সৌকর্য গ্রুপের একমাত্র ওয়েবজিন।

About the Template

শনিবার, ১৯ জানুয়ারি, ২০১৩

প্রবন্ধ - শ্রীশুভ্র






এ কোন সকাল! এ কোন পরিবর্তন!


"যারা অন্ধ সবচেয়ে বেশি
আজ চোখে দেখে তারা;
যাদের হৃদয়ে কোনো প্রেম নেই-  প্রীতি নেই
-
করুণার আলোড়ণ নেই
পৃথিবী অচল আজ তাদের সুপরামর্শ ছাড়া!...."

অমোঘ সত্যের এই লাইনগুলোই বিদ্যু চমকের মত মুহূর্মুহূ
আঘাত করে মস্তিষ্কের কোষাগারে; যখনই রোজকার প্রভাতী সংবাদে চোখ পড়ে যায়!

কথা হচ্ছিল সম্পাদকের সাথে! এবারের সংখ্যায় লেখার বিষয়বস্তু নিয়ে! সম্পাদকের অনুরোধ বিষয় হোক এই সময়!

এই সময়ের কথা ভাবলেই মন্ত্রের মতো জীবনানন্দের এই লাইন কটি বিবস্ত্র করে দেয় আমাদের! সবচেয়ে দুঃখের কথা কোনো মতবাদই, কোনো তন্ত্রই তখন আর লজ্জা নিবারণ করতে পারে না! সত্যই তখন মনে হয় "অদ্ভুত আঁধার এক এসেছে এ পৃথিবীতে আজ"!

মানুষের সমাজ সভ্যতার মূল কেন্দ্রে জীবনানন্দ যে অন্ধকারকে শিকড় বিস্তার করতে দেখে গিয়েছিলেন আজ তা হয়ত সর্বগ্রাসী জাল বিস্তারে পরিব্যাপ্ত হয়েছে! সে আমাদের নিজেদের লজ্জা! প্রতিরোধে দৃঢ় সংকল্প ছিলাম না আমরা! বিভিন্ন মতাদর্শ নিয়ে বিতর্ক করেছি যত কোনো আদর্শের প্রতিই সততা ধরে রাখতে পারিনি তত! ফলে আদর্শের রাস্তা দিয়ে এগোনোর বদলে ক্রমেই কুরুক্ষেত্র করে তুলেছি নিজস্ব পরিসর! নিজের সাথে অন্যকেও দাঁড় করিয়ে দিয়েছি অন্ধকারের মধ্যেখানে! সান্ত্বনা দিয়েছি নিজেকে, ঘোর কলি বলে! তাই দায় এড়ানো হয়েছে সহজ! ক্রমেই বাসযোগ্যতা হারিয়েছে আমাদের পরিপার্শ্ব! ক্রমেই জমে ওঠা জঞ্জালের স্তুপে চাপা পড়েছে নতুন প্রজন্মের দিশা!

আমাদের দ্বিখণ্ডীত এই বাংলায় অদ্ভুত আঁধারের এই সংস্কৃতি নতুন নয়! এর ইতিহাস অতি সুপ্রাচীন! স্বয়ং শ্রীচৈতন্যকেও লড়তে হয়েছিল এই অন্ধকারের বিরুদ্ধে! তারপর গঙ্গা পদ্মা দিয়ে কত জল গড়িয়ে গেল! এখন আমরা আর লড়াইয়ের মধ্যে নেই! যে যার ফেস্টুনে মাঝে মধ্যে শুধু শ্যাডো প্র্যাকটিস করি একটু আধটু! বস্তুত স্বাধীনতার চোরাবালিতে ৪৭এর বাংলা ভাগের  সেই সন্ধ্যে থেকেই আমরা লড়াই ছেড়ে ফেস্টুন ধরেছি! ফেস্টুনের তলায় ঘর গুছিয়ে নিয়েছি! এটাই এখন বঙ্গসংস্কৃতির বর্ণপরিচয়!
আখের গোছানো দলবাজি রাজনীতির সহজপাঠে বাঙালি এখন সাবালক! শুধু তাই নয় এই বিষয়টাকে শিল্পের পর্যায়ে নিয়ে যেতে পেরেছি আমরা! তাই আজ রাজনীতি একটা ইন্ডাস্ট্রী!

গত ছয় দশকে এরাজ্যে দলীয় রাজনীতির নিয়ন্ত্রণে নিয়ন্ত্রিত জনজীবন! ফলে রাজনৈতিক পরিসরের বাইরে এরাজ্যে মুক্ত পরিবেশের অবসর প্রায় নেই বল্লেই চলে! আজকের সংস্কৃতি তাই "আমরা ওরা"র সংস্কৃতি! তার বাইরে তৃতীয় কোনো ভূবনের সংস্থান আজও গড়ে ওঠেনি! এরই মধ্যে আমাদের ব্যাক্তিস্বাধীনতার সংবর্ত!

সেই আমরা ওরার ঘূর্ণীপাকে আজ  আমাদের পরিবর্তনের গল্পগুলি ফেস্টুনে ব্যানারে ভোটের ইশতেহারে রাজনৈতিক পতাকার রঙে রঙিন স্বপ্নের ঢেউ ভাঙ্গে কেবলই!বস্তুত সেই গল্পের রসে মজে ভোটের লাইনের ভিড় যত বাড়ে ততই কারুর পৌষমাস তো কারুর সর্বনাশ! আজকের পশ্চিমবঙ্গের লড়াইটা তাই অন্ধকারের বিরুদ্ধে নয়! ক্ষমতার পক্ষে!
ওরা নয় আমরা! এটাই শেষ কথা!

এই "আমরাই থাকব"র দম্ভে চৌত্রিশ বছরের রাজত্বের পরিবর্তনে মানুষ আশা করেছিল তৃণমূল স্তর থেকে প্রশাসনের উর্দ্ধতম স্তরে দলীয় রাজনীতির প্রভাব থেকে রাজ্যকে মুক্ত করা যাবে! কিন্তু পরিবর্তনের দেড় বছরেই জনসাধারণের স্বপ্নভঙ্গ হওয়া শুরু হয়ে গিয়েছে! একটার পর একটা ঘটনা প্রমাণ করছে পরিবর্তন হয়েছে শুধুমাত্র দুইটি ক্ষেত্রেই! প্রথম পরিবর্তন শাসক দলের নাম ও দলীয় পতাকায়! এবং দ্বিতীয় পরিবর্তন; ভূতপূর্ব সরকারের আমলে দূর্নীতির বিকেন্দ্রীকরণ হয়েছিল সাংগঠনিক সুশৃঙ্খলার মধ্যে দিয়ে! বর্তমান প্রশাসনে সেটিই ঘটছে চুড়ান্ত বিশৃঙ্খলায়! আর পূর্বতন শাসক দল চলত কেন্দ্রীয় পরিচালন মণ্ডলীর নির্দেশে! বর্তমান দল এক ব্যাক্তির অধীন!

ক্ষমতার দখল ও রাজনৈতিক ক্ষমতায় ব্যাক্তিগত স্বার্থে অর্থনৈতিক ফয়দা তোলার এই রাজনৈতিক সংস্কৃতির ধারায় রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের একটাই অভিমুখ; পরস্পরের দোষারোপ করা! এর বাইরে জনগণের কাছে কোনোরকম রাজনৈতিক দায়বদ্ধতার সংস্কৃতি আজ আর অবশিষ্ট নেই! বর্তমানের এই পরিমণ্ডলে বুদ্ধিজীবীদের দুই শিবিরে বিভক্ত হয়ে এই পারস্পরিক দোষারোপের ধারায় জড়িয়ে পড়া এই বাংলার পক্ষে এক গভীরতম বিপর্যয়! এর ফল অনেক দীর্ঘস্থায়ী প্রভাব ফেলতে বাধ্য! আমরা অনেকেই হয়তো এই বিষয়টা নিয়ে এখনই তত চিন্তিত নই, যতটা নিশ্চিন্ত বুদ্ধিজীবীদের দীর্ঘ তিন দশকের নীরবতা ভেঙ্গে সরব হয়ে ওঠার বিষয়ে! ফলে নিরপেক্ষ দৃষ্টিকোণের প্রতিভাসটা আজ হারিয়ে যেতে বসেছে!

বুদ্ধিজীবীদের রাজনৈতিক শিবিরায়ন যে কোনো সমাজের পক্ষেই অশনি সংকেত! রাজনৈতিক দলগুলির অনৈতিক কর্মকাণ্ডের সাফাই গাওয়া, ব্যাক্তিগত খ্যাতিকে মুলধন করে জনগণকে বিশেষ বিশেষ রাজনৈতিক দলের সম্বন্ধে প্রলুব্ধ করা ও বিপক্ষ দল সম্বন্ধে বিভ্রান্ত করার মধ্যে দিয়ে সামাজিক অবক্ষয়ের ভিত্তিটাকেই পোক্ত করা হয়! এবং এর ফলে ক্রমেই জনমানসে বুদ্ধিজীবীদের বিশ্বাসযোগ্যতা হ্রাস পেতে থাকে! রাজনৈতিক দলগুলির মুখপাত্র হয়ে গিয়ে তারা আর সমাজকে কোনো রকম মৌলিক দিশা দেখাতে পারেন না! আর তখনই সামাজিক অগ্রগতি রুদ্ধ হয়ে গিয়ে সমাজ পারস্পরিক দোষারোপের কালিমা লেপনের অক্ষের চারপাশে ঘুরতে থাকে একই জায়গায় দাঁড়িয়ে! যার ফয়দা লুটতে থাকে অনেকেই!

এ এক অভিশপ্ত সময়! রাজনৈতিক মতাদর্শ নয়! রাজনৈতিক কর্মসূচীর স্বপক্ষে নৈতিক সমর্থনের তল্পিবাহনে যখন ব্যাস্ত বুদ্ধিজীবী মহল, স্বভাবতঃই তখন রাজনৈতিক দূর্বৃত্তায়ন
বিস্তার দ্রুততর হয়ে ওঠে! আর সেই সুযোগটাকেই জমি দখলের লড়াইয়ে কাজে লাগাতে তপর পরস্পর প্রতিপক্ষ দলগুলি!এমত অবস্থায় রাজনৈতিক অস্থিরতা খুন জখম দাঙ্গাবাজি বাড়তেই থাকবে! জনসাধারণের স্বাভাবিক জীবনযাপন প্রতিহত হতে থাকবে প্রতিনিয়ত, এই পরিস্থিতির কাছে! আর আমরা ওরার বিভাজন বাড়তে বাড়তে আইন শৃঙ্খলার অবনতি অবশ্যম্ভাবি! আজকের এই পরিস্থিতি নিশ্চয়ই একদিনে সৃষ্টি হয়নি! দীর্ঘ কয়েক দশকের রাজনৈতিক প্রক্রিয়ায় গড়ে উঠেছে এই সংস্কৃতি! শপথ ছিল তারই পরিবর্তনের!

যারা ভেবেছিলেন এই অবস্থার পরিবর্তন আনবে তাদের মূল্যবান ভোট, যারা বিশ্বাস করেছিলেন পরিবর্তনের শপথ নেওয়া নেতানেত্রীদের প্রতিশ্রুতিতে এবার দিন পাল্টাবে, সুদিন আসবে; তাদের আজ বিশ্বাসভঙ্গের দিন! বিস্ফোরিত শিহরণে একটার পর একটা ঘটনা প্রত্যক্ষ করে তারা এখন বিস্মিত হয়ে অনুভব করছেন পরিবর্তন এসেছে তবে মাত্র দুটি ক্ষেত্রে! প্রশাসকের নাম ধাম রঙ হয়েছে বদল! আর সুসংঘটিত সাংগঠনিক শৃঙ্খলায় যে রাজনৈতিক দূর্বৃত্তায়ন ছিল পর্দার আড়ালে, আজ সেটা রঙ বদলে বিশৃঙ্খল সংঘটনের বেআব্রুতায় চলে এসেছে প্রকাশ্যে! ভূতপূর্ব প্রশাসক দল ঠিক যেখানে শেষ করেছিলেন তাদের ইনিংস, পরিবর্তনের দলটি সেইখান থেকেই বাউন্ডারী হাঁকাচ্ছেন খুব দ্রুত!

পরিবর্তনের পতাকা নিয়ে এহেন তাড়াহুড়ো এভাবে চলতে থাকলে তিনদশক কেন তিনবছরেই ইনিংস শেষ হতে পারে! তবে তাতেও জনসাধারণের বিশেষ লাভ নেই! কারণ তৃতীয় কোনো বিকল্প রাস্তা আমরা খুলতে পারিনি!

এই যে বিকল্পহীনতা এটাই ভয়ংকর! এটা গণতন্ত্রের পক্ষেই অস্বাস্থ্যকর! নাগরিক সামাজের মধ্যে এখনও যে সামান্য অংশে পচন ধরেনি, তাদের সময় এসেছে কোনো তৃতীয় বিকল্পের দিকে সমাজকে আলো দেখানো! আসল পরিবর্তনের সূচনা করতে গেলে যা জরুরী!রাজ্যরাজনীতির ক্ষমতা দখলের এই লড়াই নয়ত ক্রমেই ক্যানসারের মতো দূরারোগ্য ব্যাধিতে পরিণত হয়ে যাবে! শকুন আর শেয়ালের খাদ্য হয়েই শেষ হবে তাদের হৃদয়, এখনো যাদের কাছে স্বাভাবিক বলে মনে হয় মহ সত্য বা রীতি!

প্রবন্ধ - ফাল্গুনী মুখোপাধ্যায়



এই সময় সেই সমর এবং সব সময় ...


এই সংখ্যার বিষয় ভাবনা এই সময়এই সময় কথাটা আমার কাছে কিঞ্চি বিভ্রান্তিকর,কারণ কথাটা কিছু নির্দেশ করেনা। সেই অর্থে চলমান সময়ের কবিতা, বা সাহিত্য বা এই সময়ের রাজনীতি ইত্যাদি নির্দিষ্ট অভিমুখ পাওয়া যেতে পারেআরো একটা ধাঁধা আছে। এই সময়তো পমুহুর্তেই সেই সময় হয়ে যাচ্ছে। তাহলে ? আসলে কোন চলমান সময়ের শিল্প-সাহিত্য-  বা যেকোন সৃষ্টির বিচার সেই চলমান সময়ে করা যায়না। সময় চলিয়া যায় নদীর স্রোতের প্রায় প্রবাদ হয়ে যাওয়া এই কথাটা ঠিক আবার বেঠিকও বটে। বেঠিক, সময়কে ধরা যায়না কিন্তু চলমান সময়ের সৃজনশীলতাকে আমরা ধরে রাখতে পারি। সময়ের শরীরে ধরে রাখা সবকিছুই তখন ইতিহাসের উপাদান। এই সময়ে লেখা প্রয়াত সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের বৃহ  সেই সময় উপন্যাসটির নাম এই সময় হতে পারতোনা। সময়কে ধরে রাখা যায় বলেই এই সময়কে অতিক্রম করে উনিশ শতাব্দীর সেই সময়ে পৌছে যাই ঐ সৃজনকর্মের মধ্য দিয়ে। চলে যাওয়া সময়কে আবার ঘটিয়ে দেওয়া যায়না বটে কিন্তু ফিরে ফিরে আসে মানুষের সৃজনকর্মের মধ্য দিয়ে
                
     সময়ের গতিও কি সবযুগে এক থাকে? না থাকেনা , যদি সমাজ ও সভ্যতার বিবর্তনের গতিকে সময়ের সঙ্গে এক করে দেখি। এদেশে প্রথম ধনিমূদ্রন ব্যবস্থা গ্রামোফোন রেকর্ড চালু হয় ১৯০২ সালে আর মাত্র ১০০ বছরের মধ্যে ৭৮ পাক গ্রামোফোন রেকর্ড থেকে এক্সটেন্ডেড প্লে, লং প্লেইং রেকর্ড, টেপ রেকর্ডিং, ক্যাসেট, সিডি, ডিভিডি পদ্ধতিকে জাদুঘরে পাঠিয়ে দিয়ে এখন মাইক্রো চিপস।  প্রাচীন সাহিত্যের ইতিহাস কিংবা সামাজিক ইতিহাসের সময় বা সমাজ বিবর্তনের একক তাই ধরা হত শতকের হিসাবে পঞ্চম শতাব্দী, সপ্তম শতাব্দী ইত্যাদি , আর এখন দশকের একক অর্থা ত্রিশএর দশক , পঞ্চাশের দশক এই রকম। কারণ একটা শতকের সময় কালে সমাজ বা সাহিত্যের বিবর্তন এতো দ্রুত, যুগ লক্ষণ বা দ্বান্দ্বিক সূত্রগুলি পালটে যাছে এতো দ্রুত যে সেগুলিকে আর শতকের এককে ধরে রাখা যাচ্ছেনা
     
   একটি ফেসবুক ব্লগজিনে একটা অনলাইন আলোচনার প্রতিবেদন পড়ছিলাম। বিষয়- সাহিত্যের ক্ষেত্রে কোন দশক বলে সীমা রেখা থাকা কি উচি ? প্রতিবেদনের কথা থাক। বিষয়টাই তো বোকা বোকা লাগে। আমি আপনি কে এই সীমারেখায় ভাগ করার ? মুকুন্দরাম চক্রবর্তী যখন ষোড়শ সতকে চন্ডীমঙ্গল কাব্য রচনা করেছিলেন তখনকি এই ভেবে লিখেছিলেন যে তাঁর কাব্য শুধু সেই সময়ের জন্য ? বিষয়টাতো এই যে লেখকের সৃজনকর্ম তাঁর সময়এর প্রতিনিধিত্ব করছে কিনা, তাঁর সময়এর যুগলক্ষণগুলি তাঁর সৃজনকর্মের শরীরে ছায়াপাত ঘটাচ্ছে কিনা। রোম ভস্মিভূত হবার সময় সম্রাট নীরোর বেহালা বাজানোর উপমাটা ক্লিশে হয়ে গেছে ঠিকই, কিন্তু সম্রাট নীরো বেহালার ছড় টেনে একটা সঙ্গীতের সৃষ্টি করেছিলেনতো ! অপাংক্তেয় সেই সৃষ্টি আস্তাকুড়ে চলে গেছে কারণ সেই সৃষ্টি সময়ের দাবী মেটায়নি। গোষ্ঠীমানুষ, তার চারপাশ , আর সময় ভিন্ন আর কিছুই সাহিত্য শুধু নয় কোন সৃজনকর্মের বিষয়বস্তু হতে পারেনা। এই সময়এর যাকিছু সৃষ্টি বিচার আমি অন্তত এই মাপদন্ডেই করবো।
               
    দক্ষিণ আফ্রিকার বর্ণভেদ বিরোধী আন্দোলনের নিপীড়িত কালো মানুষের কবি, ফাঁসির দড়িতে মৃত্যুবরণকারী শহিদ কবি বেঞ্জামিন মোলায়েসএর দুঃসময় নামে একটি কবিতা উদ্ধৃত করি

“এখন সেই দুঃসময়, যখন
ঘন অরণ্যের আড়ালে
রোদ্দুর হারিয়ে গেছে
আমরা কেউ কোন প্রিয় মুখ
আর উজ্বলন্ত, দেখিনা
আমার মা নিঃশব্দে হেঁটে হেঁটে
কোথায় যাচ্ছে তা অন্ধকারে
ঠাওর করা দুঃসাধ্য
এখন কুঠারের আঘাতে আঘাতে
অরণ্যের অন্ধকার ছিন্ন ভিন্ন করে
এই ভয়ংকর সময়কে কে রুখতে চায়, কে ?
আমি তুমি আর
জঠরে যে ভ্রুণ আছে
সে”। (অনুবাদ সৌমিত্র সেনগুপ্ত)
 
    এ কবিতাতো একটা দেশের ও সময়ের বিশেষ প্রেক্ষিতে লেখা , কেমন করে দেশ কালএর উর্ধে উঠে গেলো? কিংবা তুরস্কের বিপ্লবী কবি ৬১ বছরের জীবনকালের বেশির ভাগটাই যার পলাতক ও বন্দী জীবন, সেই নাজিম হিকমতের জেলখানার চিঠির শেষ কয়েকটা পঙক্তি
আমি জেলে যাবার পর আরো বেশি উজ্বল হয়েছে দিন
আর আমি বারংবার সেই একই কথা বলছি
জেলখানার দশটা বছরে যা লিখেছি সব তাদেরই জন্য,
তাদেরই জন্য যারা মাটির পিঁপড়ের মত, সমুদ্রের মাছের মত অগণন
যারা ভীরু, যারা বীর, যারা শিক্ষিত, যারা শিশুর মত সরল
যারা ধ্বংস করে, যারা সৃষ্টি করে
কেবল তাদেরই বৃত্তান্ত আমার গানে।
আর যা কিছু, ধরো আমার জেলখানার এই দশটা বছর , শুধু কথার কথা”।
কবিতার শরীরে সময় আর মানুষের কথা রয়েছে বলেই এ কবিতা দেশ-কালের ঊর্ধে উঠে যায়
                 
    স্বাধীনতা-উত্তর কাল থেকে সাতটা দশক পেরিয়ে এলাম। প্রতিটি দশকেরই বিশেষ যুগলক্ষণ থাকতে পারে। সবগুলিই শিল্পসাহিত্যের ক্ষেত্রে ব্যাপক প্রভাব হয়তো ফেলেনা। কারণ সমাজ বন্দোবস্তের বা সেই সমাজের মানুষের বোধএর তেমন কোন হেরফের হয়না। ধরা যাক মধ্য আশি থেকে  এই দুহাজার দশ এই প্রায় চার দশকে বাঙ্গালির সমাজ বন্দোবস্তে দৃশ্যমান কোন পরিবর্তন এসেছে কি? কিংবা তার সৃজনশীলতাকে একটা নতুন বাঁকে এনে দাঁড় করাবে,খুঁজে পাবে আমাদের নাড়া দেওয়ার মত কোন উপাদান?  না আসেনি। প্রবল ভাবে এসেছে এক শূণ্যতা বোধএই সময়ের সাহিত্য সংস্কৃতিতে তাই শুধুই শূণ্যতা বোধ, শুধুই মধ্যবিত্ত মানুষের আত্মযুদ্ধ। সাহিত্য-নাটক গান বা বুদ্ধির চর্চায় এই চারটি দশক আগামী প্রজন্মের কাছে গর্ব করার মত কোন উপাদান দেয়নি। এই সময় অতএব শূণ্যতা বোধের সময়, অন্তত উপলব্ধীতে। হয়তো আরো অনেকের কাছে
    
    কোন কোন যুগে আমাদের মনন ও জীবনবোধ ও চর্চায় এক একটা বাঁক আসে, তখন আমাদের মনন ও সৃষ্টির ভুমিও উর্বর হয়। এরকমই হয়েছিল গত শতাব্দীর চল্লিশের দশকে তারপর আবার সত্তরের দশকে। চল্লিশের দশকে প্রগতি লেখক আন্দোলন ও গণনাট্য আন্দোলনের ফলশ্রুতিতে আমাদের মননের যে উর্বর ভুমির নির্মাণ হয়েছিল তাইই একটা পরিণতি বিন্দুতে পৌছেছিল সত্তরের দশকে। জীবনের নবতর বোধের নির্মাণ ভুমি থেকেই ২য় যুদ্ধ পরবর্তী সময় কালে উঠে এসেছিলেন মাণিক বন্দ্যোপাধ্যায়, প্রেমেন্দ্র মিত্র, সলিল চৌধুরী, ঋত্বিক ঘটক, মৃণাল সেন, সত্যজি রায়, হেমন্ত মুখোপাধ্যায়, রবিশঙ্কর, সুচিত্রা মিত্র, দেবব্রত বিশ্বাস, উপল দত্ত, শম্ভূ মিত্র, বিষ্ণু দে, বুদ্ধদেব বসু এবং চিরদিন গর্ব করার মত কত নাম
     
    আমি চল্লিশ পরবর্তী সময়কালের কিংবা সত্তর দশকের আর্থ-সামাজিক ও রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটের বা সেইসময়ের অভূতপূর্ব সৃষ্টি প্রাচুর্যের মধ্যে ঢুকবোনা , ঢোকা সম্ভবও নয় এই ক্ষুদ্র পরিসরের নিবন্ধে। শুধু এইটুকু বলি সত্তরের দশকটা ছিল বাংলার সমাজ জীবনে এক ক্রান্তিলগ্নের সময়কাল। সত্তর দশকটা  একদিকে ছিল মৃত্যুর দশক এবং একই সঙ্গে সৃজনের দশকও বটে। কবি বিমল ঘোষের কবিতার কয়েকটি পংক্তিতে আমি সত্তরের দশকটাকে ফিরে দেখবো

“কিনুগোয়ালার গলি
সোনার টুকরো ছেলেরা সব অশ্বমেধের বলি
বারুদ গন্ধ বুকে নিয়ে আকাশে ফোটে জ্যোস্না
ময়লা হাতে ওকে তোরা ছুঁসনা
ওরে মওন, পৃথিবীর গভীর
গভীরতর অসুখ এখন”

    তো চল্লিশ পরবর্তী সময়কালে এইযে সৃষ্টি প্রাচুর্য, বাঙ্গালির মননের এই উর্বর নির্মাণভুমি তা সম্ভব হয়েছিল শিল্প-সাহিত্যে সমাজ বাস্তবতার ছবি আঁকার জন্য। এমন নয় যে এখনকার শিল্প-সাহিত্যে সমাজ বাস্তবতার ছবি বিন্দুমাত্র নেই। একটা ধারা আছে এবং থাকবেই, কিন্তু সেটা মূল শ্রোত নয় হতাশা এখানেই। এবং এখানেই বলার কথা যে আমরা সেই ধারাটিকে বেগবান করতে পারছি কিনা। সমাজ-বাস্তবতার শৈল্পীক প্রতিফলন সেই সাহিত্যকে কালোত্তীর্ণ করে। পাবলো নেরুদার ঐতিহাসিক নোবেল ভাষণের কয়েকটি বাক্য উধৃত করে এই নিবন্ধের ইতি টানবো যেখানে নোবেল জয়ী কবি, কবি ও কবিতার দায়বোধ সম্পর্কে তাঁর ভাবনার কথা ব্যক্ত করেছিলেন
“আমি কোন বই পড়ে কবিতা লিখতে শিখিনি। কাউকে আমি শেখাতেও পারবো না কি করে কবিতা লিখতে হয়। ... আমার এই পথচলার কাহিনি দিয়ে একটা কবিতা তৈরি হয়ে যায়। তাতে আমি মাটি থেকে উপাদান নিই, আত্মা থেকে উপাদান নিই। আমার কাছে কবিতা একটা কাজ, একটা গুরুত্বপূর্ণ কিন্তু ক্ষণস্থায়ী কাজ, যার মধ্যে মিশে আছে একাকীত্ব ভাবনার বিশ্বস্ততা, আবেগ ও গতি, নিজের কাছে আসা, মানুষের কাছে আসা, প্রকৃতির গোপনীয়তার প্রকাশ। আমি প্রবলভাবে বিশ্বাস করি যে মানুষ তার ছায়ার সাথে,আচরণের সাথে,কবিতার সাথে যে আটকে আছে, মানুষের যে সমাজবদ্ধতার চেতনা, তা সম্ভব হয়েছে কারণ মানুষের একটা প্রচেষ্টা আছে স্বপ্ন আর বাস্তবকে মেলানোর। কবিতা এই স্বপ্ন ও বাস্তবকে মেলানোর কাজটা করে”