উপলব্ধি! কবির এই উপলব্ধির নেপথ্যে উপনিষদের বৈদান্তিক দীক্ষার প্রভাব ছিল না, ছিল বৈষ্ণব ধর্মের ভক্তিরসের প্রভাব! তাই রূপের লীলায় অরূপের মধুর মিলনে বিশ্বসাগর দুলে ওঠে প্রাণের স্পন্দনে! এই পথেই কবি বিশ্বসত্ত্বার নৈর্ব্যক্তিক সত্যকে জীবনদেবতার ব্যক্তিগত প্রীতির মিলনের মধ্যে দিয়ে হৃদয়সুধায় আত্মস্থ করলেন!

পথের শেষ কোথায়? এখানেই কি থেমে যাবেন কবি? অন্তরের প্রীতিতে জীবনদেবতার সাথে পরিপূর্ণ মিলনের তৃপ্তিতেই কি ব্যক্তি জীবনের পূর্ণতা? হয়তো! হয়তো নয়! কারণ ব্যক্তিগত এই তদাত্মতার মধ্যে এই পরিতৃপ্তির মধ্যে নিজের অন্তরতমের সাথে যোগ হলেও নিজের অনাদী অনন্ত বিকাশের সিংহ দরজাটা খুলে যায় না! সেটা খুলতে গেলে বিশ্বজনীন প্রাণের সেবার মধ্যে দিয়ে বিশ্বমানবতায় পৌঁছাতে হবে!
অর্থাৎ বিশ্বাত্মার সাথে জীবনদেবতার সূত্রে অর্জিত একাত্মতাবোধে বিশ্বমানবের প্রেমে বিশ্বজনীন কর্মে আত্মনিয়োগে যে আনন্দ, সেই আনন্দেই আমাদের ব্যক্তি স্বরূপের পূর্ণ প্রকাশ!
তাই বিশ্বমানবের মধ্যে প্রীতি এবং সেবার মধ্যে দিয়েই আত্মার পূর্ণ বিকাশ সম্ভব!

"বিশ্বসাথে যোগে যেথায় বিহারো, সেইখানে যোগ তোমার সাথে আমারো"

বিশ্বমানবের সাথে প্রীতির সম্বন্ধে সেবার আনন্দে তিনি বিশ্বাত্মার সাথে মিলবেন! নিরালা নির্জন ব্যক্তি জীবনের একান্ত আরাধনায় কেবল একান্ত নিজের করে নয়, বিশ্বমানবতায় প্রতিদিনের জীবনসংগ্রামে, নিরন্তর সেবায়, দূর্বার কর্মে সকলের একজন হয়ে! উপনিষদে যেমন বলা হয়েছে সর্বজীবে ব্রহ্মের উপলব্ধির সত্যে বিশ্বমানবতাবোধের একাত্মতায় সকলের মধ্যে নিজেকে একবার খুঁজে পেলে পরার্থে স্বার্থত্যাগ সহজ হয়, আনন্দদায়ক হয়!

সেই রকমই পূর্ণজ্ঞান থেকে মানব প্রেমের সঞ্চারে সর্বজনীন কল্যাণ কর্মে আত্মনিবেদনেই মানুষের পূর্ণ উদ্বোধন! জ্ঞানে প্রেমে এবং কর্মেই মনুষ্যত্বের প্রকাশ!

এপথেই বিশ্বকবি জ্ঞানযোগে প্রেমযোগে এবং কর্মযোগের আনন্দে চলেছেন তাঁর পথেরসাথী জীবনদেবতার সাথে! টেনে নিয়েছেন আমাদেরকেও, আমাদের পথেরসাথী বিশ্বপথিক কবি! এই বিরাট বিপুল বিশ্বের বিশ্বপথিক ঈশ্বর যে পথে সকলেরই পথেরসাথী, সেই পথই সকলের পথ! শুধুই জ্ঞানযোগ নয়, শুধুই প্রেমযোগ নয়, সেবার যোগে কর্মের যোগে, আনন্দের উৎসরণই সেই পথের ঠিকানা! যে পথে " শত শত সাম্রাজ্যের ভগ্নশেষ পরে ওরা কাজ করে" (ওরা কাজ করে/ ১৩ই ফেব্রুয়ারি ১৯৪১) যেখানে, "যেথায় মাটি ভেঙ্গে করছে চাষা চাষ- / পাথর ভেঙ্গে কাটছে যেথায় পথ, খাটছে বারো মাস!" (ধুলামন্দির/ ২৭শে আষাঢ় ১৩১৭) -- সেখানেই কবি আমাদের ডাক দিয়েছেন সকলের সেবায় জীবনের পূর্ণ উদ্বোধনে!

"To be truly united in knowledge; love; and service with all beings; and thus to realise one's self in the all-pervading God is the essence of goodness; and this is the keynote of the teachigs of the Upanishads: LIFE IS IMMENSE!"
(The Relation of the Individual to the Universe/ SADHANA)

উপনিষদের এই দীক্ষায় উদ্দিপ্ত করলেন কবি! আধ্যাত্মিক উপলব্ধিকে জীবনবাস্তবতায় সার্থক করে তোলার পথ দেখালেন পথেরসাথী কবি তাঁর "ছোট আমি ও বড়ো আমির তত্বে!" আপন ব্যক্তিত্বের সংকীর্ণ পরিসর থেকে মুক্ত হয়ে বিশ্বমানবের ব্যক্তিত্বে উদ্ভাসিত হয়ে ওঠার পথের, পথেরসাথী কবি!

"When a man does not realise his kinship with the world; he lives in a prison-house whose walls are alien to him. When he meets the eternal spirit in all objects; then is he emancipated; for then he discovers the fullest significance of the world into which he is born; then he finds himself in perfect truth; and his harmony with the all is established." (The Relation of the Individual to the Universe./SADHANA)

এই যে ছোট আমির সংকীর্ণতা থেকে বড়ো আমিতে মুক্তি, এই প্রসঙ্গেই ১৩৩৮ এর আষাঢ়ে দার্জিলিং থেকে হেমন্তবালা দেবীকে এক পত্রে নিজের সাধনার দৃষ্টান্ত দিয়ে লিখছেন কবি:--

"চিরন্তন বিরাট মানবকে আমি ধ্যানের দ্বারা আপনার মধ্যে গ্রহণ করার চেষ্টা করি- নিজের ব্যক্তিগত সুখদুঃখ ও স্বার্থকে ডুবিয়ে দিতে চাই তার মধ্যে, অনুভব করতে চাই, আমার মধ্যে সত্য যা কিছু, জ্ঞানে প্রেমে কর্ম্মে, তার উৎস তিনি! সেই জ্ঞানে প্রেমে কর্ম্মে আমি আমার ছোটো আমিকে ছাড়িয়ে যাই, সেই যিনি বড়ো আমি, আমার মহান আত্মা, তাঁর স্পর্শ পেয়ে ধন্য হই, অমৃতকে উপলব্ধি করি! সেই উপলব্ধির যোগে আমার পূজা আমার সেবা সত্য হয়, আত্মাভিমানের কলঙ্ক থেকে মুক্ত হয়! কর্ম্মই বন্ধন হয়ে ওঠে এই উপলব্ধির সাথে যদি যুক্ত না হয়!" ছোট আমির দাসত্ব থেকে বড়ো আমির উন্মুক্ত পথে আত্মাকে মুক্তি দেওয়ার এই হলো পথ! যে পথে তিনিও পথেরসাথী!

এভাবেই কবি তাঁর একান্ত ব্যক্তিগত প্রয়াসে যে সাধনাকে সত্য করে তুলেছিলেন, সেই সাধনার পথে তিনি আমাদেরও ডাক দিয়ে গেলেন! বিশ্বজনীন মঙ্গলের শাশ্বত কল্যাণের সেই কর্মমুখর পথে- জাতি ধর্ম বর্ণ নির্বিশেষে বিশ্বমানবের আহ্বান ব্যক্তি মানুষের কাছে! বিশ্বপথিক ডাক দিয়েছেন পথের সাথী হয়ে! সেই পথ গিয়েছে চলে অনাগত ভবিষ্যতের দিকে চিরন্তন প্রেমের বাঁশি বাজিয়ে! আর আমরা যদি আমাদের অন্তরাত্মায় সেই বাঁশির ডাক একবার শুনতে পাই, তখনি রমনীয় হয়ে ওঠে ব্যক্তিজীবন বিশ্বজনীন মানবাত্মার আত্মীয়তায়! সেই আত্মীয়তার সূত্রেই আমাদের জ্ঞানে প্রেমে কর্মে দূর হয়ে ওঠে নিকট! পর হয়ে ওঠে আপন! প্রত্যেকেই তখন বিশ্বপথিক পথেরসাথীর সাথে!



মঙ্গলবার, ১৯ মার্চ, ২০১৩

হোলি - ফাল্গুনী মুখোপাধ্যায়

নানা কথায় হোলি
ফাল্গুনী মুখোপাধ্যায়



দোল বা হোলি হিন্দুদের এক পবিত্র উৎসব । ভারতের সর্বত্র এই উৎসব পালিত হয় নানান রীতিতে , এমনকি বহির্ভারতে নেপালে বা ভারতীয় বংশদ্ভূতদের মধ্যে হোলি উৎসব পালনের রেওয়াজ আছে । হোলি উৎসবের পেছনে নানান পৌরানিক লোককাহিনি প্রচলিত আছে এর মধ্যে প্রধান ‘হোলিকা দহন’ কাহিনি । এই থেকেই হোলি কথাটির উৎপত্তি । বাংলায় আমরা বলি ‘দোলযাত্রা’ আর পশ্চিম ও মধ্যভারতে ‘হোলি’ । আমাদের অনেক ধর্মীয় উৎসবেই আঞ্চলিক লোক-সংস্কৃতি ও রীতির প্রভাব দেখা যায় । পূর্বভারতে প্রধান ধর্মীয় উৎসব দূর্গা পূজা , পশ্চিমে গুজরাটে ‘নবরাত্রি’ । বাংলার দূর্গা, সিংহবাহনা আর গুজরাতে দুর্গা শেরওয়ালি । বাংলার দোলযাত্রায় গৌড়ীয় বৈষ্ণব রীতির প্রাধান্য , এখানে রাধা-কৃষ্ণের প্রেম লীলার বার্তাই সঞ্চারিত হয় । মথুরা বৃন্দাবনের উৎসবেও এই রীতি ।

কিন্তু মধ্যভারত বা পশ্চিমভারতে বিষ্ণু ভক্ত প্রহ্লাদের কাহিনিই প্রাধান্যপায় । সেই পৌরানিক কাহিনিটি এই রকম । দৈত্যরাজ হিরন্যকশিপু ব্রহ্মার বরে বলীয়ান ছিলেন যে , সে যেকোন পশু বা মানুষের দ্বারা অবধ্য । ব্রহ্মার বরে বলীয়ান হিরন্যকশিপু দেবলোক আক্রমণ করে, দেবলোক তার পরম শত্রু । কিন্তু হিরন্যকশিপুর পুত্র প্রহ্লাদ ভগবান বিষ্ণুর পরম ভক্ত । দৈত্যকুলে বিষ্ণুভক্ত প্রহ্লাদকে হত্যা করার নানান ষড়যন্ত্র করে পিতা হিরন্যকশিপু । কিন্তু ব্যর্থ হয় ।

হিরন্যকশিপুর ভগ্নী হোলিকাও বরপ্রাপ্তা ছিল যে অগ্নি তাকে বধ করতে পারবেনা । সুতরাং হিরন্যকশিপু হোলিকার কোলে বালক প্রহ্লাদকে বসিয়ে আগুন লাগিয়ে দিল । দাউদাউ অগ্নিশিখার মধ্যে প্রহ্লাদ ভগবান বিষ্ণুকে স্মরণ করে । বিষ্ণুর কৃপায় প্রহ্লাদ অগ্নিকুন্ড থেকেও অক্ষত থেকে যায় আর হোলিকা পুড়ে নিঃশেষ হয়ে যায় । হিরণ্যকশিপুকে ভগবান বিষ্ণু নৃশিংহ অবতার রুপে বধ করেন ।

রঙ উৎসবের আগের দিন ‘হোলিকা দহন’ হয় অত্যন্ত ধুমধাম করে । শুকনো গাছের ডাল , কাঠ ইত্যাদি দাহ্যবস্তু অনেক আগে থেকে সংগ্রহ করে সু-উচ্চ একতা থাম বানিয়ে তাতে অগ্নি সংযোগ করে ‘হোলিকা দহন’ হয় । পরের দিন রঙ খেলা । বাংলাতেও দোলের আগের দিন এইরকম হয় যদিও তার ব্যাপকতা কম – আমরা বলি ‘চাঁচর’ । এই চাঁচরেরও অন্যরকম ব্যাখ্যা আছে । দোল আমাদের ঋতুচক্রের শেষ উৎসব । পাতাঝরার সময় , বৈশাখের প্রতিক্ষা। এই সময় পড়ে থাকা গাছের শুকনো পাতা, তার ডালপালা একত্রিত করে জ্বালিয়ে দেওয়ার মধ্যে এক সামাজিক তাৎপর্য খুঁজে পেতে পারি । বাংলায় দোলের আগের দিন ‘চাঁচর’ উদযাপনকে এভাবেই ব্যাখ্যা করা হয় ।

অঞ্চল ভেদে হোলি বা দোল উদযাপনের ভিন্ন ব্যাখ্যা কিংবা এরসঙ্গে সংপৃক্ত লোককথার ভিন্নতা থাকতে পারে কিন্তু উদযাপনের রীতি এক । ঐতিহাসিকরা বিশ্বাস করেন পূর্বভারতে আর্যরা এই উৎসব পালন করতেন । যুগেযুগে এর উদযাপন রীতি পরিবর্তিত হয়ে এসেছে । পুরাকালে বিবাহিত নারী তার পরিবারের মঙ্গল কামনায় রাকা পূর্ণিমায় রঙের উৎসব করতেন ।

দোল হিন্দু সভ্যতার অন্যতম প্রাচীন উৎসব । নারদ পুরাণ, ভবিষ্য পুরাণ ও ‘জৈমিনি মিমাংশা’য় রঙ উৎসবের বিবরণ পাওয়া যায় । ৩০০ খৃষ্টপূর্বাব্দের এক শিলালিপিতে রাজা হর্ষবর্ধন কর্তৃক ‘হোলিকোৎসব’পালনের উল্লেখ পাওয়া যায় । হর্ষবর্ধনের নাটক ‘রত্নাবলী’তেও হোলিকোৎসবের উল্লেখ আছে । এমনকি আলবিরুণীর বিবরণে জানা যায় মধ্যযুগে কোন কোন অঞ্চলে মুসলমানরাও হোলিকোৎসবে সংযুক্ত হতেন । মধ্যযুগের বিখ্যাত চিত্রশিল্পগুলির অন্যতম প্রধান বিষয় রাধা-কৃষ্ণের রঙ উৎসব ।

উদযাপনের রীতি রেওয়াজে ভিন্নতা থাকলেও দোল বা হোলির মূল সুরে কোন ভিন্নতা নেই তা হলো রবীন্দ্রনাথের গানের কথায় -
“রাঙ্গিয়ে দিয়ে যাও যাও যাওগো এবার যাবার আগে
তোমার আপন রাগে, তোমার গোপন রাগে,
তোমার তরুণ হাসির অরুণ রাগে,
অশ্রুজলের করুণ রাগে ......
মেঘের বুকে যেমন মেঘের মন্দ্র জাগে,
তেমনি আমায় দোল দিয়ে যাও
যাবার পথে আগিয়ে দিয়ে
কাঁদন-বাঁধন ভাগিয়ে দিয়ে” ।।

তবে অন্য অনেক উৎসবের মত হোলিতেও অনেক নষ্টামি দেখা দিয়েছে সাম্প্রতিক সময়কালে । অন্ধের মত গাছ কাটা হয় । মধ্যভারতে চাকুরী সূত্রে দীর্ঘদিন বসবাসের সুবাদে দেখেছি। দেখেছি রেল কোয়ার্টারের জানালা পর্যন্ত খুলে হোলিকা দহনের আগুনে জ্বালিয়ে দেওয়া হয়েছে। আর বিষাক্ত রঙের কারণে চোখ নষ্ট হয়ে যাওয়া তো প্রতি বছরই হয় । সেসম্পর্কে আমরা সতর্ক থাকি । কিন্তু সেই সব নষ্টামি হোলি বা দোল উৎসবের যে পবিত্র বার্তা, পারস্পরিক ভালোবাসার যে বার্তা তা কিছুমাত্র লঘু হয়ে যায়না। উৎসবের পবিত্রতার দিকটিই আমাদের গ্রহণীয় ।

শনিবার, ১৯ জানুয়ারি, ২০১৩

প্রবন্ধ - শ্রীশুভ্র






এ কোন সকাল! এ কোন পরিবর্তন!


"যারা অন্ধ সবচেয়ে বেশি
আজ চোখে দেখে তারা;
যাদের হৃদয়ে কোনো প্রেম নেই-  প্রীতি নেই
-
করুণার আলোড়ণ নেই
পৃথিবী অচল আজ তাদের সুপরামর্শ ছাড়া!...."

অমোঘ সত্যের এই লাইনগুলোই বিদ্যু চমকের মত মুহূর্মুহূ
আঘাত করে মস্তিষ্কের কোষাগারে; যখনই রোজকার প্রভাতী সংবাদে চোখ পড়ে যায়!

কথা হচ্ছিল সম্পাদকের সাথে! এবারের সংখ্যায় লেখার বিষয়বস্তু নিয়ে! সম্পাদকের অনুরোধ বিষয় হোক এই সময়!

এই সময়ের কথা ভাবলেই মন্ত্রের মতো জীবনানন্দের এই লাইন কটি বিবস্ত্র করে দেয় আমাদের! সবচেয়ে দুঃখের কথা কোনো মতবাদই, কোনো তন্ত্রই তখন আর লজ্জা নিবারণ করতে পারে না! সত্যই তখন মনে হয় "অদ্ভুত আঁধার এক এসেছে এ পৃথিবীতে আজ"!

মানুষের সমাজ সভ্যতার মূল কেন্দ্রে জীবনানন্দ যে অন্ধকারকে শিকড় বিস্তার করতে দেখে গিয়েছিলেন আজ তা হয়ত সর্বগ্রাসী জাল বিস্তারে পরিব্যাপ্ত হয়েছে! সে আমাদের নিজেদের লজ্জা! প্রতিরোধে দৃঢ় সংকল্প ছিলাম না আমরা! বিভিন্ন মতাদর্শ নিয়ে বিতর্ক করেছি যত কোনো আদর্শের প্রতিই সততা ধরে রাখতে পারিনি তত! ফলে আদর্শের রাস্তা দিয়ে এগোনোর বদলে ক্রমেই কুরুক্ষেত্র করে তুলেছি নিজস্ব পরিসর! নিজের সাথে অন্যকেও দাঁড় করিয়ে দিয়েছি অন্ধকারের মধ্যেখানে! সান্ত্বনা দিয়েছি নিজেকে, ঘোর কলি বলে! তাই দায় এড়ানো হয়েছে সহজ! ক্রমেই বাসযোগ্যতা হারিয়েছে আমাদের পরিপার্শ্ব! ক্রমেই জমে ওঠা জঞ্জালের স্তুপে চাপা পড়েছে নতুন প্রজন্মের দিশা!

আমাদের দ্বিখণ্ডীত এই বাংলায় অদ্ভুত আঁধারের এই সংস্কৃতি নতুন নয়! এর ইতিহাস অতি সুপ্রাচীন! স্বয়ং শ্রীচৈতন্যকেও লড়তে হয়েছিল এই অন্ধকারের বিরুদ্ধে! তারপর গঙ্গা পদ্মা দিয়ে কত জল গড়িয়ে গেল! এখন আমরা আর লড়াইয়ের মধ্যে নেই! যে যার ফেস্টুনে মাঝে মধ্যে শুধু শ্যাডো প্র্যাকটিস করি একটু আধটু! বস্তুত স্বাধীনতার চোরাবালিতে ৪৭এর বাংলা ভাগের  সেই সন্ধ্যে থেকেই আমরা লড়াই ছেড়ে ফেস্টুন ধরেছি! ফেস্টুনের তলায় ঘর গুছিয়ে নিয়েছি! এটাই এখন বঙ্গসংস্কৃতির বর্ণপরিচয়!
আখের গোছানো দলবাজি রাজনীতির সহজপাঠে বাঙালি এখন সাবালক! শুধু তাই নয় এই বিষয়টাকে শিল্পের পর্যায়ে নিয়ে যেতে পেরেছি আমরা! তাই আজ রাজনীতি একটা ইন্ডাস্ট্রী!

গত ছয় দশকে এরাজ্যে দলীয় রাজনীতির নিয়ন্ত্রণে নিয়ন্ত্রিত জনজীবন! ফলে রাজনৈতিক পরিসরের বাইরে এরাজ্যে মুক্ত পরিবেশের অবসর প্রায় নেই বল্লেই চলে! আজকের সংস্কৃতি তাই "আমরা ওরা"র সংস্কৃতি! তার বাইরে তৃতীয় কোনো ভূবনের সংস্থান আজও গড়ে ওঠেনি! এরই মধ্যে আমাদের ব্যাক্তিস্বাধীনতার সংবর্ত!

সেই আমরা ওরার ঘূর্ণীপাকে আজ  আমাদের পরিবর্তনের গল্পগুলি ফেস্টুনে ব্যানারে ভোটের ইশতেহারে রাজনৈতিক পতাকার রঙে রঙিন স্বপ্নের ঢেউ ভাঙ্গে কেবলই!বস্তুত সেই গল্পের রসে মজে ভোটের লাইনের ভিড় যত বাড়ে ততই কারুর পৌষমাস তো কারুর সর্বনাশ! আজকের পশ্চিমবঙ্গের লড়াইটা তাই অন্ধকারের বিরুদ্ধে নয়! ক্ষমতার পক্ষে!
ওরা নয় আমরা! এটাই শেষ কথা!

এই "আমরাই থাকব"র দম্ভে চৌত্রিশ বছরের রাজত্বের পরিবর্তনে মানুষ আশা করেছিল তৃণমূল স্তর থেকে প্রশাসনের উর্দ্ধতম স্তরে দলীয় রাজনীতির প্রভাব থেকে রাজ্যকে মুক্ত করা যাবে! কিন্তু পরিবর্তনের দেড় বছরেই জনসাধারণের স্বপ্নভঙ্গ হওয়া শুরু হয়ে গিয়েছে! একটার পর একটা ঘটনা প্রমাণ করছে পরিবর্তন হয়েছে শুধুমাত্র দুইটি ক্ষেত্রেই! প্রথম পরিবর্তন শাসক দলের নাম ও দলীয় পতাকায়! এবং দ্বিতীয় পরিবর্তন; ভূতপূর্ব সরকারের আমলে দূর্নীতির বিকেন্দ্রীকরণ হয়েছিল সাংগঠনিক সুশৃঙ্খলার মধ্যে দিয়ে! বর্তমান প্রশাসনে সেটিই ঘটছে চুড়ান্ত বিশৃঙ্খলায়! আর পূর্বতন শাসক দল চলত কেন্দ্রীয় পরিচালন মণ্ডলীর নির্দেশে! বর্তমান দল এক ব্যাক্তির অধীন!

ক্ষমতার দখল ও রাজনৈতিক ক্ষমতায় ব্যাক্তিগত স্বার্থে অর্থনৈতিক ফয়দা তোলার এই রাজনৈতিক সংস্কৃতির ধারায় রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের একটাই অভিমুখ; পরস্পরের দোষারোপ করা! এর বাইরে জনগণের কাছে কোনোরকম রাজনৈতিক দায়বদ্ধতার সংস্কৃতি আজ আর অবশিষ্ট নেই! বর্তমানের এই পরিমণ্ডলে বুদ্ধিজীবীদের দুই শিবিরে বিভক্ত হয়ে এই পারস্পরিক দোষারোপের ধারায় জড়িয়ে পড়া এই বাংলার পক্ষে এক গভীরতম বিপর্যয়! এর ফল অনেক দীর্ঘস্থায়ী প্রভাব ফেলতে বাধ্য! আমরা অনেকেই হয়তো এই বিষয়টা নিয়ে এখনই তত চিন্তিত নই, যতটা নিশ্চিন্ত বুদ্ধিজীবীদের দীর্ঘ তিন দশকের নীরবতা ভেঙ্গে সরব হয়ে ওঠার বিষয়ে! ফলে নিরপেক্ষ দৃষ্টিকোণের প্রতিভাসটা আজ হারিয়ে যেতে বসেছে!

বুদ্ধিজীবীদের রাজনৈতিক শিবিরায়ন যে কোনো সমাজের পক্ষেই অশনি সংকেত! রাজনৈতিক দলগুলির অনৈতিক কর্মকাণ্ডের সাফাই গাওয়া, ব্যাক্তিগত খ্যাতিকে মুলধন করে জনগণকে বিশেষ বিশেষ রাজনৈতিক দলের সম্বন্ধে প্রলুব্ধ করা ও বিপক্ষ দল সম্বন্ধে বিভ্রান্ত করার মধ্যে দিয়ে সামাজিক অবক্ষয়ের ভিত্তিটাকেই পোক্ত করা হয়! এবং এর ফলে ক্রমেই জনমানসে বুদ্ধিজীবীদের বিশ্বাসযোগ্যতা হ্রাস পেতে থাকে! রাজনৈতিক দলগুলির মুখপাত্র হয়ে গিয়ে তারা আর সমাজকে কোনো রকম মৌলিক দিশা দেখাতে পারেন না! আর তখনই সামাজিক অগ্রগতি রুদ্ধ হয়ে গিয়ে সমাজ পারস্পরিক দোষারোপের কালিমা লেপনের অক্ষের চারপাশে ঘুরতে থাকে একই জায়গায় দাঁড়িয়ে! যার ফয়দা লুটতে থাকে অনেকেই!

এ এক অভিশপ্ত সময়! রাজনৈতিক মতাদর্শ নয়! রাজনৈতিক কর্মসূচীর স্বপক্ষে নৈতিক সমর্থনের তল্পিবাহনে যখন ব্যাস্ত বুদ্ধিজীবী মহল, স্বভাবতঃই তখন রাজনৈতিক দূর্বৃত্তায়ন
বিস্তার দ্রুততর হয়ে ওঠে! আর সেই সুযোগটাকেই জমি দখলের লড়াইয়ে কাজে লাগাতে তপর পরস্পর প্রতিপক্ষ দলগুলি!এমত অবস্থায় রাজনৈতিক অস্থিরতা খুন জখম দাঙ্গাবাজি বাড়তেই থাকবে! জনসাধারণের স্বাভাবিক জীবনযাপন প্রতিহত হতে থাকবে প্রতিনিয়ত, এই পরিস্থিতির কাছে! আর আমরা ওরার বিভাজন বাড়তে বাড়তে আইন শৃঙ্খলার অবনতি অবশ্যম্ভাবি! আজকের এই পরিস্থিতি নিশ্চয়ই একদিনে সৃষ্টি হয়নি! দীর্ঘ কয়েক দশকের রাজনৈতিক প্রক্রিয়ায় গড়ে উঠেছে এই সংস্কৃতি! শপথ ছিল তারই পরিবর্তনের!

যারা ভেবেছিলেন এই অবস্থার পরিবর্তন আনবে তাদের মূল্যবান ভোট, যারা বিশ্বাস করেছিলেন পরিবর্তনের শপথ নেওয়া নেতানেত্রীদের প্রতিশ্রুতিতে এবার দিন পাল্টাবে, সুদিন আসবে; তাদের আজ বিশ্বাসভঙ্গের দিন! বিস্ফোরিত শিহরণে একটার পর একটা ঘটনা প্রত্যক্ষ করে তারা এখন বিস্মিত হয়ে অনুভব করছেন পরিবর্তন এসেছে তবে মাত্র দুটি ক্ষেত্রে! প্রশাসকের নাম ধাম রঙ হয়েছে বদল! আর সুসংঘটিত সাংগঠনিক শৃঙ্খলায় যে রাজনৈতিক দূর্বৃত্তায়ন ছিল পর্দার আড়ালে, আজ সেটা রঙ বদলে বিশৃঙ্খল সংঘটনের বেআব্রুতায় চলে এসেছে প্রকাশ্যে! ভূতপূর্ব প্রশাসক দল ঠিক যেখানে শেষ করেছিলেন তাদের ইনিংস, পরিবর্তনের দলটি সেইখান থেকেই বাউন্ডারী হাঁকাচ্ছেন খুব দ্রুত!

পরিবর্তনের পতাকা নিয়ে এহেন তাড়াহুড়ো এভাবে চলতে থাকলে তিনদশক কেন তিনবছরেই ইনিংস শেষ হতে পারে! তবে তাতেও জনসাধারণের বিশেষ লাভ নেই! কারণ তৃতীয় কোনো বিকল্প রাস্তা আমরা খুলতে পারিনি!

এই যে বিকল্পহীনতা এটাই ভয়ংকর! এটা গণতন্ত্রের পক্ষেই অস্বাস্থ্যকর! নাগরিক সামাজের মধ্যে এখনও যে সামান্য অংশে পচন ধরেনি, তাদের সময় এসেছে কোনো তৃতীয় বিকল্পের দিকে সমাজকে আলো দেখানো! আসল পরিবর্তনের সূচনা করতে গেলে যা জরুরী!রাজ্যরাজনীতির ক্ষমতা দখলের এই লড়াই নয়ত ক্রমেই ক্যানসারের মতো দূরারোগ্য ব্যাধিতে পরিণত হয়ে যাবে! শকুন আর শেয়ালের খাদ্য হয়েই শেষ হবে তাদের হৃদয়, এখনো যাদের কাছে স্বাভাবিক বলে মনে হয় মহ সত্য বা রীতি!

প্রবন্ধ - ফাল্গুনী মুখোপাধ্যায়



এই সময় সেই সমর এবং সব সময় ...


এই সংখ্যার বিষয় ভাবনা এই সময়এই সময় কথাটা আমার কাছে কিঞ্চি বিভ্রান্তিকর,কারণ কথাটা কিছু নির্দেশ করেনা। সেই অর্থে চলমান সময়ের কবিতা, বা সাহিত্য বা এই সময়ের রাজনীতি ইত্যাদি নির্দিষ্ট অভিমুখ পাওয়া যেতে পারেআরো একটা ধাঁধা আছে। এই সময়তো পমুহুর্তেই সেই সময় হয়ে যাচ্ছে। তাহলে ? আসলে কোন চলমান সময়ের শিল্প-সাহিত্য-  বা যেকোন সৃষ্টির বিচার সেই চলমান সময়ে করা যায়না। সময় চলিয়া যায় নদীর স্রোতের প্রায় প্রবাদ হয়ে যাওয়া এই কথাটা ঠিক আবার বেঠিকও বটে। বেঠিক, সময়কে ধরা যায়না কিন্তু চলমান সময়ের সৃজনশীলতাকে আমরা ধরে রাখতে পারি। সময়ের শরীরে ধরে রাখা সবকিছুই তখন ইতিহাসের উপাদান। এই সময়ে লেখা প্রয়াত সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের বৃহ  সেই সময় উপন্যাসটির নাম এই সময় হতে পারতোনা। সময়কে ধরে রাখা যায় বলেই এই সময়কে অতিক্রম করে উনিশ শতাব্দীর সেই সময়ে পৌছে যাই ঐ সৃজনকর্মের মধ্য দিয়ে। চলে যাওয়া সময়কে আবার ঘটিয়ে দেওয়া যায়না বটে কিন্তু ফিরে ফিরে আসে মানুষের সৃজনকর্মের মধ্য দিয়ে
                
     সময়ের গতিও কি সবযুগে এক থাকে? না থাকেনা , যদি সমাজ ও সভ্যতার বিবর্তনের গতিকে সময়ের সঙ্গে এক করে দেখি। এদেশে প্রথম ধনিমূদ্রন ব্যবস্থা গ্রামোফোন রেকর্ড চালু হয় ১৯০২ সালে আর মাত্র ১০০ বছরের মধ্যে ৭৮ পাক গ্রামোফোন রেকর্ড থেকে এক্সটেন্ডেড প্লে, লং প্লেইং রেকর্ড, টেপ রেকর্ডিং, ক্যাসেট, সিডি, ডিভিডি পদ্ধতিকে জাদুঘরে পাঠিয়ে দিয়ে এখন মাইক্রো চিপস।  প্রাচীন সাহিত্যের ইতিহাস কিংবা সামাজিক ইতিহাসের সময় বা সমাজ বিবর্তনের একক তাই ধরা হত শতকের হিসাবে পঞ্চম শতাব্দী, সপ্তম শতাব্দী ইত্যাদি , আর এখন দশকের একক অর্থা ত্রিশএর দশক , পঞ্চাশের দশক এই রকম। কারণ একটা শতকের সময় কালে সমাজ বা সাহিত্যের বিবর্তন এতো দ্রুত, যুগ লক্ষণ বা দ্বান্দ্বিক সূত্রগুলি পালটে যাছে এতো দ্রুত যে সেগুলিকে আর শতকের এককে ধরে রাখা যাচ্ছেনা
     
   একটি ফেসবুক ব্লগজিনে একটা অনলাইন আলোচনার প্রতিবেদন পড়ছিলাম। বিষয়- সাহিত্যের ক্ষেত্রে কোন দশক বলে সীমা রেখা থাকা কি উচি ? প্রতিবেদনের কথা থাক। বিষয়টাই তো বোকা বোকা লাগে। আমি আপনি কে এই সীমারেখায় ভাগ করার ? মুকুন্দরাম চক্রবর্তী যখন ষোড়শ সতকে চন্ডীমঙ্গল কাব্য রচনা করেছিলেন তখনকি এই ভেবে লিখেছিলেন যে তাঁর কাব্য শুধু সেই সময়ের জন্য ? বিষয়টাতো এই যে লেখকের সৃজনকর্ম তাঁর সময়এর প্রতিনিধিত্ব করছে কিনা, তাঁর সময়এর যুগলক্ষণগুলি তাঁর সৃজনকর্মের শরীরে ছায়াপাত ঘটাচ্ছে কিনা। রোম ভস্মিভূত হবার সময় সম্রাট নীরোর বেহালা বাজানোর উপমাটা ক্লিশে হয়ে গেছে ঠিকই, কিন্তু সম্রাট নীরো বেহালার ছড় টেনে একটা সঙ্গীতের সৃষ্টি করেছিলেনতো ! অপাংক্তেয় সেই সৃষ্টি আস্তাকুড়ে চলে গেছে কারণ সেই সৃষ্টি সময়ের দাবী মেটায়নি। গোষ্ঠীমানুষ, তার চারপাশ , আর সময় ভিন্ন আর কিছুই সাহিত্য শুধু নয় কোন সৃজনকর্মের বিষয়বস্তু হতে পারেনা। এই সময়এর যাকিছু সৃষ্টি বিচার আমি অন্তত এই মাপদন্ডেই করবো।
               
    দক্ষিণ আফ্রিকার বর্ণভেদ বিরোধী আন্দোলনের নিপীড়িত কালো মানুষের কবি, ফাঁসির দড়িতে মৃত্যুবরণকারী শহিদ কবি বেঞ্জামিন মোলায়েসএর দুঃসময় নামে একটি কবিতা উদ্ধৃত করি

“এখন সেই দুঃসময়, যখন
ঘন অরণ্যের আড়ালে
রোদ্দুর হারিয়ে গেছে
আমরা কেউ কোন প্রিয় মুখ
আর উজ্বলন্ত, দেখিনা
আমার মা নিঃশব্দে হেঁটে হেঁটে
কোথায় যাচ্ছে তা অন্ধকারে
ঠাওর করা দুঃসাধ্য
এখন কুঠারের আঘাতে আঘাতে
অরণ্যের অন্ধকার ছিন্ন ভিন্ন করে
এই ভয়ংকর সময়কে কে রুখতে চায়, কে ?
আমি তুমি আর
জঠরে যে ভ্রুণ আছে
সে”। (অনুবাদ সৌমিত্র সেনগুপ্ত)
 
    এ কবিতাতো একটা দেশের ও সময়ের বিশেষ প্রেক্ষিতে লেখা , কেমন করে দেশ কালএর উর্ধে উঠে গেলো? কিংবা তুরস্কের বিপ্লবী কবি ৬১ বছরের জীবনকালের বেশির ভাগটাই যার পলাতক ও বন্দী জীবন, সেই নাজিম হিকমতের জেলখানার চিঠির শেষ কয়েকটা পঙক্তি
আমি জেলে যাবার পর আরো বেশি উজ্বল হয়েছে দিন
আর আমি বারংবার সেই একই কথা বলছি
জেলখানার দশটা বছরে যা লিখেছি সব তাদেরই জন্য,
তাদেরই জন্য যারা মাটির পিঁপড়ের মত, সমুদ্রের মাছের মত অগণন
যারা ভীরু, যারা বীর, যারা শিক্ষিত, যারা শিশুর মত সরল
যারা ধ্বংস করে, যারা সৃষ্টি করে
কেবল তাদেরই বৃত্তান্ত আমার গানে।
আর যা কিছু, ধরো আমার জেলখানার এই দশটা বছর , শুধু কথার কথা”।
কবিতার শরীরে সময় আর মানুষের কথা রয়েছে বলেই এ কবিতা দেশ-কালের ঊর্ধে উঠে যায়
                 
    স্বাধীনতা-উত্তর কাল থেকে সাতটা দশক পেরিয়ে এলাম। প্রতিটি দশকেরই বিশেষ যুগলক্ষণ থাকতে পারে। সবগুলিই শিল্পসাহিত্যের ক্ষেত্রে ব্যাপক প্রভাব হয়তো ফেলেনা। কারণ সমাজ বন্দোবস্তের বা সেই সমাজের মানুষের বোধএর তেমন কোন হেরফের হয়না। ধরা যাক মধ্য আশি থেকে  এই দুহাজার দশ এই প্রায় চার দশকে বাঙ্গালির সমাজ বন্দোবস্তে দৃশ্যমান কোন পরিবর্তন এসেছে কি? কিংবা তার সৃজনশীলতাকে একটা নতুন বাঁকে এনে দাঁড় করাবে,খুঁজে পাবে আমাদের নাড়া দেওয়ার মত কোন উপাদান?  না আসেনি। প্রবল ভাবে এসেছে এক শূণ্যতা বোধএই সময়ের সাহিত্য সংস্কৃতিতে তাই শুধুই শূণ্যতা বোধ, শুধুই মধ্যবিত্ত মানুষের আত্মযুদ্ধ। সাহিত্য-নাটক গান বা বুদ্ধির চর্চায় এই চারটি দশক আগামী প্রজন্মের কাছে গর্ব করার মত কোন উপাদান দেয়নি। এই সময় অতএব শূণ্যতা বোধের সময়, অন্তত উপলব্ধীতে। হয়তো আরো অনেকের কাছে
    
    কোন কোন যুগে আমাদের মনন ও জীবনবোধ ও চর্চায় এক একটা বাঁক আসে, তখন আমাদের মনন ও সৃষ্টির ভুমিও উর্বর হয়। এরকমই হয়েছিল গত শতাব্দীর চল্লিশের দশকে তারপর আবার সত্তরের দশকে। চল্লিশের দশকে প্রগতি লেখক আন্দোলন ও গণনাট্য আন্দোলনের ফলশ্রুতিতে আমাদের মননের যে উর্বর ভুমির নির্মাণ হয়েছিল তাইই একটা পরিণতি বিন্দুতে পৌছেছিল সত্তরের দশকে। জীবনের নবতর বোধের নির্মাণ ভুমি থেকেই ২য় যুদ্ধ পরবর্তী সময় কালে উঠে এসেছিলেন মাণিক বন্দ্যোপাধ্যায়, প্রেমেন্দ্র মিত্র, সলিল চৌধুরী, ঋত্বিক ঘটক, মৃণাল সেন, সত্যজি রায়, হেমন্ত মুখোপাধ্যায়, রবিশঙ্কর, সুচিত্রা মিত্র, দেবব্রত বিশ্বাস, উপল দত্ত, শম্ভূ মিত্র, বিষ্ণু দে, বুদ্ধদেব বসু এবং চিরদিন গর্ব করার মত কত নাম
     
    আমি চল্লিশ পরবর্তী সময়কালের কিংবা সত্তর দশকের আর্থ-সামাজিক ও রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটের বা সেইসময়ের অভূতপূর্ব সৃষ্টি প্রাচুর্যের মধ্যে ঢুকবোনা , ঢোকা সম্ভবও নয় এই ক্ষুদ্র পরিসরের নিবন্ধে। শুধু এইটুকু বলি সত্তরের দশকটা ছিল বাংলার সমাজ জীবনে এক ক্রান্তিলগ্নের সময়কাল। সত্তর দশকটা  একদিকে ছিল মৃত্যুর দশক এবং একই সঙ্গে সৃজনের দশকও বটে। কবি বিমল ঘোষের কবিতার কয়েকটি পংক্তিতে আমি সত্তরের দশকটাকে ফিরে দেখবো

“কিনুগোয়ালার গলি
সোনার টুকরো ছেলেরা সব অশ্বমেধের বলি
বারুদ গন্ধ বুকে নিয়ে আকাশে ফোটে জ্যোস্না
ময়লা হাতে ওকে তোরা ছুঁসনা
ওরে মওন, পৃথিবীর গভীর
গভীরতর অসুখ এখন”

    তো চল্লিশ পরবর্তী সময়কালে এইযে সৃষ্টি প্রাচুর্য, বাঙ্গালির মননের এই উর্বর নির্মাণভুমি তা সম্ভব হয়েছিল শিল্প-সাহিত্যে সমাজ বাস্তবতার ছবি আঁকার জন্য। এমন নয় যে এখনকার শিল্প-সাহিত্যে সমাজ বাস্তবতার ছবি বিন্দুমাত্র নেই। একটা ধারা আছে এবং থাকবেই, কিন্তু সেটা মূল শ্রোত নয় হতাশা এখানেই। এবং এখানেই বলার কথা যে আমরা সেই ধারাটিকে বেগবান করতে পারছি কিনা। সমাজ-বাস্তবতার শৈল্পীক প্রতিফলন সেই সাহিত্যকে কালোত্তীর্ণ করে। পাবলো নেরুদার ঐতিহাসিক নোবেল ভাষণের কয়েকটি বাক্য উধৃত করে এই নিবন্ধের ইতি টানবো যেখানে নোবেল জয়ী কবি, কবি ও কবিতার দায়বোধ সম্পর্কে তাঁর ভাবনার কথা ব্যক্ত করেছিলেন
“আমি কোন বই পড়ে কবিতা লিখতে শিখিনি। কাউকে আমি শেখাতেও পারবো না কি করে কবিতা লিখতে হয়। ... আমার এই পথচলার কাহিনি দিয়ে একটা কবিতা তৈরি হয়ে যায়। তাতে আমি মাটি থেকে উপাদান নিই, আত্মা থেকে উপাদান নিই। আমার কাছে কবিতা একটা কাজ, একটা গুরুত্বপূর্ণ কিন্তু ক্ষণস্থায়ী কাজ, যার মধ্যে মিশে আছে একাকীত্ব ভাবনার বিশ্বস্ততা, আবেগ ও গতি, নিজের কাছে আসা, মানুষের কাছে আসা, প্রকৃতির গোপনীয়তার প্রকাশ। আমি প্রবলভাবে বিশ্বাস করি যে মানুষ তার ছায়ার সাথে,আচরণের সাথে,কবিতার সাথে যে আটকে আছে, মানুষের যে সমাজবদ্ধতার চেতনা, তা সম্ভব হয়েছে কারণ মানুষের একটা প্রচেষ্টা আছে স্বপ্ন আর বাস্তবকে মেলানোর। কবিতা এই স্বপ্ন ও বাস্তবকে মেলানোর কাজটা করে”