সৌকর্য গ্রুপের একমাত্র ওয়েবজিন।

About the Template

বৃহস্পতিবার, ২০ জুন, ২০১৩

ছোট গল্প - পূজা মৈত্র

না মেলা অঙ্ক
পূজা মৈত্র



তারার মেইলটা এসেছে। অফিসে গিয়ে প্রথমেই মেইল ইনবক্স চেক করে প্রতীক। বরাবরের অভ্যাস। আজকেও করল। তবে আজকের চেক করাটা রোজকারের মত ম্যাড়মেড়ে নয়। একটা উত্তেজনা মেশানো কৌতূহল প্রতীকের কপালে বিন্দুবিন্দু ঘাম হয়ে জমা হয়েছে। হবে না-ই বা কেন? নীরস কেজো মেইল নয় এটা। তারা যদিও ওর কলিগ, ওদের কোম্পানির ক্যালিফোর্নিয়া অফিসের চিফ ইঞ্জিনিয়ার। ঠিক যেমনটা প্রতীক কোলকাতা অফিসের। কিন্তু আজকের মেইলটা কোন প্রব্লেম সলভের রিকোয়েস্ট বা কোন নতুন আইডিয়া নিয়ে নয়। সম্পূর্ণ ব্যক্তিগত। তারা আর প্রতীকের কি প্রেম চলছে? না, তা কেন হবে? প্রতীক বিবাহিত, তৃষার সাথে ছয় বছরের সুখী দাম্পত্য আর অনেক সাধ্যসাধনা করে পাওয়া দাম্পত্যের ফল দুই বছরের ফুটফুটে মেয়ে আনিশাকে নিয়ে দিব্যি আছে ও। তারা ওর কলিগ কাম বন্ধু অতিরিক্ত কিছু নয়। মাস তিনেকের একটা ট্রেনিং এর জন্য প্রতীক ক্যালিফোর্নিয়া গিয়েছিল। সেখানেই আলাপ, পরিচয়, বন্ধুত্ব। তবে আজকের মেইলটা নিয়ে প্রতীকের এত উৎকণ্ঠা কেন? দিন সাতেক হল ক্যালিফোর্নিয়া থেকে ফিরেছে। চাইলেই আরও মাস তিনেক অনায়াসে কাটিয়ে আসতে পারত, কিন্তু তৃষা আর আনিশাকে খুব মিস করছিল।

আজকেই তো তারার ডক্টর ম্যাক্লারেনের ক্লিনিকে যাওয়ার কথা ছিল... হ্যাঁ, আজ, এখানে টিউস ডে মর্নিং, ওখানে মান ডে নাইট। মান ডে আফটারনুনেই তো যাওয়ার কথা ছিল। কি হল? তারা কি কনসিভ করেছে? আজকেই কি সেটা জানা যাবে? ইনসেমিনাইজেশন ঠিকঠাক হয়েছে তো? তারা আসলে সিঙ্গল মাদার হতে চেয়েছে। তাই পূর্ব সংগ্রীহিত বীর্য কৃত্রিমভাবে তারার মধ্যে দিয়ে, ওর ডিম্বাণুকে নিষিক্ত করার নির্ধারিত দিন ছিল আজ। আজ ওর ডিম্বাণু নিঃসরণ বা ওভ্যুলেশন এর দিন। আগের তিনটে ঋতুচক্র লক্ষ্য করে জানা গেছে যে, প্রতি ঋতুর চৌদ্দতম দিনে ওর ডিম্বাণু নিঃসরণ হয়। নিঃসৃত ডিম্বাণু ৩৬ থেকে ৭২ ঘণ্টা অবধি নিষেক যোগ্য থাকে। আবার শুক্রাণু স্ত্রী দেহে ৪৮ ঘণ্টার বেশি বাঁচেনা। সব মিলিয়ে আজই ইনসেমিনাইজেশনের উপযুক্ত দিন। আজকের দিনে বীর্য গেলে নিষেকের সম্ভবনা সর্বাধিক। ডক্টর ম্যাক্লারেন এতে সিদ্ধহস্ত। তারা কনসিভ করবেই। তারার জন্য এই সন্তান খুব জরুরী। ওর স্বামী সিদ্ধার্থ দুর্ঘটনায় মারা গেছে, প্রায় দেড় বছর হতে চলল। তারা সিদ্ধার্থকে খুব ভালবাসত। দ্বিতীয় বিবাহ ও করবে না। মা-বাবা অনেক বুঝিয়েছেন, তাও নারাজ। তারারা অনেক দিন থেকেই আমেরিকায়। তারার জন্ম নিউ ইয়র্কে। বাবা,মা দুজনেই আমেরিকার নামী ইউনিভার্সিটিতে পড়াতেন। উনারা এখন নিউ ইয়র্কেই থাকেন। তারা উদারমনা হাসি খুশি মেয়ে। ভারতীয় সংস্কার এখনো ওর মধ্যে প্রবল। আরও প্রবল একটা ইচ্ছা। মা হওয়ার ইচ্ছা। তারা মনেপ্রানে মা হতে চায়। কিন্তু বিয়ে করবে না। অগত্যা এই পন্থা।

প্রতীক চায় তারা যেন মা হতে পারে। তারার সাথে মিশে ওর মা-বাবার সাথে কথা বলে প্রতীকের মনে ওদের পরিবারের জন্য আলাদা সম্ভ্রম সৃষ্টি হয়েছে। তারার এই সিদ্ধান্তে ওর মা-বাবাও শরিক। কত কম জটিলতা উনাদের মনে। এদেশে হলে... প্রতীকের মনে পড়ে সেইদিনগুলোর কথা। তৃষা কনসিভ করতে পারছিল না বলে পরিবারে, পাড়ায়, আত্মীয়স্বজনদের মধ্যে কত কানাঘুষোই না শুরু হয়েছিলো। তৃষা নাকি বাঁজা! এমন কথাও শুনতে হয়েছিলো। তৃষার জন্য খারাপ লাগত খুব। মনমরা হয়ে থাকত মেয়েটা। লুকিয়ে কাঁদত। প্রতীকও কি কষ্ট পেত না? সন্তান তো সবাই চায়। অথচ তৃষাকে নিজের কষ্ট দেখাতে পারত না। পাছে ও কষ্ট পায়! আনিশা যেদিন হল, সেদিন তৃষাকে যতটা খুশি দেখেছে, আর কখনো দেখেনি। নিজেও তো খুশিতে পাগলপারা হয়ে গিয়েছিলো। তারার একটি অবলম্বন দরকার। মা-বাবা আর কত দিন? মানুষের কাউকে চাই, যে কিনা একান্ত নিজের হবে।

অথচ সমস্যা ছিল অন্য খানে। ডক্টর ম্যাক্লারেনের দুটি শর্ত ছিল। শুক্রানু দাতাকে তারার সম-দেশীয়, সমধর্মীয় এমন কি সম জাতীয় হতে হবে। আর সেই শুক্রানু দাতার নিজের একটি সন্তান থাকতে হবে। এতে সন্তানের সাথে তারার সাদৃশ্য থাকার সম্ভবনা সর্বাধিক। ভবিষ্যতের অহেতুক জটিলতা এতে কম হবে। ডোনারের নিজের সন্তান থাকলে ইন সেমিনাইজেশনের ফেলিওরের সম্ভবনা কম। কিন্তু ডক্টর ম্যাক্লারেনের শুক্রানু ব্যাঙ্কে এমন কোন দাতার শুক্রানু নেই। তারাও ভারতীয়,হিন্দু, বাঙালি এবং সন্তানের পিতা এমন কাউকে খুঁজে পাচ্ছিল না, যাকে এই রিকোয়েস্ট করা যায়। প্রতীকের সাথে পরিচিত হয়ে ওর খোঁজার শেষ হয়ে ছিল। সংকোচের সাথেই প্রতীককে বলেছিল কথাটা। প্রতীকও তারার, তারার মা-বাবার মুখের দিকে তাকিয়ে না করতে পারেনি। অর্থের প্রলোভনে নয়, বন্ধুত্বের দাবিতেই রাজি হয়ে গিয়েছিল।আজ অফিসে আসার পথে একটা অপরাধবোধ কাজ করছিল। তৃষা আর আনিশার সাথে অন্যায় করেছে ও। কিন্তু তাতে কি? ওরা তো জানবেই না কখনো। তারাও কনসিভ করার পর আর যোগাযোগ রাখবে না বলেছে, যাতে প্রতীক দুর্বল না হয়ে পরে। প্রতীকও আর যোগাযোগ রাখবে না। তবুও কনসিভ করল কিনা জানতে মনটা উতলা হয়ে পড়েছে। বাপ রে বাপ! তৃষার কনসিভ করার সময় কি হ্যাপা! কত গাইনি দেখিয়ে, ওষুধ পত্তর খাইয়ে, শেষে তৃষার ডাক্তার বন্ধু কুণাল কেসটা হাতে নিলে, ওর সিনিয়ারকে দেখিয়ে তবেই...তারাও না কোন হ্যাপায় পড়ে। যদিও গোটা তিনেক সিমেন স্পেসিমেন দিয়ে এসেছে প্রতীক...

মেইলটা চেক করল প্রতীক। ছোট মেইল... “ প্রতীক ইওর সিমেন ইজ azoosparmic.মিনস দেয়ার আর নো স্পারম ইন ইট। বাট হাউ ইট ক্যান বি?

হাউএভার আই অ্যাম অ্যাটাচিং ডক্টরস রিপোর্ট উইথ ইট। ” মাথাটা ঘুরে গেল প্রতীকের। রিপোর্টটা ওপেন করল। প্রতীক সেনেরই রিপোর্ট। থার্টি ফোর। মেল। সিমেন হ্যাজ নো স্পারম!!!!! তৃষা, আনিশার মুখ দুটো ফ্ল্যাশ করল প্রতীকের মাথায়...। আর একটা মুখ কার? গোলমাল হয়ে যাচ্ছে। বরাবর অঙ্কে একশোয় একশো পাওয়া প্রতীক এই অঙ্কটার সমাধানে শূন্যই পয়াবে, বলা যায়।








সোমবার, ২০ মে, ২০১৩

ছোটগল্প - অমলেন্দু চন্দ

(মায়াবাড়ি) - অ্যাক্সিডেন্ট
অমলেন্দু চন্দ



সেই থেকে বুচু থম মেরে বসে আছে। কিছুক্ষন আগেই মুঠোফোন বেজেছিল - অনেক খোঁজ বীন করে শেষ মেশ ওই টিউনটাই রিং টোন করেছিল ওর জন্য - তোমাকে চাই। পুরনো সোফাটা অসীম মমতায় ওকে ডুবিয়ে নিচ্ছিল নিজের নরম গভীরে। ঘুন পোকাটাও কি একটা টের পেয়ে থম মেরে ছিল, নিজের কাজ ভুলে। নৈশব্দ এত ভারী হয় কেন! বাতাস নড়ে না বলে?

বুচুর ভাল নাম নিলুফার। ডাক নাম টা বাবার কল্যানে সেঁটে গেছে, ছোটবেলায় আদর করে ডাকতেন বুচকি মনি, আমার বুচকাটা, বুচু বুচু এইসব বলে। স্কুলে ঢুকবার সময় খেয়াল থাকে নি লোয়ার ইনফ্যান্ট এ শুরু হয়ে ক্লাস ওয়ান টু থ্রী - বাবাই আসত ছুটির পর নিয়ে যেতে, নিজের কাজের মধ্যে এটাকে রিলিজিয়াস প্রায়রিটী দিতেন, তো নামটাও বন্ধুদের গোচরে এসে গেলে, তারপর বড় ক্লাস,নাম আর পেছন ছাড়ে নি, আর একদিন বড় বুচুও জেনে গেছিল যে বাবার দেওয়া ডাকনামটা ওকে ব্যাতিব্যস্ত করে না আর ওর বন্ধুদের কাছে।

সেই বন্ধুদের মধ্যে বেনিয়মের ফেরে নিয়ম করেই একদিন সদাশিবন এসে গেল। দুরন্ত, হাসি খুসি, ঠান্ডা মাথা কিছুতে চটে না, অগাধ স্পিরিট আর চট জলদি কথা বলা - নিলুফার একটুতেই বেশ ইম্প্রেসড হয়ে গেল। ক্যান্টিনে নিলুফার তিন চার জনের সঙ্গে বসে ছিল, ছেলেটিকে সেদিনি ক্লাসে দেখেছে, থারড ইয়ার, ক্রপ করা চুল, এদিক ওদিক সপ্রতিভ ভাবে চেয়ে চেয়ে দেখছিল। কাছে এসে বলল আমি সদাশিবন, আজকেই আমার প্রথম কলেজ এখানে, আপনারা আমায় সদা বলে ডাকতে পারেন। বলে সপ্রতিভ ভাবে একটা চেয়ার টেনে বসেছিল।

সেদিন আর আজকে - এরমধ্যে অনেক দিন চলে গেছে। মনে পড়ল একদিন ওরা দুজন এক শনিবার নামখানা ডায়মন্ড হারবারের দিকে চলে গেছিল, ওরা ওরকম চলে যেত এদিক ওদিক, সাধারনত সেদিনি ফিরে আসত, তো সেদিন এল বিরাট ঝড়। দারুন বৃষ্টি, আর হাওয়ার দমক, মাথার ওপরে রাস্তার ধারের গাছগুলো যেন বেঁকে চুরে বাসের ছাদ ছুঁয়ে টোকা মেরে জানান দিয়ে সোজা হচ্ছিল আবার অন্যদিকে ঝুঁকবে বলে, এরি মধ্যে লম্বা একটা ডাল ভেঙে দমাস করে বাসের ছাদে। বুচু তখন ফোঁপাতে আরম্ভ করেছে - শিব এ অবস্থায় - আমাদের কি হবে। ফিরব কি করে। তুই একদিন এমনি করেই মরবি আর আমাকেও মারবি। ঝড়ের কথা তো শুনেছিলি - তাও বেরুলি... সে অবস্থাতেও সদাশিবন সেই ঠাণ্ডা রসিকতা - ভ্রু পল্লবে ডাক দিলে ঝড় ওই ইশানের কোনে, আরে ভাবই না আমরা হলাম নোয়া'র মানব আর মানবী সবাই, পপুলেসান বেড়েছে তাই সঙ্খ্যা অনেক, আর এটা সেই ২০১২ র নৌকাটা।

আর তাঁর পরেই ধুম ধুম ধরাম, বাসটা একদিকে কাত, রাস্তায় গর্ত দুম করে সেই জল ঢাকা গর্তে চাকা পড়েছে। আতঙ্কে চিৎকার টা সবাই কোরাসে মন্দ ছাড়ে নি আর ডেসিবেল বোধহয় আকাশের কানেও বেজেছিল, কারন একটু পরেই বৃষ্টি থেমেছিল। ততক্ষনে ওরা বাস থেকে নেমে রাস্তার পাশে এদিক ওদিক মাথার ওপর কিছু না নিয়ে দাঁড়িয়ে পড়েছিল, বিশেষ গাছ গুলোর থেকে দূরে, বজ্রাহত হবার সম্ভাবনা বাঁচিয়ে।

সবাই ব্যাস্ত হয়ে ঠেলেঠুলে বাসটার চাকা তুলল, বাতাসের গোঙানি কমে গেছিল, বাস চল্ল নামখানা, পৌঁছতে সময় লেগেছিল অনেক বেশী, ভাঙা ডাল পেরিয়ে সরিয়ে - ওরা উঠেছিল একটা লজে, ঝড় বাদলের মাতলামি সেরে বাতাস তখন ঠাণ্ডা, কিন্তু চিন্তায় বুচু'র মটকা গরম, আরও গরম সদা'র ঠাণ্ডা হাব ভাব দেখে। ফোন কাজ করছে না ঠিকমত, তারি মধ্যে বাবা কে ফোন করে সব বলেছিল তিন চার বারের চেষ্টায়। বাবা খালি বলেছিল সব শুনে - সদাকে ফোন টা দে। তারপর জিজ্ঞেস করেছিল - তোমার কাছে থাকার টাকা পয়েসা আছে তো, যেন আর কোন কিছু চিন্তা করার নেই। আসলে সদার অ্যাক্সেপ্ট্যান্স লেভেল টা এরকমিই ছিল সবার কাছে, সদা মানে ভরসা করার মত একটা চরিত্র। আর বাবা - লোকটাই অদ্ভুত। লিভ টুগেদারের এর নিয়মে বুচু এসেছিল, মা জন্মের কিছু পরেই - অ্যাক্সিডেন্ট, গাড়িটা দুমড়ে গেছিল ট্রাকের ধাক্কায়, ভদ্রলোক সেই থেকে আজীবন একটাই তত্ত্ব বজায় রাখবার চেষ্টা করেছেন, বুচু অ্যাক্সিডেন্ট নয়। মা বাবা দুইই হয়ে থেকেছেন মাইকেল তথাগত বিশ্বাস।

আর একবার ওরা একটা প্ল্যাঞ্চেটের আসরে গিয়েছিল। নজন ছিল সেখানে, নটা মোমবাতি জ্বলছিল একটা গোল টেবিলের ওপর, আর একটাই ঢাকা আলো যাতে ছায়া বেশী পড়েছে আলোর থেকে, গুগগুলের ভারি গন্ধ। ভারী পর্দা ঢাকা ঘরটায় এক অশরীরী ঘেরাটোপ, আচ্ছন্নতার মেজাজ ছিল। সে রাতে ফিরে আসার পথে নিলুফার অসম্ভব শক্ত করে সদার হাত টা ধরেছিল, চাপের বহর দেখে সদাও বুঝি একটু অবাক হয়েছিল। অথচ তুক তাক ঝাড়ফুঁক এ সবে ওর কোন বিশ্বাস কোনদিন ছিল না, এর পরেও যে হয়েছিল তা নয়, কিন্তু অভিজ্ঞতা টা নাড়িয়ে দিয়েছিল।

এরপর একদিন নিয়মের ফেরেই কর্পোরেট জীবন। টান টোন হাড়িকাঠ, যে বুচু সাধারনত সালোয়ার কামিজ আর জীনস উইদ টপ পড়ত সে অঙ্গে তুলল শাড়ি, নিবিবন্ধের নীচে টান হয়ে থাকা ঘুমন্ত লাইটহাউসের মত নাভির নিসর্গ শোভা, অফিসে আসার আগে মুখ দেখা আয়নায় নানান টিপের বাহার সাটিয়ে রাখা - শেষ প্রসাধন ওই টিপটা। টান করে বাধা চুলের কপালে জাদুচিহ্ন, যেন শাড়ি আর ওই চিহ্ন টিহ্ন দেখে সব এক্কেবারে চিত বা কাত সুবোধ হয়ে পড়বে আর ও কেল্লা ফতে করে বেরিয়ে যাবে। না সেসব কিছুর দিকে ওর ঝোঁক ছিল না, কারন সেই সদা। সদার বাতিস্তম্ভ ঘিরে ওর সমুদ্দুরের পাড় বাঁচিয়ে রাখা, যেন কেউ ধাক্কা না খায়, কিন্তু ও যে আছে সেটাও যেন ভুলে না যায়। ওর বস কি বুঝেছিল, তাই মাঝে মাঝে রেসকোর্সের ব্যাল্কনিতে দূর দেখার যন্তর চোখে ওকে হাত নাড়তে দেখা যেতে লাগলো, আর হিল্লি দিল্লি কনফারেন্স পাচ তারা সাত তারা হোটেলের কম্ফি সফি আরামে।

সদা সদাই, ওকে যেন কিছুতেই কব্জায় আনা যায় না। এই যেমন সেদিন সবে কফি তফি সেরে প্রডাক্ট অ্যাদ্ভান্টেজ বোঝানোর প্রয়াসে মাথার ওপর চশমা টা তুলে দিয়ে ও গুটি দশ দিশি সাহেবকে মন্ত্রমুগ্ধ করে এনেছে প্রায়, মুঠোফোন বাজল - তোমাকে চাই। একটু ক্ষমা চাওয়ার লিপ সিঙ্ক করে ফোন কানে - ওপাড়ে সদার গলা - তোকে এখন কেমন লাগছে রে? কোন শাড়ীটা পরেছিস - হাল্কা নীল সাদা আচল? শোন একটা নতুন গজল লিখেছি, সুর দেওয়ার চেষ্টা করছি - ইসসে পেহ্লে কি ইয়াদ তু আয়ে / মুঝকো ঠুকরায়ে মেরা দিল তোড়ে - ওর মুখের বিব্রত অবস্থা দেখে ওর বস এগিয়ে এসেছিল, ফোনটা নিয়ে গম্ভীর স্বরে বলেছিল সদা বজ্জাতি বন্ধ কর, কাজ করছে মেয়েটা - তো এই ছিল সদার গল্প, সবাইয়ের কাছে ছিল ওর অ্যাক্সেপ্টিবিলিটি, আর সেটার স্তর নেহাত ঠুনকো ছিল না, বিশেষ সদাশিবন সিনিওরের কাছে তো নয়ই, কর্পোরেট দুনিয়ার এক নিঃসন্তান হঞ্চো, যাকে বুচু বাপন বলে ডাকতো স্যার ছাড়া, প্রয়াত গ্রাম সম্পর্কের ভাই কাম বন্ধুর পিতৃহীন ছেলেটিকে হাড়ে হাড়ে চিনেছিলেন।

সেই হাড়গুলো বোধহয় গুঁড়িয়ে গেছিল। মাইকেল বিশ্বাস আর সদা দুজনেই গাড়িতে ছিল। প্রজেক্টের কাজে মাইকেল বিশ্বাস উত্তর বঙ্গের সফরে গেছিলেন। সদা ড্রাইভার। উল্টো দিক থেকে একটা গাড়ি হঠাৎ একটা শার্প ডব্লিউ বাঁকের মুখে - বাঁচাতে গিয়ে ল্যান্ডরোভার টা রাস্তার পাশের সিমেন্টের বার গুলো ভেঙে তিস্তার নুড়ি বেছানো জলহীন মাটিতে উল্টে গেছিল। মাইকেল আর সদা - দুজনেই... পুলিশ সদার ফোনের সবচাইতে বেশিবার বাজানো নম্বরটায় রিং করেছিল...তোমাকে চাই। সদা কি চেয়েছিল শেষ মুহূর্তে - আর মাইকেল বিশ্বাস - বুচু অ্যাক্সিডেন্ট নয় এটা তো সাব্যস্ত করেই ফেলেছিলেন, তাই কি অ্যাক্সিডেন্ট এতকাল নিশ্চুপে গুঁড়ি মেরে অপেক্ষায় ছিল, ভয়ঙ্কর বদলা নেবে বলে।

ফোনটা আবার বাজলো, অন্য রিং টোন, অভ্যেসে বুচু হাত বাড়াল। সিনিওর সদাশিবন - বুচু, মা - ভাঙা গলাটা এর বেশী কিছু বলতে পারে নি। বাপন... বুচুর অস্ফুট স্বর, শুধু ঘুন পোকাটাই শুনতে পেয়েছিল বোধহয়। বেনিয়মের যাবজ্জীবন কে ভাঙতে তাই বুঝি পোকাটা দারুন উল্লাসে মেতে উঠল বাতাস নাড়িয়ে।



ছোটগল্প - মৌ দাশগুপ্তা

আকাশ-কুসুম-কল্পনা
মৌ দাশগুপ্তা



আকাশরঞ্জন, কুসুমবিহারী আর কল্পনা, তিনজনে বড় ভাব। তিনজন সহপাঠী/ ও সহপাঠিনী। কল্পনারা বেশ বড়লোক। অতএব বাপের টাকার নিক্তিতে ওর রূপ মাপা যায়। আহা, কালী ঠাকুর-টাকুর অবধি নাই বা গেলাম, জনশ্রুতি যে, সে মহাভারতের দ্রৌপদীও তো কালোই ছিল বা ঐ চিতোরের রানী পদ্মিনী। কথাতে আছে না “কালো জগতের আলো”। আর নিন্দুকেরা চেহারাটা মোটাসোটা ,ট্যাবাটোবা বলে বটে তবে হিংসা করে। অবস্থাপন্ন ঘরের আদুরে মেয়ে, তার ঐ ইয়ে মানে সুখী সুখী গোলগাল ফিগার হবে না ?

কল্পনাকে নিয়ে আকাশ কবিতা লেখে, শুনে কল্পনা মুচকি হাসে। আকাশের মনের আকাশে রামধনু ওঠে। কুসুম ভুজিওয়ালার দোকান থেকে গাঁটের পয়সা খরচা করে হরেক কিসিমের আচার,মোরব্বা কিনে এনে কল্পনাকে দিয়ে বলে

- ‘মায়ের হাতের বানানো ‘।

কল্পনা টাগরায় আওয়াজ তুলে, আরামে খায়। কুসুম তাই স্বপ্ন দেখে।অর্থাৎ কিনা আকাশ-কুসুম কল্পনায় বুঁদ হয়ে থাকে। ফলে বন্ধুত্বে ভাঁটা পড়ে।

দুজনেই ভাবে, কে আগে কল্পনাকে মনের গোপনে লালিত ইচ্ছার কথাটা বলবে, কিভাবে বলবে

- ‘তোকে ভীষণ ভালোবাসি রে কল্পনা, দিব্যি করে বলছি । ‘

সেদিন ভ্যালেনটাইন্স ডে, পৃথিবীর তাবত প্রেমিককূলের ভালো বাসাবাসির দিন। ক্যালেন্ডারে শুভ মধুমাস। আকাশ-কুসুম-এর আগে কল্পনাই ওর কাঁধের ঢাউস ব্যাগটা থেকে দু’টো কার্ড বার করে এগিয়ে ধরে মুখে সলাজ হাসি মাখিয়ে বললো,

- ‘আগামী ২৭শে ফাল্গুন আমার বিয়ে, আসবি কিন্তু! ‘


মঙ্গলবার, ১৯ মার্চ, ২০১৩

ছোটগল্প - মৌ দাশগুপ্তা

রং বেরঙের গল্প
মৌ দাশগুপ্তা
“জীবন কি যে গতিময়, কত দ্রুত কেটে যায় সময়। এই তো সেদিনও ছিলাম ছোট্ট এক স্কুল পড়ুয়া । ফুটবল, ক্রিকেট খেলে,ঘুড়ি উড়িয়ে, লাট্টু লেত্তি আর মার্বেলের সম্ভার সামলে,পাড়ার মধ্যমনি বিবেকদাদার মত হবার অদম্য আগ্রহ বুকে পুষে,ছোট বোনটির সাথে অহেতুক খুনসুটিতে , অকারন ব্যস্ততা আর উচ্ছ্বাসে কেটে যেত আমার সেই ফেলে আসা দিনগুলো। জীবনের পরতে পরতে তখন বেঁচে থাকার সুগন্ধ। মুগ্ধ হয়ে দেখতাম সোনালী সকাল, ক্লান্ত বিকেলে, তারা ভরা মোহময়ী রাত। কত সহজ সরল ছিল দিন গুলো। বড় আপন লাগতো বাড়ীর লাগোয়া ঝিল পাড়ের কৃষ্ণচূড়া গাছটা, বন্ধুদের সাথে ঝগড়া হলে, মায়ের কাছে বকা খেলে, বোনের সাথে আড়ি হলে, সেই একা থাকার, মন খারাপের বিষণ্ণ মুহূর্তে আমায় সঙ্গ দিত সে। কত কথাই না বলতাম তার সাথে, কত আবেগঘন, একা থাকার মুহূর্তের সে সাক্ষী আমার। এখন বোধহয় বয়সের ভারে তার টানটান বাকল হারিয়েছে মসৃণতা, ফাটা ফাটা হয়ে খসে পড়েছে । ছোটবেলায় নেলকাটার ঘষে ঘষে নিজের নাম লিখে রেখেছিলাম। অনেকদিন অবধি লেখাটা ছিল। গাছটা আজ বয়সের ভারে জরাজীর্ন, তবুও প্রাণের টান বুঝিবা এখনও থোকাথোকা লাল ফুল দেয় প্রতি বসন্তে। সকাল বিকাল আজও বুঝি বা দামাল হাওয়া একই ভাবে লুটোপুটি খায় বুড়ো কৃষ্ণচূড়ার ডালে ডালে, পাতায় পাতায়।“
এতটা একটানা লিখে পেনটা বন্ধ করতেই হোল, পেনের রিফিল শেষ। নব্য লেখক দীপুর ব্যাগে অবশ্যি অন্য পেন আছে, কিন্তু লেখার খাতা থেকে চোখ তুলতেই মেয়েটার সাথে চোখাচোখি হয়ে গেল।অবাক কৌতুহলী দৃষ্টিতে এতক্ষন ও দীপুর দিকেই তাকিয়ে ছিল, দীপু চোখ তুলে তাকাতেই অন্যদিনের মতই একটু ঘুরে বসে মুগ্ধ দৃষ্টিতে গঙ্গার দিকে তাকিয়ে রইল।দীপু জানে, আর একবারও ও এদিকে তাকাবে না।মনে হয় দীপুর মত ওর ও বোধহয় পানিহাটির “বারো শিবমন্দির” ঘাটটা খুব পছন্দের।

আজ কিন্তু মেয়েটার দিকে তাকিয়ে সহজে চোখ ফেরাতে পারছে না দীপু।আজ দোল। সকালে বোধহয় খুব রঙ মেখেছিল, তার গোলাপী আভা এখনও মোছেনি কপালের,গালের ওপর থেকে।চুলে এখনও তেলের ছোঁওয়া পড়েনি বোধহয়।আলতো হাতখোঁপার বাঁধন এড়িয়ে চুলের গুছিগুলো হাওয়ার ডাকে সাড়া দিয়ে আপনমনে খেলছে,নাচছে। আহামরি সুন্দরী নয়,তবু শালীনতা মেশানো একটা আলগা শ্রী মেয়েটাকে অন্যরকম আকর্ষনীয় করে তুলেছে।দীপুর তরুন হৃদয় তার মনের সবটুকু ভালোলাগা দিয়ে মুহূর্তটাকে ধরে রাখতে চাইছে।ঐ বাসন্তী হলুদ ছাপা শাড়ী,ঐ গালে হাত দিয়ে আনমনে বসে থাকা,ঐ অস্তগামী সূর্য্যের আলোকে সারা গায়ে মেখে উজ্জ্বল হয়ে ওঠা,সব আজ দীপুর চোখে অসম্ভব সুন্দর লাগছে।

নীল দীপুর ছোটবেলার বন্ধু, একপাড়াতেই বড় হওয়া, স্কুল থেকে কলেজে যাওয়া, পরে নীলের বাবার কাজের সূ্ত্রে সোদপুরে বদলী হয়ে আসলেও প্রযুক্তি বিজ্ঞানের বদাণ্যতায় যোগাযোগে ভাঁটা পড়েনি। কতটুকুই বা দূর। ওড়িশার রাউরকেলা আর পশ্চিমবঙ্গের সোদপুর-পানিহাটি। নীলের খুব ছোটবেলাতেই মা মারা যাবার কারণে,আর বাবার বদলীর চাকরী হওয়াতে ওরা দুই ভাই বোন নীরা আর নীল ওদের ঠাকুরদার কাছেই বড় হয়েছে। রুদ্রদাদু দীপুরও খুব আপনজন,নীরাদিদি তো এখনও ভাইফোঁটায় দীপু আসবে না বললে কেঁদে ভাসায়।এই নীরাদিদির বিয়ে উপলক্ষ্যেই গত সাতদিন ধরে দীপু সোদপুরে এসে রয়েছে।বাড়ীতে মেলা আত্মীয় স্বজনের ভীড়। সবাইকে চেনে না দীপু। তাই বিকালের দিকে নীল ঘরের ডামাডোলে বেশী ব্যস্ত থাকে বলে ও একাই পায়ে হেঁটে চলে আসে গঙ্গাতীরে। সূর্য্যাস্তের পরে উঠে যায়। সাতদিন ধরেই মেয়েটাকে দেখছে ও।বিকালের দিকে আরেকটি বেশ সুন্দরী, আধুনিক পোষাকে সজ্জিতা মেয়ের সাথে এই মেয়েটি আসে, দুজন সমবয়সী।তাই বোন নয়, বান্ধবী হওয়াই স্বাভাবিক। এই দ্বিতীয় মেয়েটি বোধহয় এখন চুটিয়ে প্রেম করছে পাড়ার কোন উঠতি হিরো সাথে। রোজ বিকালে ভালোমানুষ বান্ধবীটিকে সাথে করে গঙ্গার হাওয়া খাবার নাম করে আসে, এসেই হিরোর হিরো হন্ডাটিতে সওয়ার হয়ে ঘুরতে বেড়িয়ে যায়,যতক্ষন না সে ফেরত আসে ততক্ষন বেচারী এই মেয়েটি একা একা ঘাটের পাশে বসে একমনে নদীর দিকে তাকিয়ে থাকে।

হঠাৎই ভালোলাগায় ছন্দপতন। হিরোর বাইকটা বীভৎস যান্ত্রিক আওয়াজ তুলে মেয়েটার পাশে এসে থামলো।মৃদু হাসিমুখে উঠে দাঁড়ালো ও। হিরো এবং তার বান্ধবীটিকে আর চেনা যাচ্ছেনা, এত বিভিন্ন রঙের আবীর ছড়ানো রয়েছে ওদের দেহের সর্বত্র। হিরো বাইক পার্ক করে নামলেন,একটু ঝুঁকে বান্ধবীর কানে কিছু বললেন। কাঁচভাঙ্গা আওয়াজের হিল্লোল তুলে গড়িয়ে পড়ল সঙ্গধারী রঙীন সঙ্গ সাজা সুন্দরী। হিরোসুলভ বীরত্বে হিরো এবার দু’হাতে আবীর নিয়ে অশ্লীলভাবে জড়িয়ে ধরে আগের মেয়েটিকে রঙ মাখিয়ে দিল।মেয়েটির ছটফটনি
দেখে বোঝা গেল ওর আপত্তি আছে। ছিটকে সরে যেতে গেলেও আঁচলটা মুঠো পাকিয়ে ধরে নিলেন হিরো।দোলের দিন, আর বোঝাই যাচ্ছে ওরা একে অপরের পরিচিত।তবু নিজের অজান্তেই উঠে দাঁড়য়ে ওদের দিকে এগিয়ে গেল দীপু। ইতিমধ্যে অন্য মেয়েটিও গতি সুবিধার নয় দেখে প্রেমিক প্রবরের হাত চেপে ধরলো।গোটা ঘটনাটাই ভীষণ অল্প সময়ের মধ্যে এবং তাৎক্ষনিকভাবে ঘটে যাওয়াতে হিরোর হাতের মুঠো আলগা হয়ে গেল এবং মেয়েটিও টাল সামলাতে না পেরে দু তিন কদম এগিয়ে দীপুর গায়ে ধাক্কা খেয়ে দাঁড়িয়ে গেল। তারপরেই চকিতে তাকাল দীপুর দিকে,কান্নার ফোঁটা গড়িয়ে পড়ল আবীর রাঙানো গাল বেয়ে,অন্য কেউ দেখার আগে চট করে আঁচলে মুছে নিয়ে সরে দাড়ালো। ওদিকে দীপুকে আপদমস্তক দেখে নিয়ে বান্ধবীর সাথে কিছু একটা কথা বলে বাইকটা ঘোরালো হিরো, কিন্তু বান্ধবীটি কথা না শোনার ভান করে প্রথম মেয়েটিকে এসে জড়িয়ে ধরল।ওরই আঁচল দিয়ে যতটা পারে রঙীন আবীর ঝেড়ে ফেলে দিলো, অল্প হাসলো দীপুর দিকে তাকিয়ে, তারপর দু’জনে পা বাড়ালো বাড়ীর দিকে।পড়ন্ত বিকেল,কেমন যেন মায়া জোড়ানো রোদ শরীর ছুঁয়ে দিচ্ছিলো।অদ্ভুত এক অচেনা আলো।কোথায় যেন দীপু শুনেছিল এমন আলোকে নাকি কনে দেখা আলো বলে।সেই কনে দেখা আলোর অরুনাভা মনে লুকিয়ে রেখে দীপু দুটি মায়বী চোখের বাঁধনে বাঁধা পড়ে একা দাঁড়িয়ে রইলো বোকার মত।

সন্ধ্যেবেলায় বাড়ী ফিরেই রুদ্রদাদুর সাথে নিমন্ত্রনপত্রের গোছা হাতে করে দীপু বেরোলো পাড়ায় ঘুরে ঘরে বিয়ের নিমন্ত্রন সারতে।নীল ওর বাবার সাথে গেছে দুরের আত্মীয়দের পাট মিটাতে।নীলরা থাকে ‘দিশা’ বলে একটা ছয়তলা হাউসিং অ্যাপার্টমেন্টে। ওদের পাড়ায় এই রকম ছোটবড় একাধিক অ্যাপার্টমেন্টও যেমন আছে, তেমনি নিজস্ব একতলা দোতলা বা তিনতলা বাড়ীও আছে। নীলদের বাড়ীর ঠিক উল্টোদিকে যে নতুন বিল্ডিংটা উঠেছে, তার তিনতলায় দরজা নক করতেই যে দরজা খুলে এক ঝলক অতিথিদের দিকে তাকিয়েই খোলা পাল্লার আড়ালে সরে দাঁড়ালো, তাকে দেখেই আনন্দে দম বন্ধ হয়ে আসলো দীপুর। এই তো
সেই অনামিকা।এবাড়ী সেবাড়ী ঘুরে কাজ শেষ করে বাড়ী ফিরে নীলের কাছে বাকি সুলুক সন্ধান পেয়ে গেল দীপু।

নীলদের বাড়ীর ঠিক উল্টোদিকের নতুন বিল্ডিংটার তিনতলায় থাকেন অবনীবাবু, প্রথম মেয়েটি ওনার ভাগ্নী, নাম ইন্দ্রানী ।মা বাবা নাকি খুব ছোটবেলাতেই মারা গেছে। মামা মামীর ঘরেই মানুষ।দু’বোনে খুব ভাব।ইন্দ্রানী আবার নীলদের কলেজেই পড়ে।নীল ফাইনাল ইয়ার আর ইন্দ্রানী মানে এই মেয়েটি সবে ফার্স্ট ইয়ার। অবনীবাবুর একটিই মেয়ে, কঙ্কনা ।সে আবার নীলের ক্লাসমেট।সে এখন চুটিয়ে প্রেম করছে পাড়ার উঠতি হিরো স্যান্ডির সাথে।পাড়ার সবাই জানে।তবে কিনা প্রেম পাড়ার সবাইকে দেখিয়ে করলেও বাড়ীতে লুকাতে হয়, তাই বোধহয় রোজ বিকালে পিসতুতো বোনটিকে সাথে করে গঙ্গার হাওয়া খাবার নাম করে আসে, এসেই স্যান্ডির হিরো হন্ডাটিতে সওয়ার হয়ে ঘুরতে বেড়িয়ে যায়,যতক্ষন না দিদিটি ফেরত আসে ততক্ষন বেচারী ইন্দ্রানী একা একা ঘাটের পাশে বসে একমনে নদীর দিকে তাকিয়ে থাকে।গতকয়েক মাস এক রুটিন চলছে।সেদিনের পর আর গঙ্গার ঘাটে দেখা হয়নি দুজনের।গঙ্গার ঘাটে আর আসেনি ইন্দ্রানীরা,এক্কেবারে দেখা হয়েছিল নীরাদিদির বিয়ের দিন। ম্যাজেন্টা রঙের সিল্কশাড়ীতে অসম্ভব সুন্দর লাগছিল মেয়েটা। দীপুর নজর আর সরছিল না। প্রজাপতির মত এদিক ওদিক ঘুরতে ফিরতে যতবারই দুজনের চোখাচোখি হয়েছ ততবারই একটা মিষ্টি প্রশ্রয়ের হাসি হেসে টুক করে সরে গেছে মেয়েটা।নীল তার মুখচোরা লাজুক বন্ধুটিকে ওস্কালেও মুখ ফুটে কোন কথা বলা হয়ে ওঠেনি দীপুর।আর বিয়ের পরদিনই রাউরকলার রিং রোডে দীপুর বাবার আচমকা অ্যাক্সিডেন্টটা দীপুকে কিছু বলার সুযোগও দেয়নি।আর দেখা হয়নি দুজনের। তবে দীপুর মন থেকে সেদিনের ভালোলাগাটুকু সময়ের সাথে হারিয়েও যায়নি।

তারপরে গঙ্গার বুক বেয়ে অনেক জল বয়ে গেছে, অনেকগুলো দিনরাত পার করে এসে সেদিনের দীপু আজ গল্পলেখার নেশাটা হারিয়ে ফেললেও ডায়েরী লেখার বদভ্যাসটা কিন্তু ছাড়তে পারেনি।বিয়ে করাটা আর হয়ে ওঠেনি দীপুর। বাড়ীর সবাইকে নিয়ে দাদার মেয়ের বার্ষিক পরীক্ষার পরে বেড়াতে এসেছে নীলের বাড়ী।এখান থেকে দুই পরিবারের লোক মিলে ঘুরতে যাবে শিমলা কুলু মানালী।আজ রুদ্রদাদু নেই,নেই দীপুর বাবা-মাও। নীলের বাবা অবশ্য অবসর নিয়ে এখনেই আছেন। নীরাদিদি দুই ছেলে আর বরের সাথে কানাডায়।নীলের বৌ আঁখি আবার দীপুর বৌদি পাখির পিসতুতো বোন। তাই আসার আগ্রহটা ওর দাদা বৌদিরই বেশী। সেদিনও দোলপূর্ণিমা। শুভদিন দেখে রং খেলা শুরু হবার আগেই সাতসক্কালে বাড়ীর সকলে পূজো দিতে দক্ষিণেশ্বর মন্দিরে গেলেও দীপু একা চলে এসেছে বারো মন্দিরের ঘাট। কত লোকের ভীড়,কথা,কত মুখ,কত হাঁটার ভঙ্গী,কত চাউনী, কত কথকতা।দুচোখ ভরে খালি দেখে যাওয়া,দেখা তো নয়, যেন চোখ দিয়ে গোগ্রাসে খাওয়া।ডায়েরী লেখার জন্য হাতটা নিসপিশ করে ওঠে।হঠাৎ চোখে পড়ে খনিকটা দূরে ঘাটের সিঁড়িতে বসা এক সাদা শাড়ী পড়া মাঝবয়সী মহিলা এত লোকের ভীড়েও কেমন সবার থেকে আলাদা হয়ে আনমনে গালে হাত দিয়ে একদৃষ্টিতে গঙ্গার দিকে তাকিয়ে আছেন। দৃশ্যটায় নতুনত্ব কিছু নেই।হঠাৎই খোল করতাল নিয়ে হোলির গান গইতে গাইতে বহুরূপী কৃষ্ণকে মধ্যমনি করে ,খোলা রাস্তায়, পথচলতি লোকের গায়ে, দুরন্ত বাতাসে আবীর ছড়িয়ে, ফুটকলাই ফেণীবাতসা দিয়ে মিষ্টিমুখ করাতে করাতে, একদল লোক পাশের রাস্তা ধরে বোধহয় শিরোমনি মশাই প্রতিষ্ঠিত রাধা কৃষ্ণের মন্দিরে দোলৎসবে গেল। আওয়াজে আকৃষ্ট হয়ে সাদা থান পড়া মহিলাও ঘাড় ঘুরিয়ে তাকালেন।চোখাচোখি হল দীপুর
সাথে।অচেনার ভঙ্গীতে লহমা মাত্র দীপুকে দেখে মহিলা চোখ সরিয়ে নিয়েও হঠাৎ ছিলে ছেঁড়া ধনুকের মত চমকে উঠে ভালো করে তাকালেন দীপুর দিকে,হাতে ধরা ডায়েরীটার ওপর দিয়ে দৃষ্টিটা আবার চোখে এসেই থামল।দীপুর অবাক চোখের দৃষ্টি অনুসরন করে নিজের দিকে একপলক তাকিয়েই উঠে দাঁড়লেন। সাদাথান কাপড়টা ঘোমটার মত তুলে মুখটা আড়াল করে ত্বড়িতপায়ে লোকের ভীড়ে যেন বেমালুম মিশে গেলেন।

অজান্তেই অনেকক্ষন আটকে রাখা শ্বাসবায়ূটা দীর্ঘশ্বাস হয়ে বেরিয়ে এল।দীপুর কলম লিখে নিল ওর মনের অব্যক্ত কথাগুলো।
“প্রথম দেখাতেই মনে রঙ ধরিয়েছিলে ফাগের দিনের রঙীন বেশে , গোধূলীবেলায়, তবু মুখ ফুটে কিছু বলতে পারিনি।আজ আবার সেই আবীরমাখা দিনের শুরুতে সামনে এলে দুধসাদা রঙে সেজে, অমল আলোয় উদ্ভাসিত হয়ে, আজও আমার মনের কথা অব্যক্তই রয়ে গেল।“

বুধবার, ২০ ফেব্রুয়ারি, ২০১৩

ছোটগল্প - উদয়ন রায়

শুধু যখন বৃষ্টি হবে
উদয়ন রায়


এটা শুধুই একটা পুকুরের গল্প। বা তাও নয়। এটা একটা মেয়ের গল্প, তার একলা জানালার চৌখুপির গল্প। বা তাও নয়। এটা একটা জীবনের গল্প, একদিনের-প্রতিদিনের। না তাও ঠিক হল না। কিছু অকিঞ্চিৎকর মানুষের গল্প, হয়তো।

কলকাতার কাছাকাছি, আগাছায় ভরা রেললাইন, স্টেশনের প্ল্যাটফর্ম, মরচেধরা লেবেল ক্রশিং, লেবেল ক্রশিং-এর ধারের চা-দোকানের ঝুপরি, বন্ধহওয়া কাঁচ'কলের জংধরা গেট, খোলা নর্দমার ডাঁশ মশার পন্‌পন, ঘাসওঠা কাদাজল মাখা উঠোন-আক্‌তি খোলা জায়গা, যার নাম 'নেতাজী ময়দান', সেখানে ডিসেম্বরের ধোঁয়াশা ভরা সন্ধ্যায় ম্যারাপ খাটিয়ে, নিয়নের আলোয় হয় অষ্টপ্রহর হরিনাম সংকীর্তন, এখানেই হয়তো তাদের দিনগত আহার-নিদ্রা-সঙ্গম। বোজা পুকুরে, ঘেঁষ আর শুরকি ফেলা জমিতে, বা পুকুরের ধার ঘেঁষে উঁচু জমিতে তাদের কোঠা বাড়ি, টালিরচালের বাড়ি দখলের জমিতে, অথবা পয়সাওয়ালা বড় চাকুরে বা ব্যবসাদার-এর সাদা-হলুদ-লাল রং এর বেমানান অট্টালিকা।



পুকুরটা সেই জীবনের সাক্ষি গোপাল। পুকুরটা বড়। দৈর্ঘ্য-প্রস্থ নিয়ে প্রায় দেড়খানা ফুটবল মাঠের সমান। পুকুরটা আর তার আশেপাশের পাড়ার নাম সেনবাগান। কে জানে কেন এরকম নাম, কবেই বা হয়েছিলো এরকম ? পুকুরটার পূবদিকে বন্ধ হয়ে যাওয়া কাঁচ'কলের দেওয়াল। দেওয়ালে গায়ে নোনাধরা ইঁট আর বটগাছের চারা। উত্তরদিকে পুকুরের ধার ঘেঁষে এট্টুখানি চওড়া রাস্তা, দুনম্বর রেলগেট থেকে চলে গেছে বিটি রোড। এই রাস্তার দুধারে ড্রেন, মাশার চাষ হয় সেখানে। ড্রেনের ওপর বাঁশের পাটাতন পাতা পান-বিড়ি সিগারেট আর রেডিও-ঘড়ি-প্রেসারকুকার সারাই-এর দোকান। ঘিঞ্জি রাস্তায় মাঝে মাঝে যায়-আসে ক্যান্টনমেন্ট রুটের প্রাইভেট বাস। সরু রাস্তায় মুষকো বাসকে রাস্তা দিতে, পথচারীদের নেমে যেতে হয় প্রায় নর্দমায়। বাস চলে ২কিমি গতিতে। সেটা যত বেশী না ভীড় বাঁচাতে, তার চেয়ে-ও বেশী প্যাসেঞ্জারের আশায়। পুকুরের দক্ষিণ পশ্চিম পাড় এখানে-ওখানে সিমেন্ট করা। ভাঙ্গাচোরা সিঁড়ি নেমে গেছে জলে। পুকুরের ধার দিয়ে বারোফুটিয়া রাস্তা। খোয়া ঢালা। পিচ হয় নিয়ম করে, তবে ছয়মাসের বেশী অবশিষ্ট থাকেনা। রিক্সা চলে সেখানে, আর দুটো টিউওয়েল। রাস্তার ধারে ধারে নতুন পুরোনো পাকাবাড়ী। একতলা বা দোতলা বা তিনতলা। রাস্তার দিকে সস্তা গ্রিলের গেট।



পুকুরের দক্ষিন পারে তিনতলা বাড়ীর দোতালায় ভাড়া থাকে সুমনা আর তার বর। সুমনা-র বিয়ে হয়েছে ভালবেসে। বরটা তার সওদাগরি কোম্পানীর কারখানায় সামান্য উঁচুদরের চাকুরে। সূক্ষ্মদরে বিচার করলে অবশ্য কেরানীর বেশী কিছু নয়। তার ভাবখানা যেন কেউকেটা মতন। তার আপিসের ভাগ্য যেন লেখা আছে তার-ই হাতের মুঠোয়। তাই সেই 'একশো বারো' টাকা মাইনেতে দিবারাত্র আপিসের গোলামি খেটে যায় সে। পুর্বরাগ পর্বে ইডেনে বা বালিগঞ্জলেকের ঘন অন্ধকার মাখা বেঞ্চে বসে, পুলিশের চোখ এড়িয়ে সুমনার নরম-ভেজাভেজা ঠোঁটে চুমু দিতে দিতে সে বলেছিলো অফুরান সময় একসাথে কাটানোর কথা। সেকথা সে ভুলে গেছে কবেই । বা ভোলে-ও নি হয়তো। অপিসের গোলামি আর সুমনার জন্য সময় কাটাকুটি হয়ে যাচ্ছে বারবার। সুমনা বসে থাকে জানালায়। পুকুরের ধারে একটা কদমগাছ রাস্তা পেড়িয়ে ঝুঁকে এসেছে জানলার গ্রিলে। জানালার নীচে পুকুরের ধারে টিউওয়েল। লুঙ্গি আর ময়লা সার্ট পরা 'ভারী' টিনের বাঁকে করে জল নেয় টিউওয়েল থেকে। পুকুরের জলে বাসনধোয় ঠিকে কাজের লোকেরা। গুমোট দুপুরে কাপড় কাচে ঘাটের ভাঙা সিমেন্টের চাঙড়ে। বর্ষায় পুকুর প্রায় উপচে ওঠে জল। ঘাটের সিঁড়ি চলে যায় জলের তলায়। জলের ধারে মুখ বাড়িয়ে থাকে হেলে সাপ। বাসনধোয়া এঁটোকাঁটার আশায়। পাশের বাড়ীর প্রৌঢ় নন্দীবাবু-র ছেড়ে রাখা লুঙ্গি-তে লুকিয়ে থাকে হেলে সাপ, নন্দীবাবু তখন বুকজলে দাঁড়িয়ে নিমের দাঁতন করছিলেন। তারপর নন্দীবাবুর ভ্যাবাচ্যাকা মুখ আর লুঙ্গি ঝাড়ার বিচিত্র কায়দায়, হেসেকুটোপাটি হয় সুমনা, জানালা থেকে। রান্নাঘরে বাসনের ঠুংঠাং ,কাজের মাসিএল বোধহয়, একা কোথায় আর ? গরমের গুমোট দুপুরে, রেললাইনের ধারের বস্তির ছেলেপিলেরা ঝুপুস ডুবে থাকে জলে। জলের ধারের অশ্বত্থ গাছের ডাল থেকে ঝপাং লাফায় জলছিটিয়ে। কালোকুলো রোগারোগা, নেংটি পরা ছেলেদের হিহিহাসি আর মুখখিস্তির ফুর্তি শুনতে শুনতে সুমনার একা একা লাগেনা আর। বিকেলের দিকে, আকাশ ঘন করে ঝড় আসে। ঝড়ের তোড়ে ধুলো ওড়ে, ব্‌ষ্টি আসে ঝাঁপিয়ে, ধুলো আর ব্‌ষ্টিতে ঝাপসা হয়ে যায় পুকুরের পাড়। ব্‌ষ্টি থামলে সন্ধ্যা নামে ঝিঁঝি-ঁর ডাকে। ভেজাভেজা বাল্ব জ্বলে কাঁচ'কলের গায়। সুমনার কান খাড়া শোনে রিক্সার ক্যাঁচকোঁচ। বর আসবে এখুনি । অপেক্ষায় অপেক্ষায় সন্ধ্যা গড়িয়ে রাত হয়। হ্যাঁ বর আসে, নিশুতি রাতে, পাড়া যখন ঘুমিয়ে পড়েছে। কাজের শেষে, অপিশ উদ্ধার করে। তারপর, রাতের খওয়ার শেষে, বিছানায় আবেশে, শরীরে শরীরে ঘনিষ্ঠ হতে হতে, সুমনা ভাবে, রবিবারের আর কত দেরি ?



কাজলদা। নন্দীবাড়িতে আশ্রিত। রোগাসোগা মধ্যবয়সী বেকার। বি এ পাশদিয়ে মাড়োয়ারি গদিতে খাতা লেখা থেকে বে-আইনি ওষুধের সেলসম্যানগিরি সব কাজেই অভিজ্ঞ। তবে আসলে অলস প্রক্‌তির। উপস্থিত কিছুই করেন না। একার জীবন চালাতেই হিম্‌সিম। প্রৌঢ় নন্দীবাবু, সম্পর্কে ওর গ্রামতুতো মামা হন। উঠোনে ইঁটের গাথনি আর দর্মার ছাদ দিয়ে ঘর বানিয়ে কাজলদা-কে থাকতে দিয়েছেন। এর বেশী কিছু নয়। ভাত জোটে মাঝেমধ্যে। কিন্তু কাজলদার শুধু ভাতে চলেনা, সিগারেটের নেশা, তরলের-ও। বিলিতি-র পয়সা নেই তাই চোলাই। মেয়েমানুষের ইচ্ছা-ও আছে, পয়সা নেই। তাই এর-ওর মাথায় হাত বোলানো। মানে জকমারা। বন্ধুর-বন্ধুর-বন্ধুর সোদপুরের বাড়িতে, ইলেকট্রিসিটি বিল জমা দেওয়ার নামে, টাকা নিয়ে উধাও হয়ে যাওয়া। আরো কোনো এক অল্প পরিচিতের ছাদের পাখা সারাই করার নামে, লোহার দরে বেচে দিয়ে আসা। এরকম করেই চলে কাজলদার আজ-কাল-পরশু। বি এ পাশের গুমো্র আছে অবশ্য বারোয়ানা। চোলাইয়ের ঠেকে রিক্সাচালক হরি-মধু আর রংএর মিস্ত্রি গুলে দের মনুষ্য প্রজাতির মনে করেন না । নীলগলাবন্ধনির খাটিয়ে কাজের লোকেদের ঘামের গন্ধে সরগরম চোলাইয়ের ঠেকে বিমর্ষ বসে থাকেন কাজলদা। ভাবেন শ্রেনী বৈষম্য। অনেক রাতে, বেসামাল পায়ে বসেন পুকুরের ধারের সিঁড়িতে। ঘোলা হয়ে ওঠা মগজের ঠেলায় হেঁড়ে গলায় গান ধরেন, 'কেন যামিনী না যেতে, জাগালে না'। সুমনা রাত জাগা চোখে শোনে। সুমনা জানে কাজলদার দর্মার ছাদের ঘরে, একটা পুরোনো এস্রাজ আছে। নন্দীবাড়ীর বউ তাকে বলেছে। কালেভদ্রে সেটা বাজান কাজলদা। বাজনার হাতটা তার মিষ্টি।



স্বপন ডাক্তার। বছর পঁয়তাল্লিশের, এম বি বি এস। পাড়ার ডাক্তার। বাবু নন, শুধু-ই ডাক্তার, সর্দি-কাশি-পাতলাপায়খানা-অম্বলের। পুকুরের পশ্চিম পাড়ে তাঁর পৈত্‌ক বাড়ি-কাম-ডিস্পেনসারি। ই এস আই প্রেস্কিপশন লেখা তাঁর প্রধান কাজ। ছুটির দরখাস্ত আর ফিট সার্টিফিকেটে দস্তখত করা তাঁর অন্য প্রধান কাজ। বেওয়ারিস সারমেয়-এর দৌলতে, জলাতঙ্কের ওষুধের ব্যবসা-ও করছেন আজকাল। সকালের ডিস্পেনসারি শেষ করে, গামছা পড়ে, তেলের শিশি আর লাইফবয় সাবানের কৌটো হাতে পুকুরে যান স্নানে। পাতলা হয়ে যাওয়া কোঁকড়া চুলে, ঘষে ঘষে মাখেন প্যারাসুট নারকেল তেল। নাতিদীর্ঘ শরীরে আর ভুঁড়িতে লাইফ বয় সাবান। তিন চারটে ডুব দিয়ে বাড়ী ফিরে পোনামাছের ঝোল। সন্ধ্যায় আবার সেই তেঁতুলকাঠের ডিস্পেন্সারির টেবিল। রাতে যৌবন উত্তীর্ন বউ-এর সঙ্গে ভাগাভাগি বিছানা। রাত-বিরেতে মাঝেসাঝে কল আসে এবাড়ি সেবাড়ি থেকে। বর্ষায় ম্যালেরিয়া আর টাইফয়েড বাড়লে। সেদিন সুমনার সারাদিন-ই মাথা ঝিম্‌ঝিম। ওর বর ফেরে সেই নিশুতি রাতে। সুমনা তখন শরীরের অসোয়াস্তিতে বিছানায়। ব্যস্তসমস্ত ওর বর ডেকে আনে স্বপন ডাক্তারকে। সুমনার চোখের তলা আর নাড়ী দেখে, দুচারটে পরীক্ষার কথা বলে ফিরে যান ডাক্তার। বাড়ী ঢোকার আগে পুকুরের সিঁড়িতে ঝুম বসে থাকেন কিছুক্ষন। সুমনা সন্তানসম্ভবা। কিছুদিন পর ওদের দোতালার গ্রিলে ঝুলবে ছোট্ট ছোট্ট ব্যবহার্য্য। তাঁর নিজের বাড়ীর গ্রিলটা কতদিন খালি আছে, খালি-ই থাকবে।



ঝর্নাদি। একটু গলিতে ঢুকে, তিনইঞ্চি ইঁটের গাথনির দুঘরের বাড়ী ঝর্নাদির। বাড়ীটা হয়েছে দুবছর। ইঁটের দেওয়ালে পলেস্তারা নেই। মেঝেতে ইঁট পাতা। নীচু জমি বলে, বর্ষায় জল হয় বাড়ীর চারপাশে। তখন রাস্তা থেকে বাঁশের সাঁকোতে ঢুকতে হয় বাড়ীতে। জানালা বসানো হয়নি এখোনো। শীতে ত্রিপল দিয়ে ঢেকে রাখতে হয় উত্তরের হাওয়া। ঘরের ভেতরে ইঁটদিয়ে উঁচুকরা পুরোনো খাট, খাটটা, ঝর্নাদির ভেঙ্গে যাওয়া বিয়ের উত্তরাধিকার। রংওঠা স্টীলের আলমারি, এটাও সেই বিয়ের, যৌতুকি। কাঠের কুলুঙ্গিতে, শনি-অন্নপুর্না-লক্ষী-কালী-র ফটো। শেষহয়ে যাওয়া দেশলাই-এর বাক্সে গোঁজা পুড়েযাওয়া ধুপকাঠি, ছাই, শুকনো জবা ফুলের মালা দুচারটে। ঘরের ভেতর আড়াআড়ি টানানো, নাইলনের দড়িতে, গাম্‌ছা, শাড়ি, ব্লাউজ, সায়া, ছেলেমেয়ের স্কুলের জামা-প্যান্ট-স্কার্ট-ইজের, অনেকবার কাচায় রংওঠা। মাটিতে একটা জলচৌকিতে ছেঁড়াছেঁড়া মলাটের বই খাতা। জলে ভেজা পেনের কালিতে গোটা গোটা করে লেখা 'শুভদীপ রায়-চতুর্থ শ্রেনী-ক' বা 'শর্মিষ্ঠা রায়-পঞ্চম শ্রেনী-ক'। ঝর্নাদি একা। একটা-একটা ছেলে মেয়ে। তারা দশ-এগারো বছর। স্কুলে যায়। ঝর্নাদি পেডলার। পন্য তার, রান্নার গ্যাসের ওভেন পরিস্কার করার আজব সল্যিউশন। মিউরিয়াটিক অ্যাসিড আর অন্যান্য ক্ষারজাতীয় কেমিক্যাল্‌স মিশিয়ে তৈরী হয়। প্লাস্টিকের বোতলে ভরা হয়, লেবেল-ও লাগান হয় আজগুবি। তারপর, ঝর্নাদির মতো পেডলারদের ব্যাগে ভরে পাঠানো হয় গ্রামেগঞ্জে বিক্রির জন্য। আর গ্যাস ওভেনের পাইপ আর নামী গ্যাস কোম্পানীর নকল বার্নার। ঝর্নাদিদের কাছে থাকে নামী গ্যাস কোম্পানীর ভুয়ো পরিচয়পত্র। হাড়ভাঙ্গা খাটুনি সারাদিন। ভারীব্যাগ কাঁধে নিয়ে মাইলের পর মাইল হাঁটা গ্রামের পথে। অনর্গল কথায় মানুষের বিশ্বাস অর্জন করা। সারাদিনের কাজের শেষে কমিশন মেলে বিক্রিবাটার। ছেলেমেয়েদের স্কুলের খরচ জুটেযায় এইভাবে। প্রতিদিন সন্ধ্যারাতে, সারাদিনের খাটুনির শেষে, বাড়ী ফিরে পুকুরে গা ধুতে যায় ঝর্নাদি। সুমনা দেখে জানালা থেকে। ঝর্নাদি-কে দেখে ইর্ষা হয় তার। এবারে তাকে চাকরি খুঁজতে হবে। বাড়ীর কাছেই 'অরবিন্দ বিদ্যাপীঠ'। বিটি পাশ-তো করা-ই আছে।



ছোটগল্প - পূজা মৈত্র

অন্তর-জাল
পূজা মৈত্র

আজ সকাল থেকেই মনে মনে একটু উত্তেজনা বোধ করছিলো অনুশা।রণদীপের সাথে আজ বিকালে ডেট আছে।সাউথ সিটি মলে,বিকাল চারটেয়। মাস তিনেকের ফেসবুক বন্ধুত্ব রিকোয়েস্ট অ্যাকসেপশন, ক্যাজুয়াল হাই, হ্যালো, লাইক, কমেন্ট, চ্যাটের ধাপ পেরিয়ে এখন ভালোলাগায় এসে ঠেকেছে। রণদীপ সফটওয়্যার ইঞ্জিনিয়ার, বড় এম.এন.সি তে আছে, সেক্টর ফাইভে চাকরি করে। অনুশা ক্লাস টুয়েলভ,সায়েন্স।ইঞ্জিনিয়ার ছেলের উপর ওর ঝোঁক বেশি, কারণ এরা সহজে বিদেশে যায় আর মাইনেটাও মন্দ পায়না। রণদীপের প্রোফাইলের এই স্ট্যাটাসটাই অনুশাকে যেচে কথা বলতে বাধ্য করেছিলো।তার উপর দেখতেও খারাপ নয়। টল,ফেয়ার, হ্যান্ডসাম।বাসে করে সাউথ সিটি মলের দিকে যেতে যেতে অনুশা ভাবছিল, রণদীপের প্রপোজালটা আজকেই অ্যাকসেপট করে নেবে।ইনবক্সে পরশুদিনই ফর্মালই প্রপোজ করেছে রণদীপ।অনুশাই দেখা করতে চেয়েছে। হ্যাঁ তো বলবেই, একটু দাম বাড়ানো আর কি! বাড়ি ফিরেই রিলেশনশিপ স্ট্যাটাসটা চেঞ্জ করতে হবে।‘ইন আ রিলেশন উইথ রণদীপ বন্দ্যোপাধ্যায়’!!! সৃজা, প্রতীক্ষা, সুকন্যাদের চোখ টেরিয়ে যাবে।


চলমান সিঁড়ি দিয়ে থার্ড ফ্লোরে উঠল অনুশা। ফুড কোর্টে থাকবে বলেছে রণ দীপ। সবুজ চেক শার্ট, ডেনিম জিনস...ঐ তো! অনুশার দিকে পিছন করে বসে আছে। চুলটা ঠিক করলো অনুশা। কেমন দেখাচ্ছে ওকে কে জানে? রণদীপের ভাললাগবে তো ? এমনিতে অনুশা বেশ সুন্দরী। ছিপছিপে চেহারা, লম্বাটে গড়ন, একমাথা কোঁকড়ানো চুল। সবথেকে সুন্দর ওর চোখ দুটো। মায়ায় ভরা। পাখির নীড়ের মতো উপমাটা ওর চোখ দেখেই কবি লিখেছিলেন বোধহয়। গায়ের রং একটু চাপা, তবে আজকাল এই রঙটাই ইন।অনুশা নিজের সৌন্দর্য সম্পর্কে সচেতন।চাপা গর্বও আছে, এই জন্য। আজ অনুশা কুর্তি পরবে ভেবেছিলো, রণদীপের কথাতেই টিশার্ট পরেছে।ওয়েস্টার্ন ড্রেস রণদীপ লাইক করে।


_ “ হাই----- ” অনুশা কাছে গিয়ে বলল। ছেলেটা ঘুরে তাকাতেই প্রচণ্ড ভাবে চমকে উঠল অনুশা। মুখ থেকে অজান্তেই বেরিয়ে এল


_ “ তুই!!”


রূপক হাসল – “ আমি। আর কে হবে? ”


রূপক ওদের ক্লাসমেট। পড়াশুনায় পিছনের দিকে। আর্টস নিয়ে পড়ে। অসংখ্যবার অনুশাকে প্রপোজ করেছে।অনুশা- ও অসংখ্যবার ভদ্র,অভদ্র দুইভাবেই রিফিউজ করেছে। রূপক খুব হ্যান্ডসাম। ক্লাসের মেয়েরা বলে ও অনুশাকে সত্যি ভালোবাসে। বাসুক---- আর্টস? ইয়াক! হোপলেস।


_ “ তুই এখানে কি করছিস? ” অনুশা রেগে আগুন!


_ “ তোর জন্য ওয়েট করছি। ” ব্যাঙ্গের হাসি হাসল রূপক।


_ “ আমি তোর সাথে দেখা করতে আসিনি। ”


_ “ জানি, রণদীপ বন্দ্যোপাধ্যায়ের সাথে দেখা করতে এসেছিস। সফটওয়্যার ইঞ্জিনিয়ার। সেক্টর ফাইভে আছে। মিস রায়চৌধুরী ওটা রূপক চক্রবর্তীর ফেক প্রোফাইল। ঐ নামে কেউ নেই। ”


_ “ মানে? ইয়ার্কি করছিস নাকি? ”


রূপক উঠে দাঁড়াল- “ না তো। এই দ্যাখ না, আমি-ই তোর সাথে দিনের পর দিন চ্যাট করেছি অন্য নামে। অথচ তুই বুঝিসই নি। এই তুই সায়েন্স পড়িস? এই তোর ইন্টেলিজেন্স !! ”


অনুশার চোখে জল চলে এসেছিল। শয়তান ছেলেটা এভাবে ঠকাল ওকে? আর ও নিজে এত বড় গাধা!


-“ অনুশা, ভালোবাসায় সায়েন্স, আর্টস, ইঞ্জিনিয়ার, বেকার---- ট্যাগগুলো ম্যাটার করে না। মনটা ম্যাটার করে। রণদীপ হয়ে এই অধমই কিন্তু তোর মনটাকে ছুঁয়ে গেছে, একটু হলেও। পাবলিক প্লেস----কাঁদিস না---বস---কফি বলি?”


অনুশার বিস্ময় সীমা ছাড়াল। ছেলেটা কি? ওকে এত বড় অপমান করে হেসে কফি খেতে বলছে! চড় মারতে ইচ্ছা করছে এখন ওর----অথচ---


কফি শেষ করে বাড়ি ফিরল অনুশা। কেমিস্ট্রি টিউশনটা কামাই করেছে। মাকে বলেছে শরীর ভালো নেই। নিজের ঘরে শুয়ে অভ্যাসবশতই ফেসবুকটা খুলল। এ কি! রণদীপ বন্দ্যোপাধ্যায় তো ওর ফ্রেন্ড লিস্টেই আর নেই। তার জায়গায় একটা নতুন নাম জুড়েছে। রূপক চক্রবর্তী। ইনবক্সে মেসেজ ও এসেছে একটা, “ বাড়ি ফিরলে জানাস। ”


ব্লক করবে ভাবল অনুশা। হাতটা আটকে গেল। রিপ্লাই বাটনে ক্লিক হয়ে গিয়ে উত্তর পৌঁছে গেল না চাওয়া গন্তব্যে, “ ফিরেছি।তুই? ”


শনিবার, ১৯ জানুয়ারি, ২০১৩

ছোটগল্প - শঙ্খ ভৌমিক






রবিন হুড ও রায়া


ছেলেটা প্রায় রোজই আসতো এই শহরতলির পার্কেবয়স বড়জোড় সাত-আট বছর হবে বৈশিষ্ঠহীন চেহারা আলাদা করে চোখে পড়ার কথা নয় হঠা দেখলে  মনে হবে, ছেলেটা একা- অভিভাবকহীনউদ্দেশ্যহীনভাবে পার্কের আনাচে কানাচে ঘুরে বেড়াতো নিজের মনে কথা বলতো, কখনও একটা ফিকে হাসি লেগে থাকতো ওর ঠোঁটেকখনো ঘাসের ওপর বসে খুব মন দিয়ে ঘাসফুলদের সঙ্গে গল্প করতো অথবা  ঘাসফরিঙদের খেলা দেখে খুব মন দিয়ে কিছু ভাবতোকতবার শুয়োপোকা, পিঁপড়ে, মাকড়সা ওর গা বেয়ে চরম আনন্দে ঘুরে বেড়িয়েছে; আর ছেলেটাও নিশ্চিন্তে ওদের খেলার সাথী হয়েছে আবার কোন কোন একলা বিকেল ভরে উঠতো কুয়াশা ভরা ঝিলে নুড়ি পাথরের ঝুপ ঝুপ খেলায় 

পার্কে  দোলনা, ঢেঁকি, স্লিপ, হ্যাঙ্গিংবার, বেসবল ডায়েমন্ড বা আর পাঁচটা বিনোদনের সরঞ্জামের অভাব ছিল না রঙ্গিন বাচ্চারা দঙ্গল বেঁধে আসতো; তাদের হাসি, ঠাট্টা,  খুনসুটিতে ভরে উঠতো পার্কওরা খেলতো এক সময় চলেও যেত ছেলেটা কোনদিনও কারোর সঙ্গে খেলার চেষ্টা করে নি কেউ ওকে খেলার দলে যেচে নেয়ওনি প্রতিনিয়ত এই পারস্পরিক অবজ্ঞা দেখে মনে হবে একে ওপরের অস্তিত্ব সম্বন্ধে হয়ত ওয়াকিবহল নয় কদাচি ছেলেটা স্লিপ বা দোলনা চড়ার জন্য ইতস্তত পায়ে গিয়ে দাঁড়াতো ভিড় থাকলে বেশিরভাগ দিনই ওর সুযোগ আসতো না আস্তে আস্তে চলে যেত রাগ, অভিমান বা দুঃখের কোন প্রতিফলন ওর মুখে পাওয়া যেত না কোনদিনও পরিচিত কেউ হাত নেড়ে কথা বললে ছেলেটা এক-দুটো অন্যমনস্ক উত্তর দিয়ে আবার নিজের খেলায় ফিরে যেত ওর ভাবলেশহীন অভিব্যক্তি দেখে মনে হত যেন ওর একটা অন্য জগ আছে


রায়া 'ইনকিউবেটরের' জানলায় বসে পার্কের দিকে সতৃষ্ণ দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকতো  ওর পার্কে যাওয়া বারণ ছিল কারণ ওর এক কঠিন অসুখ হয়েছিলকি অসুখ কেউ জানত না, কিন্তু ডাক্তাররা পরিস্কার জানিয়ে দিয়েছিল যে আজকের পৃথিবীর বায়ু যতটা দূষিত, তা পরিশোধন করার ক্ষমতা রায়ার ফুসফুসের নেই এই দূষণ শুধু বিষাক্ত রাসায়নিক প্রক্রিয়ার জন্য নয়; শহরকেন্দ্রিক অসম মানব বিকাশের ফলে পালটে যাওয়া বিকৃত পৃথিবীতে গাছেরা রক্তক্ষরণ করছে বড্ড বেশী- সেই হাহাকার বাতাসে মিশে যাচ্ছে প্রতিনিয়ত এই বাতাসে নিশ্বাস নিলে রায়ার কষ্ট হতপরিশুদ্ধ বায়ুর খোঁজে রায়ার পরিবার শহর ছেড়ে শহরতলিতে এসেছিলতাও রায়া সুস্থ হয়নি ডাক্তাররা বলেছিল আরো দূরে যেতে- সভ্যতা থেকে অনেক দূরে যেখানে প্রকৃতি উন্মুক্ত- গাছপালারা খুশি বাতাসে বিষ নেই   কিন্তু বাবা-মায়ের চাকরি আর ব্যক্তিগয় 'লাইফস্টাইল' আছে- তাই রায়া শহরতলির বাড়ির 'ইনকিউবেটর'-এ বন্দী হয়ে পৃথিবী দেখে 

যেহেতু বাড়ি থেকে প্রায় বেরোতেই পারতো না, রায়া ওর ইনকিউবেটরের জানলা দিয়ে এক অসীম পৃথিবী সৃষ্টি করেছিল সেই পৃথিবীর বনে-জঙ্গলে নতুন উদ্ভিদের  জন্ম হচ্ছে যা সালোকসংশ্লেসের মাধ্যমে প্রতিনিয়ত ফুসফুস প্রতিষেধক হাওয়া ছাড়ছে রায়া আরো দেখতো যে মানুষ একদিন গান করবে আবার সেই গানের অনুরণনে বাতাস নেচে উঠবে; সেই বাতাসে নিশ্বাস নিলে সবাই সুস্থ হয়ে যাবে এই বাতাস  সকালের পার্কে সবাইকে ছুঁয়ে যাবে- বদলে যাবে সূর্যের আলো; সেই আলো মানুষের ভেতর অবধি পৌঁছে যাবে- আর মানুষ উদ্দেশ্যহীন গতিপথ ছেড়ে ফিরে আসবে ঋজু কক্ষপথে
ছেলেটার নাম মনে মনে 'রবিন হুড' দিয়েছিল রায়াকারণ, একটু ঠান্ডা পড়লেই একটা কালচে-লাল 'হুডি' পড়ে ছেলেটা আসতো পার্কে রায়া ওর বাড়ির জানলা দিয়ে রবিন হুডকে প্রায়ই পার্কে খেলতে দেখতো ওর একাকী জীবন এক গোপন অপরাধবোধ ও উত্তেজনা নিয়ে অনুসরণ করতো রায়া রবিন হুডের এই অদৃশ্য  পৃথিবী আস্বাদন করার জন্য রায়া উন্মুখ হয়ে জানলায় এসে বসতো ওর দৃঢ় বিশ্বাস হয়েছিল এক গোপন পৃথিবীর চাবিকাঠি আছে ছেলেটার কাছে এক দৃষ্টে যখন রায়া তাকিয়ে থাকতো ছেলেটার দিকে, ওর কেন যেন মনে হত যে ছেলেটা কয়েক মহূর্তের জন্য অদৃশ্য হয়ে যেত- রায়া তখন প্রাণপণে খুঁজতো ছেলেটাকে ওর মন এক গভীর উদ্বেগে ভরে উঠতো মনে হত এক ছুটে চারপাশের বাঁধন ভেঙ্গে ছুটে যায় পার্কে  অথবা স্পাইডারম্যানের মতন জানলা বেয়ে নেমে যাবে পাগলের মতন যখন এইসব ভাবতো রায়া, অবলীলায় আবার রবিন হুড আবির্ভূত হত যেন কিছুই হয়নি রায়া একটা গোপন দীর্ঘশ্বাস ফেলতো- আবার রবিন হুডকে মনে মনে শাসন করতো

শরতের পাতা ঝরতে শুরু করেছে সূর্যের রঙ বদলাতে থাকে এইরকম এক ঝিঙাফুল সাঁঝে রায়া বাড়ি ছেড়ে একদিন পার্কে আসার অনুমতি পেল অনেকদিন বাদে বাইরের স্বাদ মনের সুখে মিটিয়ে নিতে নিতে রায়া এসে বসল পার্কে ওর পরিচিত বেঞ্চিতে ওর সামনে উন্মুক্ত মাঠে একা শুয়ে রবিন হুড মন দিয়ে আকাশের দিকে তাকিয়ে আছে হাতে কোন জংলি ফুল কখনো ফুলের পাঁপড়ি দিয়ে চোখ ঢেকে আকাশ দেখা- কখনো হাতের আঙুলগুলো পাকিয়ে দূরবিন করে আকাশ দেখা- কত রকম ভাবে  আকাশ দেখা রায়া রবিন হুডকে খানিক্ষণ দেখলো ওর এই খেলায় ভারি মজা পাচ্ছিল  পরন্ত বেলা তখন রঙিন গাছের পাতার ফাঁক দিয়ে তির্যক আলো ফেলেছে রায়ার মনে হল রবিন হুডের পাশে শুলে আকাশটা আরো পরিস্কার দেখা যাবেতাই ঝপ করে ওর পাশে গিয়ে শুয়ে পড়ে মন দিয়ে আকাশ দেখতে লাগলো কিছুক্ষণ পড়ে যখন পক্ষীরাজ ঘোড়া, সুপারম্যান বা জাস্টিন বিবার কেউই আকাশ থেকে নামলো না রায়া বিরক্ত হয়ে একটা ড্যান্ডিলায়ন তুলে চিবোতে লাগলো তারপর রবিন হুডের দিকে তাকাল জিজ্ঞাসু দৃষ্টিতে ওমনি রবিন হুড ঘাসের ওপর গড়িয়ে গড়িয়ে চলে গেল দূরে- দূরে- এক ঢালু বেয়ে গড়াতে গড়াতে এক জঙ্গুলে খাদের মধ্যে অদৃশ্য হয়ে গেল রায়ার এক ভয়-মিশ্রিত রাগ হল- খানিকটা অভিমানও  দ্রুত এগিয়ে আসা অন্ধকার ও শ্বাসকষ্টের মধ্যে আর সাহস করে রবিন হুডকে খুঁজতে যেতে পারলো না  বেশ উকন্ঠা নিয়ে বাড়ি ফিরলো রাতের নিয়ন পার্কে একলা বেঞ্চে, দোলনায়, কৃষ্ণপক্ষের আলোয় ম্রিয়মান ঝিলে কোথাও খুঁজে পেল না রবিন হুডকে অনেক রাত অবধি ইনকিউবেটরের জানলা দিয়ে নির্জন পার্কের দিকে তাকিয়ে থাকল

এরপর রবিন হুডের সঙ্গে রায়ার প্রায়ই দেখা হত পার্কে রায়া নিজের পরিচয় দিয়েছিল কিন্তু রবিন হুড কিছু বলে নি নিজের পরিচয় দেয় নি  মাথায় হুডি পড়ে নিজের মনে খেলতো রায়ার অস্তিত্ব প্রায় স্বীকারই করতো না  একদিন রায়া একটা প্রজাপতি ধরার চেষ্টা করলো- কিছুতেই পারছিল না হঠা রবিন হুড কোথা থেকে এসে একটা সুন্দর রঙিন প্রজাপতি দিয়ে গেল রায়াকে রায়াকে থ্যাঙ্ক ইউ বলার সুযোগ না দিয়েই আবার হারিয়ে গেল এইভাবে ওদের মধ্যে এক অদ্ভুত নতুন সখ্যতা গড়ে উঠলো

এক ছুটির সকালে শূন্য পার্কে রায়া একা দোলনা চড়ছিল অনেক উঁচুতে দোল খেয়ে উঠতে পারছিল রায়া এক মুহুর্তের জন্য রায়ার মনে হচ্ছিল ও আকাশে ভাসমান সেখান থেকে বাকি পৃথিবীটা খুব দেখতে ইচ্ছা করছিল রায়ার ওর জানলা দিয়ে দেখা একঘেঁয়ে পৃথিবীর থেকে অনেক আলাদা এই জগ এইসব অন্যমনস্ক ভাবনার মধ্যে হঠা রায়া দেখলো অল্প দূরত্বে রবিন হুড দাড়িঁয়ে আছে আর এক দৃষ্টে ওর দিকে চেয়ে আছে রায়া কি করবে ভেবে না পেয়ে আস্তে আস্তে দোলনা থামিয়ে নেমে এল খানিকটা সঙ্কোচের সঙ্গে রায়া এগিয়ে গেল রবিন হুডের দিকে কাছে আসতেই রায়া দেখলো রবিন হুড  তাকিয়ে আছে ওর দোলনার দিকে; পেছন ঘুরে দেখলো তখনও অল্প অল্প দুলছে ওই দোলনা- যেন অশরীরি কেউ বসে আছে ওখানে আর রবিন হুড ওকে দেখতে পাচ্ছে এক ঝলক ভয় রায়ার শিড়দারা বেয়ে নেমে গেল তবুও সাহস সঞ্চয় করে ও রবিন হুডকে জিজ্ঞাসা করল, " তুমি দোলনা চড়তে চাও?" প্রশ্নটা শুনে এই প্রথম রবিন হুড রায়ার দিকে তাকালো তারপর অস্ফুটে বলল , "উড়বি"? রায়া প্রথমে বুঝতে পারে নি কথাটা জিজ্ঞাসু চোখে তাকাতে ছেলেটা ডানার মতন দু-হাত নেড়ে বলল," উড়তে চাস্‌ তো আয়" বলে উত্তরের অপেক্ষা না করেই বিস্মিত রায়ার হাত ধরে টানতে টানতে জঙ্গলের দিকে নিয়ে গেল

রায়ার বুকের ভেতরে ধুকপুকুনি কিছুতেই বন্ধ হতে চায় না জীবনে প্রথম কেউ ওকে নিয়ে এইরকম গল্পের বই-এর রোমহর্ষক এডভেঞ্চরে ঢুকে যাচ্ছিলরায়ার কল্প জগতে এইরকম অনুভুতি কখনও হয় নি রবিন হুড একাগ্র মনে রায়াকে নিয়ে জঙ্গলে ঢুকে পড়ল বেশ অনেকটা বন্ধুর পাতাঝরা পথ পেরিয়ে এক খোলা জায়গায় এসে দাঁড়ালো ওরা হঠা ঘন জঙ্গলে এইরকম এক খোলা যায়গা দেখে রায়া আশ্চর্য হয়ে গেল এক সুন্দর মিষ্টি আলোয় ভরে উঠেছে চারিদিক কয়েকটা ইতস্তত ছড়ানো গাছের গুড়ি- এখানে ওখানে জংলি ফুল, উড়ছে প্রজাপতি ও মৌমাছি সবুজ ঘাসের ওপর অনায়াসে খেলে বেড়াচ্ছে কাঠবিড়ালি খোলা মাঠে পৌঁছে এক অপার্থিব শিস দিতেই অনেক পাখি উড়ে এসে বসল রবিন হুডের চারপাশে পাখিদের রঙের বাহার থেকে রামধনুর বিচ্ছুরণ হচ্ছে সেই রামধনু বেয়ে আস্তে আস্তে আকাশে উঠতে থাকলো রবিন হুড রায়া আশ্চর্য হয়ে দেখল যে ডানা মেলে উড়ে যাচ্ছে রবিন হুড আর ওকে ঘিরে রামধনু পাখিরা উড়ছে উড়তে উড়তে ওরা মিলিয়ে গেল মেঘের কোলে মূর্তির মতন স্থানু হয়ে রায়া দেখলো ওদের মিলিয়ে যেতে; ওর সঙ্গে বনের কাঠবিড়ালি, বনমুরগি, হরিণ- সবাই চুপ করে এই অভিনব দৃশ্য দেখলো

থমকে গিয়েছিল রায়া কতক্ষণ ওইভাবে ছিল মনে নেই; হঠা মুখ তুলে দেখলো  রবিন হুড ওর সামনে দাঁড়িয়ে আছে রায়ার বিস্ফারিত চোখ দেখেই হয়ত রবিন হুড ওর ছোট্ট হাত বাড়িয়ে দিল রায়া ইতস্তত করছে দেখে, ওর পাশে চুপ করে বসল রবিন হুড রায়ার চোখ দিয়ে তখন অকারণে জল পড়ছে ওর ফুঁপিয়ে ওঠা পিঠে আস্তে আস্তে হাত বুলিয়ে দিল রবিন হুড  বাড়ন্ত বেলায় ওর ছোট্ট আঙুলের স্পর্শ পার্ক ছেড়ে আকাশ, আকাশের গায়ে শরতের কাশফুল, কাশফুল ভেদ করে  সৌরমণ্ডল, সৌরমণ্ডল ছাড়িয়ে ছায়াপথের আরো লুকিয়ে থাকা পৃথিবীর সব ইনকিউবেটরে বন্দি রায়াদের ছুঁয়ে দিল

সেই ছোঁয়া লেগে রায়া উঠে দাঁড়ালো অপলকে পৃথিবীর সবচেয়ে হাল্কা মানুষ মনে হচ্ছিল নিজেকে রায়া রবিন হুডের হাত ধরে অনায়াসে আকাশলীনা হল আস্তে আস্তে ঝাউ, মেপল, ওক ছাড়িয়ে, পার্কের পরিচিত বাঁধা ডিঙিয়ে উড়তে লাগলো দূরে বাড়ির পরিচিত ছাদ, রাস্তা, ট্রাফিক আলো, তারপর... এক অনন্ত শ্বাসরুদ্ধ করা নিঃসংগতাওর হাত ধরে নেই কেউ রবিন হুড নেই রায়ার চিকার কেউ শুনতে পায় না রায়া আস্তে আস্তে ফিরে আসে প্রথমে পার্কে, তারপর বাড়িতে একদম একা রাত্রি গভীর করা একাকিত্ব
রবিন হুডকে রায়া আর দেখতে পায় নি বিহ্বল রায়া অনেক খুঁজেছে ওকে পার্কে, রাস্তায় হুডি পড়া ছেলের কথা জানতে চেয়েছে কেউই মনে করতে পারে নি ওইরকম বর্ণনার কোন ছেলেকে যারা অনেকদিন ওই পাড়ার বাসিন্দা তারাও ওই ছেলের খোঁজ দিতে পারলো না রায়া ক্রমশ অসুস্থ হয়ে পড়ল অগত্যা ওর মা-বাবা ওকে নিয়ে শহরতলি ছেড়ে আরো দূরে গ্রামের দিকে চলে যাওয়া স্থির করল যাওয়ার দিন রায়া গাড়িতে উঠে বসার ঠিক পরে ওর সেই গাড়ির জানলায় বসল এক ডাহুক পাখি সেই পাখিটা ওদের সঙ্গে চলল নতুন গন্তব্যস্থলে কখনো আকাশে, কখনো গাছের ডালে, আবার কখনো আবডালে, রায়া তার রবিন হুডকে আবার খুঁজে পেয়েছে